বছরে জাবিতে ‘উইকেন্ড কোর্সে’ আয় ৩৫ কোটি টাকা

Saturday, January 25th, 2020

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

ডেস্ক নিউজঃ দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সান্ধ্য কোর্স’ চললেও স্রেফ নাম পাল্টে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে এ ধরনের কোর্স। সাপ্তাহিক ছুটির দিন শুক্র ও শনিবার ক্লাস হওয়ায় এসব কোর্সের নাম দেওয়া হয়েছে ‘উইকেন্ড কোর্স’। বছরে এই কোর্স থেকে উপার্জন প্রায় ৩৫ কোটি টাকা, এর অর্ধেকই পান শিক্ষক এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা।

ছুটির দিনে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় আড়াই হাজার শিক্ষার্থী জড়ো হন। ১০ ও ১১ জানুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি অনুষদ ঘুরে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন রুটে চলা কয়েকটি লোকাল বাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের লোগো ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের নাম ঝুলিয়ে ক্যাম্পাসে এসেছেন উইকেন্ড কোর্সের শিক্ষার্থীরা। সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা, এমনকি রাত পর্যন্ত তাঁদের ক্লাস-পরীক্ষা চলে।

২০১১ সালে একটি ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে এই কোর্স চালু হলেও এখন তা চলছে ১৮টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে। সাধারণত এক বছরে তিনটি সেমিস্টারে সাপ্তাহিক এসব কোর্সের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয় বিভাগগুলো। তবে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) ও ইংরেজি বিভাগ দুই বছরের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেয়। মূলত বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ব্যক্তি, জাতীয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা শিক্ষার্থী ও বেকার শিক্ষার্থীরা এসব কোর্সে ভর্তি হন।

গত ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সান্ধ্য কোর্সের সমালোচনা করেন। এরপর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে চিঠি দিয়ে জানায়, বাণিজ্যিক কোর্সগুলো থাকা উচিত নয়।

নামে ভিন্নতা থাকায় এখনই এসব কোর্স বন্ধ করতে রাজি নয় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) আমির হোসেন বলেন, ‘ইউজিসি মনে করে সান্ধ্য কোর্সগুলো বন্ধ হওয়া উচিত। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে যেহেতু উইকেন্ড প্রোগ্রাম চালু আছে, সেহেতু এখনই আমরা বিষয়টা নিয়ে ভাবছি না।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে অধ্যয়নরত নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে । তাঁদের অভিযোগ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চালু হওয়া এসব কোর্সের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা ও গবেষণার কাজে ব্যাঘাত ঘটছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, কিছু শিক্ষক নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা ঠিকমতো নেন না। তবে এসব কোর্সের শিক্ষার্থীদের বেলায় তাঁরা খুবই আন্তরিক বলে মনে হয়।

‘উইকেন্ড কোর্সের’ সম্মানী (মাসিক)
উপাচার্য: ৫০ হাজার
সহ–উপাচার্য: ৪০ হাজার
কোষাধ্যক্ষ: ৩৫ হাজার
রেজিস্ট্রার: ২৫ হাজার টাকা

অর্থনীতি বিভাগের ৪৪তম ব্যাচের (স্নাতকোত্তর) শিক্ষার্থী মাহদী হাসান বলেন, ‘বাণিজ্যিক এই কোর্সগুলোর ক্লাস নিতে গিয়ে শিক্ষকদের অনেকেই নিয়মিত কোর্সগুলোর ক্লাস নেওয়া ও গবেষণার জন্য সময় পাচ্ছেন না। কিন্তু তাঁদের পদোন্নতি দরকার, তাই যেনতেনভাবে গবেষণা করে পার হয়ে যাচ্ছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার কার্যালয় সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে ৩৪টি বিভাগ ও ৩টি ইনস্টিটিউট রয়েছে। এর মধ্যে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগের প্রতিটিতেই এ ধরনের সাপ্তাহিক কোর্স চালু আছে। এর বাইরে আরও ১২টি বিভাগ ও ২টি ইনস্টিটিউটে চলছে এই কোর্স।

২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে সাবেক উপাচার্য শরীফ এনামুল কবির ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে (আইবিএ-জেইউ) সাপ্তাহিক এই কোর্স চালুর অনুমতি দেন। এরপর ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগে সাপ্তাহিক কোর্স চালু করা হয়। পর্যায়ক্রমে আরও ১৩টি বিভাগে কোর্সটি চালু হয়। গত বছরের আগস্টে রসায়ন বিভাগও এই কোর্স চালুর সিদ্ধান্ত নিলে বিভাগের শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেন। তখন ভর্তি প্রক্রিয়া স্থগিত করা হলেও গত বছরের ২৫ নভেম্বর আবারও রসায়নে ভর্তির আবেদনপত্র চাওয়া হয়েছে। সর্বশেষ পদার্থবিজ্ঞান বিভাগও সাপ্তাহিক কোর্স চালু করেছে। আরও কয়েকটি বিভাগ এটা চালুর জন্য আবেদন করেছে।

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদ্য সাবেক সভাপতি সুস্মিতা মরিয়ম বলেন, ‘পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে এসব সন্ধ্যাকালীন ও উইকেন্ড কোর্স চালু করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে দিনে পাবলিক, রাতে প্রাইভেট বা সপ্তাহের কয়েক দিন পাবলিক, কয়েক দিন প্রাইভেটে রূপ নেয়।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ইফরান আজিজ বলেন, ‘যেভাবে শিক্ষকেরা উইকেন্ড কোর্সের দিকে ঝুঁকছেন তাতে করে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আন্তসম্পর্ক নষ্ট হচ্ছে, যার পরিণতি সুখকর হতে পারে না।’

বছরে আয় ৩৫ কোটির বেশি
সাধারণত পেশাজীবীদের নিয়ে চলা এসব কোর্স ১০ মাস থেকে ২ বছরের মধ্যে শেষ হয়। এসব কোর্সের ফি ৮০ হাজার থেকে শুরু করে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ের উইকেন্ড কোর্সের নীতিমালা অনুযায়ী, এসব কোর্স থেকে মোট আয়ের ৫০ শতাংশ অর্থ কোর্স পড়ানোর সম্মানী হিসেবে শিক্ষকেরা নিয়ে থাকেন। এ ছাড়া ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ছাত্রদের কল্যাণ, গবেষণা এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যয় করা হয়।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত হিসাবাধ্যক্ষ মোসানুল কবির বলেন, ‘দু-একটি বিভাগ মাঝেমধ্যে অর্থ প্রদানে বিলম্ব করলেও উইকেন্ড কোর্সের নীতিমালা অনুসরণ করে সব বিভাগই নির্ধারিত অর্থ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দিয়ে থাকে।’

হিসাব বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের চারটি বিভাগের এসব কোর্সের একেকটিতে ৪০ থেকে ৫০ জন করে বছরের তিনটি সেশনে প্রায় ৫০০ জন ভর্তি করা হয়। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ভর্তি ও টিউশন ফি বাবদ নেওয়া হয় ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা। এই হিসাবে প্রতিবছর এই চারটি বিভাগের সাপ্তাহিক কোর্স থেকে আয় হচ্ছে প্রায় সোয়া আট কোটি টাকা। বাকি ১৪টি বিভাগ ও ইনস্টিটিউটে প্রতিবছর দুই হাজার শিক্ষার্থী ভর্তি হন। তাঁরা ৯৫ হাজার থেকে সোয়া ২ লাখ টাকা পর্যন্ত কোর্স ফি দেন। গড়ে দেড় লাখ টাকা হিসেবে এ বাবদ আয় ২৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এসব কোর্স থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় ৩৫ কোটি টাকার বেশি।

সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব বিভাগের প্রায় ৩০০ জন শিক্ষক উইকেন্ড কোর্সের ক্লাস-পরীক্ষা নিয়ে থাকেন। প্রতি কোর্সের জন্য শিক্ষকেরা পদভেদে ৭৫ হাজার থেকে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত সম্মানী নেন। এর মধ্যে অনেক শিক্ষকই আবার প্রতি সেমিস্টারে একাধিক কোর্সে পড়ান।

টাকা পান প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও
সাপ্তাহিক এসব কোর্সের আয় থেকে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও সম্মানী পান। ২০১৮ সালের সিন্ডিকেটের ৩০৩তম সভায় শীর্ষ কর্মকর্তাদের সম্মানী নির্ধারণ করা হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উপাচার্য মাসে ৫০ হাজার, সহ-উপাচার্য ৪০ হাজার, কোষাধ্যক্ষ ৩৫ হাজার ও রেজিস্ট্রার ২৫ হাজার টাকা পান। ১৬টি আবাসিক হলের প্রাধ্যক্ষরা পান ২ হাজার ৪০০ টাকা করে।

এ ছাড়া ফলাফল প্রকাশ, সনদ, ট্রান্সক্রিপ্ট প্রদানসহ আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক দপ্তর কাজ করে থাকে। এর মধ্যে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মাসে ৫ হাজার ৬০০ টাকা, উপ-পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ৩ হাজার ২০০, সহকারী নিয়ন্ত্রক ও অন্যরা ১ হাজার ৭০০ টাকা করে পান। তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ও পিয়নরা পান ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত পান।

ছুটির দিনে আরেক বিশ্ববিদ্যালয়
২০১৬ সালের ডিসেম্বরের আগে ক্যাম্পাসে সাপ্তাহিক ছুটি ছিল শুধু শুক্রবার। পরে শিক্ষক সমিতির প্রস্তাবে ওই বছরের ২১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের বিশেষ সভায় সপ্তাহে দুদিন ছুটির সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে শুক্র ও শনিবার ক্যাম্পাস আরেক বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ নেয়।

আর এসব কোর্সের ফি ও মান নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীরা বলছেন, দ্রুততম সময়ে কোর্স শেষ করাই তাঁদের লক্ষ্য। ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে দুই বছর মেয়াদি স্নাতকোত্তর কোর্স করছেন রুবাইয়াত হোসেন। তিনি বলেন, ‘দ্রুততম সময়ে কোর্স শেষ করাটাই থাকে শিক্ষকদের মূল লক্ষ্য।’

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে এসব কোর্স নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। গাণিতিক ও পদার্থবিষয়ক অনুষদের ডিন অধ্যাপক অজিত কুমার মজুমদার বলেন, ‘ক্লাসগুলো যেহেতু সপ্তাহের ছুটির দিনে হয়, সে ক্ষেত্রে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় তেমন প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা নেই।’ তাঁর মতে, শুধু টাকার জন্য এসব কোর্স পরিচালনা হচ্ছে না।

অবশ্য নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাঈদ ফেরদৌস বলেন, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভর্তি যোগ্যতা শিথিল করে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার বাইরে গিয়ে এবং মোটা অঙ্কের টিউশন ফি নিয়ে যেভাবে এসব কোর্স পরিচালনা করা হচ্ছে, তা সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যকেই প্রতিফলিত করে। তাঁর মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ওপর সরাসরি পড়ছে।