স্লোভেনিয়াতে বাড়ছে করোনাভাইরাস, বাড়ছে প্রবাসীদের আতঙ্ক

Thursday, March 26th, 2020
স্লোভেনিয়াতে বাড়ছে করোনাভাইরাস, বাড়ছে প্রবাসীদের আতঙ্ক

 

ডেস্ক নিউজঃ মধ্য ইউরোপের দেশ স্লোভেনিয়াতে প্রতিনিয়ত বেড়েই চলছে কোভিড-১৯ খ্যাত নোভেল করোনাভাইরাসে সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা। স্লোভেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত ২৫ মার্চ সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর দুইটায় প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী এ পর্যন্ত স্লোভেনিয়াতে সব মিলিয়ে ৫২৮ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে যাদের শরীরে নোভেল করোনাভাইরাস পজিটিভ ধরা পড়েছে।

অর্থাৎ ২৪ মার্চ স্থানীয় সময় দুপুর দুইটা থেকে শুরু আজ ২৫ মার্চ স্থানীয় সময় দুপুর দুইটা এ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ৪৫ জন করোনাভাইরাস দ্বারা সংক্রমিত হয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের সংখ্যা স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানাতে এবং এরপর পর্যায়ক্রমে ক্রানিয়ে ও ছেলইয়েতে। এদিকে স্লোভেনিয়াতে করোনাভাইরাসের প্রভাবে এ সপ্তাহে আরও নতুন করে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো তিনে। সোমবার স্থানীয় সময় দুপুর দুইটায় স্লোভেনিয়ার বর্তমান স্বাস্থ্যমন্ত্রী টমাজ গ্যানটারের পক্ষ থেকে এ তথ্যটি নিশ্চিত করা হয়।

এদের মধ্যে একজন স্লোভেনিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর ম্যাটলিকায় বসবাস করতেন। স্থানীয় বেশ কিছু গণমাধ্যমে বলা হচ্ছে, এ ভদ্রমহিলা সম্প্রতি প্যারিস ভ্রমণ করেছিলেন এবং মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল প্রায় ৯২ বছর। তবে তিনি শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন ধরণের বার্ধক্যজনিত শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন।

অন্যদিকে গতকাল স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানাতে ৬৭ বছর বয়সী আরও এক ভদ্রলোকের মৃত্যু হয়েছে এ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণে। যা ইতিমধ্যে স্লোভেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে। কোভিড-১৯ এর পাশাপাশি তারও অন্যান্য বেশ কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল বলেও স্লোভেনিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দাবি করেছে।

গত ১৯ মার্চ বৃহস্পতিবার করোনাভাইরাসের বিস্তার প্রতিরোধে সম্পূর্ণ স্লোভেনিয়াকে লকডাউন করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলও যা এখনও অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে খুব বেশি প্রয়োজন না থাকলে কাউকে ঘরের থেকে বাইরে বের না হওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাস, ট্রেনসহ সকল ধরণের পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। লুবলিয়ানাতে অবস্থিত স্লোভেনিয়ার একমাত্র এয়ারপোর্ট ইয়োজে পুচনিক ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকেও গত ১৭ মার্চ থেকে সকল ধরণের ফ্লাইট পরিস্থিতির উন্নতি না ঘটা পর্যন্ত সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইতালির মতো ক্রোয়েশিয়া এবং হাঙ্গেরির সঙ্গেও সাময়িকভাবে সীমান্ত সংযোগ বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। কিছু নির্দিষ্ট পয়েন্ট ছাড়া অন্যান্য সকল জায়গায় প্রতিবেশি অস্ট্রিয়ার সঙ্গেও স্লোভেনিয়ার সীমান্ত যোগাযোগ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

এশিয়াসহ ইউরোপের বাইরে বিভিন্ন দেশে প্রায় দুইশোর অধিক স্লোভেনিয়ার নাগরিক আটকা পড়েছেন এবং তাদেরকে খুব দ্রুত নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য স্লোভেনিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে খুব শীঘ্রই কাজ শুরু করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

হাসপাতাল, ফার্মেসি, পোস্ট অফিস, ব্যাংক, বিভিন্ন সুপার শপ কিংবা খাবারের দোকান অর্থাৎ নিত্য প্রয়োজনীয় সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যান্য সকল ধরণের প্রতিষ্ঠান সরকারের নির্দেশ মোতাবেক বন্ধ রয়েছে।

স্পার, হফার, লিডল, ফামা ডিএমসহ যে সকল সুপারশপ রয়েছে তারা এ পরিস্থিতিতে তাদের কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং একই সময় একজনের অধিক কিংবা একই পরিবারের সদস্য ছাড়া অন্য কাউকে অনেক সময় প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।

স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাবলিক প্লেসগুলোতে সকল ধরণের গণজমায়েতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে যে নিরাপদ দূরত্ব বজায় না রেখে যদি কোনও উন্মুক্ত স্থানে একইসঙ্গে পাঁচ জন যদি একত্রিত হয় তাহলে তাদের প্রত্যেককে ৪০০ ইউরো জরিমানা করা হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের প্রভাবে অন্যান্য অনেক দেশের মতো স্লোভেনিয়াতেও অর্থনৈতিক এবং পর্যটন খাতে থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পটগুলো এখন প্রায় জনশূন্য।

গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে স্লোভেনিয়ার সরকারের ম্যাক্রোইকোনোমিক অ্যানালাইসিস সেন্টারের পক্ষ থেকে চলতি অর্থ বছরে দেশটির প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিলও সাড়ে তিন শতাংশ যেটি দেড় শতাংশ অর্থাৎ প্রায় অর্ধেকে নেমে আসতে পারে বলে দেশটির অনেক অর্থনীতিবিদ ধারণা করছেন।

বিশেষ করে বার, রেস্টুরেন্ট কিংবা বিভিন্ন ফ্যাক্টরি বন্ধ থাকায় দেশটির অনেক মানুষই বিপাকে পড়েছেন। উদ্ভূত পরিস্থিতির সামাল দিতে স্লোভেনিয়ার বর্তমান অর্থমন্ত্রী আন্দ্রেই শিরচেলি বিভিন্ন মেয়াদে সহজ শর্তে ঋণ ও বিভিন্ন ধরণের আর্থিক সাহায্য প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন।

পাশাপাশি স্লোভেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইয়ানেজ ইনশার পক্ষ থেকে গত রোববার এক টুইটার বার্তায় করোনা ভাইরাস পরিস্থিতিকে ১৯৯১ সালে স্লোভেনিয়ার স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রান্তিকাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং এ পরিস্থিতির মোকাবেলায় সকলকে মনোবল ধরে রেখে একযোগে কাজ করার জন্য আহবান জানিয়েছেন।

২০১৮ সালের জনগণনা অনুযায়ী স্লোভেনিয়াতে বসবাসরত মোট জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২১ লাখের কাছাকাছি। দেশটি সে অর্থে নতুন; যেহেতু ১৯৯১ সালে যুগোস্লাভিয়া ফেডারেশন থেকে বের হয়ে দেশটি স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছিল।

ইউরোপের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র ইতালি কিংবা অস্ট্রিয়া অথবা জার্মানি, স্পেন, পর্তুগাল কিংবা ফ্রান্সের মতো সে অর্থে বাইরের দেশের থেকে আসা ইমিগ্র্যান্ট নেই বললেই চলে। তারপরেও সব মিলিয়ে দেশটিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা ২০ এর কাছাকাছি এবং এদের মধ্যে পাঁচ জন শিক্ষার্থী।

মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ একজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষক যিনি ইউনিভার্সিটি অব লুবলিয়ানার অধীনে টেক্সটাইল ফাংশনালাইজেশনের ওপর পিএইচডি সম্পন্ন করছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো যে বিশ্বের অন্যান্য অনেক দেশের মতো স্লোভেনিয়াতেও করোনা ভাইরাসের এ বিস্তার ঠেকাতে সকল শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।

যার প্রভাবে শিক্ষার্থীরা বেশ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। কেউই সঠিকভাবে বলতে পারছেন না যে কবে সামগ্রিক পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাবে এবং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলো আবার খুলে দেওয়া হবে। যদিও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে অনলাইনে শিক্ষা-কার্যক্রম পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তৌসিফ রহমান যিনি ইরাসমাস মুন্ডুস নামক ইউরোপিয়ান শিক্ষাবৃত্তির অধীনে ইউনিভার্সিটি অব লুবলিয়ানাতে মাস্টার্স সম্পন্ন করছেন। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল যে উদ্ভূত পরিস্থিতি তার কপালে বেশ বড় ধরণের ভাঁজের সৃষ্টি করছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য সকল ধরণের শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় তিনি বেশ শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

আদৌতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেমিস্টার শেষ করতে পারবেন কি না। তবে তিনি মনে করেন, ইউনিভার্সিটি খোলা থাকলে যেটি সম্ভব হতো। নিয়মিত লাইব্রেরি ওয়ার্ক কিংবা সরাসরি প্রফেসরদের সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে ব্যবহারিকভাবে পরামর্শ খুঁজে বের করা যেত। কিন্তু ইউনিভার্সিটি বন্ধ থাকায় সেটি আর হয়ে উঠছে না।

অন্যদিকে বাংলাদেশি মালিকানায় পরিচালিত দুইটি রেস্টুরেন্ট রয়েছে স্লোভেনিয়ার রাজধানী লুবলিয়ানাতে এবং মাহমুদুল হাসান শুভ যিনি লুবলিয়ানার ট্রুবায়েভা সেস্টায় অবস্থিত “তান্দুরী” নামক একটি বাংলাদেশি ও ইন্ডিয়ান খাবারের রেস্টুরেন্টের মালিক।

তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেলো যে এ করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে তিনি বেশ বিপাকে পড়েছেন। খুব বেশি দিন হয়নি তিনি এ রেস্টুরেন্টের মালিকানা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতির কারণে বাধ্য হয়ে তাকে সরকারি নির্দেশনা মোতাবেক রেস্টুরেন্ট বন্ধ রাখতে হচ্ছে যা তাকে ব্যাপক লোকসানের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

স্লোভেনিয়াতে বসবাসরত অন্যান্য বাঙালিদের প্রতিক্রিয়াও একইরকম। সরকার জরুরি অবস্থা জারি করায় নিত্য প্রয়োজনীয় সেবাদানকারী কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন: ফার্মেসি, হাসপাতাল, ব্যাংক, পোস্ট অফিস, সুপার শপ এবং নির্দিষ্ট ক্যাটাগরির কিছু খাবারের দোকান ছাড়া সকল কিছু বন্ধ রাখা হয়েছে।

যার প্রভাবে তাদের অনেকেই কাজে যেতে পারছেন না এবং সাময়িকভাবে তাদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। কেউই জানেন না কবে এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তবে সকলেই কামনা করছেন যাতে খুব শিগগির এ পরিস্থিতির উন্নতি ঘটে এবং তারা আবার তাদের চিরায়িত কর্মক্ষেত্রে ফিরে আসতে পারেন।