চীনকে মৃত্যুর মিছিলে ছাড়িয়ে গেল স্পেন

Thursday, March 26th, 2020
করোনা

 

ডেস্ক নিউজঃ করোনাভাইরাসে বিপর্যস্ত-বিধ্বস্ত পুরো বিশ্ব। বর্তমানে ভাইরাসটি ভয়াবহ তাণ্ডব চালাচ্ছে ইতালি, স্পেন ও ব্রিটেনে। লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃতের সংখ্যা। এ প্রাণঘাতী ভাইরাসে ইউরোপের তিন দেশে প্রতি দু’দিনে দ্বিগুণ হারে মানুষ মারা যাচ্ছেন।

ইতালিতে মহামারী করোনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের শিকার মিলান প্রদেশের লম্বার্ডি শহর। গত ২৪ ঘণ্টায় দেশটিতে মৃত্যু বাড়লেও কমেছে নতুন রোগীর সংখ্যা। এর চেয়েও বাজে অবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে ব্রিটেনের রাজধানী লন্ডন ও স্পেনের রাজধানী মাদ্রিদ। এ দুই শহরে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে সংক্রমণ ও মৃত্যু। ইতোমধ্যে মৃতের সংখ্যায় চীনকে পেছনে ফেলেছে স্পেন। পিছিয়ে নেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কও।

‘বিশ্বের রাজধানী’ খ্যাত শহরটিতে বুলেট গতিতে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা। এভাবে চলতে থাকলে লন্ডন-মাদ্রিদকেও ছাড়িয়ে যাবে নিউইয়র্ক। খবর বিবিসি, রয়টার্স, এনডিটিভি, আনন্দবাজার, ইন্ডিয়া টুডে, এপি, সিএনএন, গার্ডিয়ান, আলজাজিরা ও ওয়ার্ল্ডওমিটারের।

করোনাভাইরাসের নতুন পরিসংখ্যান বলছে, কিছু শহরে করোনায় মৃতের সংখ্যা ব্যাপক হারে বাড়ছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাণঘাতী করোনার আক্রমণে এখন সবচেয়ে করুণ অবস্থা বিরাজ করছে যুক্তরাজ্যের লন্ডন ও স্পেনের মাদ্রিদ।

এ শহর দুটির শোচনীয়তা ইতালির লম্বার্ডিকেও ছাড়িয়ে গেছে। এখানে প্রতিদিনই মৃতের সংখ্যা দ্বিগুণ হারে বাড়ছে। ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক গবেষণা বলছে, লন্ডনে দু’দিন অন্তর করোনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দ্বিগুণ হচ্ছে। আর প্রতি ৩ দিনে দ্বিগুণ হচ্ছে পুরো ব্রিটেনে।

করোনাভাইরাসে এ পর্যন্ত বিশ্বে ৪ লাখ ৪৫ হাজার আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু ১৯ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। মঙ্গলবার ইউরোপের দেশ ইতালিতে নতুন করে ৭৪৩ জন মারা গেছেন। এ নিয়ে দেশটিতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৬ হাজার ৮২০ জনে।

করোনা মূল উপকেন্দ্র এখন ইতালির লম্বার্ডি। চীনের উহানের পর ওই শহরে ভয়াবহ তাণ্ডব চালাচ্ছে করোনা। তবে লন্ডন ও মাদ্রিদে মৃতের পরিসংখ্যান দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এ শহর দুটি খুব শিগগিরই করোনার ‘হটস্পট’ হতে যাচ্ছে।

বুধবার পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় স্পেনে ৪৩৮ জন মারা গেছেন। দেশটিতে মৃতের সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে ৩ হাজার ৪৩৪ জনে দাঁড়িয়েছে। চীনে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৩ হাজার ২৮১ জন। স্পেনে আক্রান্ত হয়েছেন ৪৭ হাজারের বেশি।

এরমধ্যে মাদ্রিদেই আক্রান্ত হয়েছেন ১২ হাজার ৩৫২ জন, যা মোট আক্রান্তের এক-তৃতীয়াংশ। এছাড়া মারা গেছেন এক হাজার ৫৩৫ জন, যা দেশটির মোট মৃতের ৫৭ শতাংশ। এমন পরিস্থিতিতে ন্যাটোর সহযোগিতা চেয়েছে দেশটি।

ইংল্যান্ডে নতুন করে আরও ৮৭ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ২১ জনই লন্ডনের। এক সপ্তাহের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যে মৃতের সংখ্যা ছয়গুণ বেড়েছে। মঙ্গলবার মারা গেছেন ৭১ জন।

নিউইয়র্কের গভর্নর অ্যান্ড্রিউ কুমো বলছেন, রাজ্যে প্রতি ৩ দিনে দ্বিগুণ হচ্ছে মৃতের সংখ্যা। বুলেট ট্রেনের চেয়েও দ্রুতগতিতে ভাইরাসের বিস্তার ঘটছে। এ জন্য দ্রুত মেডিকেল সরঞ্জাম সরবরাহের আহ্বান জানিয়েছেন কুমো। কিন্তু পর্যাপ্ত সাড়া না পেয়ে তিনি ফেডারেল সরকারের কড়া সমালোচনা করেছেন।

হুশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেছেন, যেমনটা ধারণা করা হয়েছিল, করোনা সংক্রমণ তার চেয়ে অনেক ভয়াবহ। করোনা সংকট মোকাবেলায় কেন্দ্রীয় সরকার পর্যাপ্ত সরঞ্জাম সরবরাহ করেনি বলে অভিযোগ করেন। তিনি উল্লেখ করেন তার রাজ্যে প্রয়োজন ৩০ হাজার ভেন্টিলেটর।

এদিকে, করোনা মোকাবেলায় দুই লাখ কোটি ডলারের একটি প্যাকেজ পাস করেছে মার্কিন কংগ্রেস। করোনা আতঙ্কে প্রথমবারের মতো ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও তার নিজ সংসদীয় আসন বারানসির নাগরিকদের সঙ্গে বুধবার ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেছেন। এদিন সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বৈঠক করেছে মোদির মন্ত্রিসভা।

নিউইয়র্কে ২১১ পুলিশ আক্রান্ত

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের (এনওয়াইপিডি) ২১১ সদস্য নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের আইসোলেশনে নেয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন অন্তত ১৩৬ জন। নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৫৫৩ জন।

এ নিয়ে দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৩ হাজার ২৮৭ জনে, মৃত্যু হয়েছে ৬৮৯ জনের। যুক্তরাষ্ট্রের করোনা প্রতিক্রিয়া সংস্থার দায়িত্বে থাকা ড. দেবোরাহ বার্কস কড়াকড়ির বিষয়ে জানিয়েছেন।

করোনা আক্রান্ত প্রিন্স চার্লস

করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটিশ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লস (৭১)। বুধবার রাজপরিবারের এক বিবৃতিতে তার আক্রান্ত হওয়ার খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং প্রিন্স ফিলিপ দম্পতির জ্যেষ্ঠ পুত্র প্রিন্স চার্লস।

প্রিন্স চার্লসের স্ত্রী ডাচেস অব কর্নওয়াল ক্যামেলিয়া পার্কারেরও পরীক্ষা করা হয়েছে। তার শরীরে কোনো সংক্রমণ পাওয়া যায়নি। বর্তমানে এ দম্পতি স্কটল্যান্ডে নিজেদের বাসভবন বালমোরাল প্রাসাদে সেলফ আইসোলেশনে রয়েছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে টেস্ট কিট চাইলেন ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের কাছে করোনা টেস্ট কিট চেয়েছেন। সিউলে বুধবার মুন বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আমাদের কাছে জরুরি ভিত্তিতে টেস্ট কিটের মতো কোয়ারেন্টিন সরঞ্জাম পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন।

চার হাজার বেডের হাসপাতাল চালু করছে যুক্তরাজ্য : করোনা মোকাবেলায় চার হাজার বেডের নতুন হাসপাতাল চালুর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য। মঙ্গলবার দেশটির স্বাস্থ্যমন্ত্রী ম্যাট হ্যানকক এক বিবৃতিতে এ অস্থায়ী হাসপাতাল তৈরির ঘোষণা দেন। এছাড়া করোনা আতঙ্কে বুধবার থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত পার্লামেন্ট কার্যকর বন্ধ ঘোষণা করেছে ব্রিটেন।

লকডাউনের মেয়াদ বাড়াল মালয়েশিয়া

করোনাভাইরাসের কারণে বিদ্যমান লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মহিউদ্দীন ইয়াসিন। দেশটিতে ১৮ মার্চ শুরু হওয়া লকডাউন ৩১ মার্চ শেষ হওয়ার কথা ছিল। বুধবার প্রধানমন্ত্রী লকডাউনের মেয়াদ বাড়িয়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত করেছেন।

নিউজিল্যান্ডে জাতীয় জরুরি অবস্থা

করোনার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের অংশ হিসেবে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জাসিন্দা আরডার্ন জাতীয় জরুরি অবস্থা জারি করেছেন। দেশটিতে বুধবার রাত থেকে পুরোপুরি লকডাউন কার্যকর হয়েছে। কেউ মারা না গেলেও দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০৫ জনে।

কোয়ারেন্টিন না মানলে দেশে দেশে জেল-জরিমানা

লকডাউন, কোয়ারেন্টিন নীতি না মানলে জেল-জরিমানার ঘোষণা দিয়েছে সৌদি আরব, ভারত, ইতালি, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ। সরকারি নিষেধাজ্ঞা ভেঙে বাইরে বের হলে ভারত সরকার ৬ মাসের জেল ও হাজার রুপি জরিমানার ঘোষণা দিয়েছে।

দেশটির তেলেঙ্গানা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রশেখর রাও আরও একধাপ এগিয়ে পুলিশকে গুলি ছোড়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ৭ বছরের কারাদণ্ডের ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। জেলে পাঠানোর হুশিয়ারি দিয়েছে সৌদি আরব, ইতালিও। নিউইয়র্ক মেট্রো অঞ্চল থেকে অন্য কোনো অঙ্গরাজ্যে গেলে প্রত্যেককে ১৪ দিনের জন্য কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে বলে মঙ্গলবার ঘোষণা দিয়েছে হোয়াইট হাউস।

করোনা মোকাবেলায় যুক্তরাষ্ট্রে ২ লাখ কোটি ডলারের চুক্তি

করোনাভাইরাসের কারণে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি মোকাবেলায় ২ লাখ কোটি ডলারের একটি প্রণোদনা প্যাকেজে চুক্তি করেছে হোয়াইট হাউস এবং সিনেট নেতারা। এ চুক্তির ব্যাপারে মঙ্গলবার আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্টিভেন মুচিন ও সিনেট ডেমোক্রেট নেতা চাক শুমার।

গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে আলোচনা চলছিল। কিন্তু বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিনেটের ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের দ্বিধাবিভক্তিতে সময়ক্ষেপণ হচ্ছিল। বুধবার দীর্ঘ আলোচনার পর এ ব্যাপারে সম্মতিতে পৌঁছায় দুই দল।

এ চুক্তির আওতায় নাগরিক প্রতি এক হাজার ২০০ ডলার, প্রত্যেক যুগলকে দুই হাজার ৪০০ ডলার এবং সন্তান থাকলে অতিরিক্ত ৫০০ ডলার চেকের মাধ্যমে দেয়া হবে। এছাড়া হাসপাতালে ১০ হাজার কোটি ডলার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ৩৫ হাজার কোটি ডলার এবং এয়ারলাইন্স কোম্পানিগুলোকে ৫০ হাজার কোটি ডলার দেয়া হবে।

ভিডিও কনফারেন্সে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক

করোনা আতঙ্কে মঙ্গলবার ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বৈঠক করেছেন জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার ৭৫ বছরের ইতিহাসে এটাই প্রথম ভিডিও কনফারেন্সে বৈঠক। তবে বৈঠকটি প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে পরিপূর্ণ ছিল বলে অভিযোগ করেছেন কূটনীতিকরা।

এএফপি জানায়, অফিসিয়াল কর্মসূচিতে না থাকলেও কঙ্গোর সংকট নিয়ে বৈঠকটি হয়েছে। এটি ছিল এক ধরনের পরীক্ষামূলক বৈঠক। এক কূটনীতিক এএফপিকে বলেন, ‘এটি ছিল পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই কোনো বৈঠক। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বৈঠকে কয়েকবার বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছিল। আবার কিছু অংশগ্রহণকারীর বিদ্যুৎ সংযোগও চলে গিয়েছিল।’

সামাজিক দূরত্ব রেখে মোদির মন্ত্রিসভার বৈঠক

সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে বুধবার বৈঠক করেছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মন্ত্রিসভা। টুইটারে এমন ছবি প্রকাশ করেছেন দেশটির কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। টুইটারে তিনি লিখেছেন, ‘আমাদের এই মুহূর্তের প্রয়োজনীয় বিষয়টি হল সামাজিক দূরত্ব। আমরা এটা নিশ্চিত করছি, আপনি করছেন তো?’ ছবি প্রকাশ করে এনডিটিভি লিখেছে, একজন থেকে আরেকজনে তিন ফুট দূরত্ব বজায় রেখে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে এ বৈঠক হয়েছে।

এদিন ভিডিও কনফারেন্সে নিজ সংসদীয় আসান বারানসির নাগরিকদের উদ্দেশে মোদি বলেন, ‘আমরা করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হওয়ার চেষ্টা করছি। পুরো দেশবাসীর সহায়তায় এ বিজয় অর্জন সম্ভব হবে।’