ঝালকাঠির দৃষ্টি প্রতিবন্ধী দুজন হতে চান শিক্ষক

Thursday, February 13th, 2020

ঝালকাঠি সরকারী কলেজ অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আনছার উদ্দীন আনিসের দুপাশে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী অনার্স পড়ুয়া দুই ছাত্র

আরিফুর রহমান আরিফ (ঝালকাঠি প্রতিনিধি) দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মো. জাকির হোসেন ও মো. ফোরকান খান ঝালকাঠি সরকারী কলেজের ইতিহাস বিভাগে অনার্সের শিক্ষার্থী। তাদের দুজনেরই ইচ্ছা শিক্ষক হয়ে সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিবেন। আদর্শ ব্যক্তিত্বের অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন।

তারা দুজনেই শ্রুতি পাঠক (পাশে বসে একজনে পাঠ করলে শুনে মুখস্ত করা) ও শ্রুতি লেখক (পরীক্ষার সময় অনুজ সহপাঠীকে প্রশ্নোত্তর বলে দিলে সে লিখে) এর মাধ্যমে নিজেদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করার প্রত্যয়ে এগিয়ে নিচ্ছে।

মো. জাকির হোসেন বরিশাল সিটি করপোরেশন এলাকার দিয়াপাড়া ওয়ার্ডের মৃত. আব্দুল মান্নানের ছেলে। সে ঝালকাঠি সরকারি কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র।

জাকির জানায়, আড়াই বছর বয়সের সময় তার পিতা মারা যান। তিন বছর বয়সের সময় টাইফয়েড জ্বরে চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করালে কোনো ফল আসেনি। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করানো সম্ভব হয়নি তার। যার ফলে চিরতরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন জাকির।

ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার প্রতাপে অবস্থিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে বরিশাল (সাগরদি) নুরীয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩.৭৫ পেয়ে এসএসসিতে উত্তীর্ণ হয়। শেষে রূপাতলী জাগুয়া কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হয়। সেখান থেকে জিপিএ ২.৬৭ পেয়ে এইচএসসি উত্তীর্ণ হয়ে ঝালকাঠি সরকারী কলেজে ইসলামের ইতিহাসে অনার্সে ভর্তি হন। এখনও প্রতাপে অবস্থিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে বসবাস করছেন জাকির।

বড় ভাই আব্দুল হাকিম সিকদারের দেয়া খরচেই জাকির এসএসসি পাস করেন। এরপর প্রতিবন্ধী ভাতা ও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষাবৃত্তির টাকা দিয়ে তার সাবির্ক খরচ চলছে। সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে আগ্রহী। এক প্রশ্নের জবাবে জাকির জানায়, শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে পারলে আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দায়িত্ব পালন করব। শিক্ষকরা সমাজের আদর্শ ব্যক্তিত্ব। সেই আদর্শ ব্যক্তিত্ব হয়ে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে চায় জাকির।

অপরদিকে মো. ফোরকান খান সদর উপজেলার পোনাবালিয়া ইউনিয়নের আতাকাঠি গ্রামের আরব আলী খানের ছেলে। সে ঝালকাঠি সরকারী কলেজে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

ফোরকান জানায়, সাড়ে ৩ বছর বয়সে টাইফয়েড জ্বরে আক্রান্ত হলে স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করালে কোনো কিছু হয়নি। টাকার অভাবে উন্নত চিকিৎসা করানোও সম্ভব হয়নি। যার ফলে চিরতরে অন্ধত্বকে বরণ করতে হয়েছে তার।

ফোরকান ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার প্রতাপে অবস্থিত দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক আজাহার আলীর তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক সমাপনী ও জেএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। বরগুনা ডিকেপি মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে জিপিএ ৩.৬১ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়ে বরগুনা সরকারী কলেজে এইচএসসিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে জিপিএ ৩.২৫ পেয়ে এইচএসসি শেষ করেন। পড়ে ভর্তি হন ঝালকাঠি সরকারী কলেজে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে। ৪ ভাই ও ১ বোনের মধ্যে ফোরকান সবার ছোট। বোন বিবাহিত আর বাকি ৩ ভাই ট্রলার চালক। পিতা ও ভাইদের উপার্জনের টাকায় পড়াশোনা করছেন তিনি। বর্তমানে প্রতিবন্ধী ভাতা ও সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে শিক্ষাবৃত্তির টাকা দিয়ে খরচ চলছে। সে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে আত্মনিয়োগ করতে আগ্রহী।

এক প্রশ্নের জবাবে ফোরকান জানায়, প্রতাপ দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষক আজাহার আলীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। কারণ হিসেবে ফোরকান জানায়, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের অনেকে সমাজের বোঝা হিসেবে ভাবে। আজাহার আলী স্যারের মতোই দৃষ্টিহীন মানুষকে শিক্ষিত করে সমাজের বোঝা থেকে সম্পদে রূপান্তর করতে চান তিনি। আদর্শ মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে দায়িত্ব পালন করার আশা পোষণ করেন। আদর্শ ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন মানুষ হয়ে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করার ইচ্ছা জাকিরের।

তারা জানায়, বিশেষ কৌশলের মাধ্যমে বই চিহ্নিত করা, খাতায় লেখাসহ পড়াশোনার যাবতীয় কাজ করে থাকে তারা। দৃষ্টিশক্তি সম্পন্ন একজনকে পড়তে বললে তার কণ্ঠ শুনে মুখস্ত করি। পরীক্ষার সময় জুনিয়র ছোট ভাইয়ের (অনুজ সহপাঠি) সহায়তায় পরীক্ষায় অংশ নেই। সে প্রশ্ন পড়ে শোনালে আমরা উত্তর বলে দেই, আর সে লিখতে থাকে।

ঝালকাঠি সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর মো. আনছার উদ্দিন জানান, ঝালকাঠি সরকারী কলেজে ৪ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আছে। ২ জন শারিরীক এবং ২ জন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী রয়েছে। প্রত্যেকেরই পড়াশোনায় প্রবল আগ্রহ আছে। আমরাও সাধ্যমতো তাদের সার্বিক সহযোগিতা করছি। পরীক্ষার সময় শ্রুতি লেখকের মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়।