মধ্যবিত্তের সংসার চালানোই দায় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে

Thursday, January 23rd, 2020

ডেস্ক নিউজঃ পশ্চিম আগারগাঁও কাঁচাবাজারে আতিকুর রহমানের মুদিদোকান। ক্রেতা রুহুল আমিন বিআর–২৮ চালের দাম জানতে চাইলেন। বিক্রেতা বললেন, কেজি ৩৮ টাকা।

রুহুল আমিনের কাছে জানতে চাইলাম, এর আগে তিনি কত দরে কিনেছেন? উত্তর দিলেন, বছরখানেক ধরে ঢাকায় থাকেন। এবারই প্রথম তিনি বিআর–২৮ কিনছেন। এর আগে কিনতেন মিনিকেট, যার কেজি এখন ৫০ টাকা।

রুহুল আমিন চার কেজি চাল কিনলেন। মিনিকেট বাদ দেওয়ায় মোট সাশ্রয় ৪৮ টাকা। কথায় কথায় বললেন, স্থানীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। যা বেতন পান, তা দিয়ে চলা কঠিন। বাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ কমানোর জন্য একটু কম দামি চাল কেনা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।

শরীরের মেদ কমাতে মানুষ নানাভাবে ‘ডায়েট’ করে। এখন সীমিত আয়ের সংসারগুলো ‘ডায়েট’ করছে, মানে খরচ কমাচ্ছে। সাধারণ একটি সংসারে খাওয়ার জন্য দিনে যা লাগে, তার বেশির ভাগের দামই বাড়তি অথবা চড়া।

মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় সর্বশেষ যোগ দিয়েছে চাল। মোটামুটি আয়ের পরিবারে সবচেয়ে জনপ্রিয় মিনিকেট চালের দাম কেজিতে তিন থেকে চার টাকা বেড়েছে। বিভিন্ন জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের এক কেজি চাল কিনতে লাগছে ৫০ থেকে ৫৪ টাকা। ভালো মানের মোটা চালের দাম দুই টাকার মতো বেড়ে কেজি উঠেছে ৩৫ টাকায়।

চালের আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে বেড়েছিল মোটা দানার মসুর ডালের দাম। কেজিতে প্রায় ২০ টাকা। এ ডাল আবার নিম্ন আয়ের মানুষ বেশি কেনে। অ্যাংকর ডাল ও মুগ ডালের দামও কিছুটা বাড়তি।

নভেম্বর থেকে কয়েক ধাপে বেড়েছে খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম, লিটারে ১৫ থেকে ২০ টাকা। বোতলের তেলও লিটারে ৮ টাকা বাড়িয়েছেন ব্যবসায়ীরা। চিনির দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা বেড়েছে। আটা নিয়ন্ত্রণে আছে, কিন্তু ময়দার দাম অনেক দিন ধরেই চড়া।

দেশি পেঁয়াজের কেজি এখনো ১০০ টাকার নিচে নামেনি। নতুন করে ১০ টাকা বেড়ে চীনা রসুন ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায় উঠেছে। দেশি রসুনের কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। আদা কিনতেও প্রতি কেজি ১৪০ টাকা লাগছে। শীত প্রায় শেষ, শীতের সবজির দাম এবার এখনো ততটা কমেনি।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) হিসাবে, ২০১৯ সালে ঢাকায় মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে সাড়ে ৬ শতাংশ, যা আগের বছর বৃদ্ধির হার ছিল ৬ শতাংশ। ক্যাব বলেছে, গেল বছর জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বেশি হারে বাড়ত, যদি চাল, ডাল, তেল, চিনির দাম কম না থাকত। কিন্তু নতুন বছরের শুরুতেই দেখা গেল, চাল-ডালের দামই বাড়তি।

শুধু বাজারেই যে অস্বস্তি, তা নয়। জানুয়ারিতে অনেকের বাসাভাড়া বেড়েছে, দুই শয়নকক্ষের বাসার ক্ষেত্রে বাড়ার পরিমাণ ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা। তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম বেড়েছে এক সিলিন্ডারে (১২ কেজি) ২০০ টাকা। এ মাসেই অনেক এলাকায় ডিশ বিল, ময়লা নেওয়ার বিল বাড়িয়েছেন সেবাদাতারা।

এভাবে মূল্যবৃদ্ধি কতটুকু চাপ তৈরি করেছে, তা জানতে গত তিন দিনে অন্তত ১০ জনের সঙ্গে আলাপ হয়। তাঁদের একজন একটি বেসরকারি ভোগ্যপণ্য বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, নাম গোলাম কিবরিয়া। স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে থাকেন কাঁঠালবাগানে। দুই শয়নকক্ষের বাসাটির ভাড়া ১৬ হাজার টাকা, সঙ্গে সেবা মাশুল বা সার্ভিস চার্জ ৩ হাজার। তিনি বলেন, ৬৫ হাজার টাকা বেতনেও তাঁর সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ছে। জানুয়ারিতে বাসাভাড়া ১ হাজার টাকা বেড়েছে। জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। বেতন না বাড়লে তিনি ৩ হাজার টাকার একটি মাসিক সঞ্চয় স্কিম ভেঙে ফেলার চিন্তা করছেন।

পীরেরবাগের জুতার দোকানমালিক মো. রিপন বলেন, ছয় মাস ধরে জুতার বেচাকেনা কম। প্রতিবছর চৈত্র মাসের দিকে দুই মাসের মতো বিক্রি কম থাকে। এবার অনেক আগে থেকেই ব্যবসার পরিস্থিতি খারাপ। এরই মধ্যে বাজারের ব্যয় বাড়ায় তিনি বিপাকে পড়েছেন।

পরিকল্পনা কমিশনের পেছন দিকে চায়ের দোকান চালান মো. সাব্বির। তিনি ছোট্ট দোকানে এক মাসে ২ হাজার ৭৮০ টাকা ব্যয় বাড়ার হিসাব দিলেন। এর মধ্যে রয়েছে দোকানের ভাড়া বাবদ মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা, চিনিতে ৩৬০ টাকা, চায়ে ৪৫০ টাকা, কনডেন্সড মিল্কে ২৭০ টাকা ও গ্যাসে ২০০ টাকা।

সাব্বির বলেন, বাণিজ্য মেলা শুরুর পর দোকান ভাড়া দিনে ৫০ টাকা বেড়ে এখন ১৫০ টাকা। বিক্রি তেমন বাড়েনি। আর পাঁচ টাকার চা এখনো পাঁচ টাকাতেই বিক্রি করতে হচ্ছে।

পশ্চিম কাজীপাড়ার বাইশবাড়ি এলাকার হেলাল উদ্দিনের দোকান থেকে আড়াই শ গ্রাম ডাল কিনে ফিরছিলেন রিকশাচালক মজিবুর রহমান। দোকানি দাম নিল ২০ টাকা, যা কিছুদিন আগেও ১৫ টাকা ছিল। আয় কি বেড়েছে, জানতে চাইলে মজিবুর বলেন, ‘১০ টাকার ভাড়া ১৫ টাকা চাইলেই মানুষ মারতে উদ্যত হয়।’

মূল্যস্ফীতি বাড়তি

পণ্যের দাম বাড়লে মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষ হয়েছিল ৫ দশমিক ৫২ শতাংশ মূল্যস্ফীতি নিয়ে। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৬২ শতাংশে ওঠে। পরের তিন মাস ওঠা–নামার মধ্যে ছিল। নভেম্বরে এসে তা ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা ছিল ২৪ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। পরের মাস ডিসেম্বরে অবশ্য তা কিছুটা কমেছে। দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৭৫ শতাংশে।

অবশ্য বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা বেশি জানুয়ারিতে। ফলে এ মাস শেষ হলে মূল্যস্ফীতির আসল চিত্রটা দেখা যাবে। এ ছাড়া অশনিসংকেত হলো, বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বাড়তি।

সরকার কী করছে

সরকারি বিপণন সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কয়েক মাস ধরে বেশ কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছে। তবে বাজারে তেল, চিনি ও ডালের দাম বাড়লেও টিসিবির কার্যক্রম নেই। তারা পবিত্র রমজান মাসে এসব পণ্য বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বিশ্ববাজারে তেল-চিনির দাম বাড়তির দিকে। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন (বিটিসি) পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সরকারকে কর কমানোর সুপারিশ করেছে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়।

তবে এ বিষয়ে অগ্রগতি কী, তা গত রাতে তাৎক্ষণিকভাবে জানাতে পারেননি বাণিজ্যসচিব মো. জাফর উদ্দিন।

আয় কত বাড়ছে

পরিসংখ্যান ব্যুরোর খানা আয়-ব্যয় জরিপে মানুষের আয় বাড়ার চিত্রটা দেখা যায়। কিন্তু এ জরিপ সর্বশেষ ২০১৬ সালে করেছে বিবিএস। এতে দেখা যায়, আয়ের দিক দিয়ে সবচেয়ে নিজের স্তরে থাকা ৫ শতাংশ পরিবারের মাসিক গড় আয় ছিল ৪ হাজার ৬১০ টাকা, যা ২০১০ সালের তুলনায় ৫৩৯ টাকা কম।

বিপরীতে সবচেয়ে উচ্চ আয়ের পরিবারে মাসিক গড় আয় ৯ হাজার ৪৭৭ টাকা বেড়ে ৪৫ হাজার ১৭২ টাকা দাঁড়িয়েছে। অবশ্য এ জরিপে সবচেয়ে ধনীদের প্রকৃত হিসাব আসে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। সার্বিকভাবে বিবিএসের হিসাবে, আয়বৈষম্য অনেকটাই বেড়েছে।

নতুন করে আরেক দফা বাড়ল চালের দাম। তেল, চিনি, ডালের দাম আগেই বাড়তি। সংকটে সীমিত আয়ের মানুষ।

এখন কী অবস্থা, তা কিছুটা বোঝা যায় বিবিএসের মজুরি হার সূচক দেখে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মজুরি হার সূচক বিশ্লেষণ করে বলেন, নির্মাণ খাত ও মৎস্য খাতে প্রকৃত মজুরি বাড়ার বদলে কমছে। আর সেবা ও কৃষি খাতে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ১ শতাংশীয় বিন্দুর কম। তবে উৎপাদনশীল খাতে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ২ শতাংশীয় বিন্দুর বেশি।

প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধি হিসাব করা হয় মজুরি বাড়ার হার থেকে মূল্যস্ফীতির হার বাদ দিয়ে। সাধারণভাবে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রকৃত মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল শূন্য দশমিক ৮৪ শতাংশীয় বিন্দু। সর্বশেষ গত ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে বৃদ্ধির গতি কমেছে বলে উল্লেখ করেন গোলাম মোয়াজ্জেম।

এখনকার বাজার পরিস্থিতি মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ে কেমন প্রভাব ফেলতে পারে জানতে চাইলে গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, হঠাৎ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি জীবনমানে প্রভাব ফেলে। ক্রয়ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায়। অনেক সময় মানুষকে সঞ্চয়ে ছাড় দিতে হয়।