নড়াইলের সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে কৃষি কার্ড বিক্রি

Tuesday, February 18th, 2020

 

উজ্জ্বল রায় (নড়াইল জেলা প্রতিনিধি) মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় অনিয়ম-দুর্নীতি কমাতে লটারি করে খাদ্যগুদামে ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। এতে কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনিয়ম-অসংগতি এবং ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেটের ফাঁদে পড়ে কৃষি কার্ড বিক্রি করে দেওয়াসহ নানা অভিযোগ উঠেছে। ফলে সরকারের কাছে ধান বিক্রি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অধিকাংশ প্রকৃত কৃষক। এ নিয়ে মাসিক উন্নয়ন সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে।

জেলা প্রতিনিধি জানান, এ সভায় নলদী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ধান বিক্রিতে যাঁরা তালিকাভুক্ত হয়েছেন, তাদের ৮০ ভাগের ঘরে ধান নেই। সরেজমিনে না গিয়ে পুরোনো তালিকা দেখে কৃষি বিভাগ তালিকা করেছে। এদিকে গুদামে ধান দিতে ১৫ মণ ধানে ১৫০০ টাকা এবং ১ টনে ২৫০০ টাকা নিয়ে কৃষক ফড়িয়াদের কাছে কৃষি কার্ড বিক্রি করছেন।’

সভায় লাহুড়িয়া ইউপির চেয়ারম্যান মো. দাউদ হোসেনের অভিযোগ, ‘লাহুড়িয়া ইউনিয়নে অন্তত ২০ জন তালিকাভুক্ত হয়েছেন, যাঁদের ভিটে ছাড়া কোনো জমি নেই। এদিকে কৃষক গুদামে গেলে ধানে চিটা, মান ভালো না বলে ফেরৎ দিচ্ছে।’ লক্ষ্মীপাশা ইউপির চেয়ারম্যান কাজী বনি আমিন বলেন, ‘যাঁদের ঘরে ধান আছে তাঁরা গুদামে ধান বিক্রি করতে পারেনি।’

গত মৌসুমে আমন ধান চাষ করেননি উপজেলার শালনগর ইউনিয়নের মাকড়াইল গ্রামের কৃষক কুদ্দুস খান। তারপরও তিনি আমন চাষি হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। লটারিতেও নির্বাচিত হয়েছেন। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন একজন প্রভাবশালী ধান-চাল ব্যবসায়ী। কুদ্দুস খানসহ তাঁর গ্রামের লটারিতে নির্বাচিত ১০ জন কৃষককে নিয়ে অন্য এলাকায় একটি বাজারে বৈঠক করেন ওই ব্যবসায়ী। ওই ব্যবসায়ী তাঁদের জানিয়েছেন, তাঁদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি দিলে দুই হাজার করে টাকা দেওয়া হবে। কি বিষয়ে তা ওই কৃষকদের জানাতে রাজি নন ওই ব্যবসায়ী। পরে ওই কৃষকেরা খোঁজ-খবর নিয়ে জানতে পারেন, তাঁরা খাদ্যগুদামে আমন ধান বিক্রির জন্য লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন। ওই কৃষকেরা জানান, দুই হাজার টাকার বিনিময়ে অধিকাংশই ওই ব্যবসায়ীর আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। এ ছাড়া যাঁদের নাম লটারিতে উঠেছে, তাঁদের অনেকেই আমন চাষ করেননি। তালিকা তৈরির সময়ে কৃষকদের সঙ্গে দেখাও হয়নি কৃষি কর্মকর্তাদের।

এ অবস্থার সূত্র ধরে উপজেলার নলদী, শালনগর, ইতনা, মল্লিকপুর ও নোয়াগ্রাম ইউনিয়নের এবং পৌর এলাকার অন্তত ৩০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে প্রায় একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। তবে কিছু কৃষক খাদ্যগুদামে ধান বিক্রি করতে পেরেছেন, যাঁদের বাড়ি খাদ্যগুদামের কাছে।

খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, লটারিতে নির্বাচিতদের তালিকার সঙ্গে মোবাইল নম্বর দেওয়া আছে। ফড়িয়া-ব্যবসায়ীরা ওই মোবাইলে যোগাযোগ করছেন। এতে অনেক কৃষকই সাড়া দিচ্ছেন। বিনিময়ে পাচ্ছেন পনেরোশো থেকে আড়াই হাজার টাকা।

একজন ধান-চাল ব্যবসায়ী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে আমি খাদ্যগুদামে ধান-চাল বিক্রির সঙ্গে জড়িত। তাই পরিকল্পনা করি শুরুতেই। কৃষকের তালিকা তৈরির সময়েই আওতাধীন কৃষকের নাম তালিকায় ঢুকানোর ব্যবস্থা করেছি। তাঁদের নামে এখন ধান বিক্রি করছি। এ ছাড়াও বিভিন্ন এলাকায় যাঁদের নাম তালিকভুক্ত হয়েছে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাড়া পাচ্ছি।

তালিকাভুক্ত বেশকিছু কৃষক জানান, লটারিতে নির্বাচিত হওয়ার খবরও তাঁরা জানেন না। তাঁরা এর আগে কখনো ধান খাদ্যগুদামে বিক্রি করেননি। দূর থেকে ধান নিয়ে গিয়ে ফিরে আসতে হয় কি না, বা ধান বিক্রিতে দীর্ঘসূত্রিতা আছে কি না, এসব ভেবে ঝামেলা মনে করছেন তাঁরা।

উপজেলরা প্রশাসন সূত্র জানায়, গত ২ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খাদ্যগুদামে ধান কেনা হবে। এ উপজেলায় খাদ্যগুদাম রয়েছে উপজেলা সদরের লক্ষ্মীপাশা ও উপজেলা সদর থেকে ১৭ কিলোমিটার পশ্চিমে নলদীতে। উপজেলায় আমন চাষ হয়েছে ১০ হাজার ২০০ হেক্টরে। উৎপাদন হয়েছে ৪২ হাজার ৯০০ মেট্রিক টন। ১ হাজার ৬৩ মেট্রিক টন ধান ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৫৯০ মেট্রিক টন কেনা হয়েছে। এর ৩২০ লক্ষ্মীপাশা ও ২৭০ মেট্রিক টন নলদী খাদ্যগুদামে। বাজারে এখন প্রতি মণ ধানের দাম ৬৫০-৭৮০ টাকা। সরকার কিনছে ১ হাজার ৪০ টাকা মন দরে। উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে ৫ হাজার ৬৭৯ জন আমন চাষি তালিকাভুক্ত করা হয়। ধান বিক্রি করতে এর মধ্যে লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন ১ হাজার ২৪২ জন। বড় ও মাঝারি কৃষকের কাছ থেকে ২৫ মণ করে এবং ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের কাছ থেকে ২০ মণ করে ধান কেনা হচ্ছে।

উপজেলা খাদ্য বিভাগ সূত্র জানায়, ধান বিক্রি করতে সরাসরি খাদ্যগুদামে ধান নিতে হয়। ধানের মান ঠিক আছে কি না দেখে ধান মেপে নিয়ে একটি বিল দেওয়া হয়। সে বিল কৃষক তাঁর নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে জমা দিয়ে চেকের মাধ্যমে এক দিনেই টাকা তুলে নিতে পারেন। ধানের মানের ক্ষেত্রে আদ্রতা ১৪ ভাগ, বিজাতীয় পদার্থ শূণ্য দশমিক ৫ ভাগ, ভিন্ন জাতের ধানের মিশ্রণ ৮ ভাগ, অপুষ্ট দানা ২ ভাগ, চিটা শূণ্য দশমিক ৫ ভাগ এবং উজ্জ্বল সোনালী বর্ণ ও প্রাকৃতিক গন্ধ গ্রহণযোগ্য।

উপজেলা কৃষি অফিসার সমরেন কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘চাষির তালিকা এর আগে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানেরা করতেন। এবার আমরা করেছি। কিছু ভুলক্রটি হতে পারে, তবে ৯৫ ভাগ ঠিক আছে।’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মান্নান আলী বলেন, ‘এই প্রথম আমন ধান কেনা হচ্ছে, এর আগে সব সময়ে বোরো কেনা হয়েছে। লটারিতে নির্বাচিতদের জানানোর জন্য মাইকিং করা হয়েছে। এ ছাড়া ইউপি কার্যালয়ে, ইউএনও কার্যালয়ে, খাদ্যগুদামে ও কৃষি কার্যালয়ে নির্বাচিত কৃষকদের তালিকা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এবার অনেক প্রকৃত কৃষক ধান বিক্রি করছেন। তাঁদের উৎসাহিত করতে ধানের মানেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে। প্রথম দিকে অভিযোগ ছিল না। তবে ব্যবসায়ীরা গুদামে আসছেন না, তাঁরা কৃষক পাঠিয়ে ধান বিক্রি করছেন এ অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। লক্ষ্যমাত্রা অর্জন না হওয়ায় পুনরায় লটারি করা হবে।’

উপজেলা চেয়ারম্যান শিকদার আব্দুল হান্নান বলেন, ‘খাদ্যগুদাম থেকে দূরবর্তী এলাকাগুলোতে গিয়ে সরাসরি ধান সংগ্রহ করতে পারলে এসব সমস্যা কেটে যেত।