দুই কেজি পেঁয়াজের দামে এক মণ ধান!

Sunday, December 8th, 2019
দুই কেজি পেঁয়াজের দামে এক মণ ধান!

ডেস্ক নিউজঃ ক্ষেতজুড়ে সোনালী ফসলেও যেন কাটেনি কৃষকের দুশ্চিন্তা আর হতাশা। লক্ষ্যমাত্রায় উৎপাদন হয়নি তার ওপরে উৎপাদন খরচের চেয়ে বাজারজাত মূল্য কম হওয়ায় শতাংশ প্রতি শত টাকা করে লোকসান দিতে হচ্ছে তাদের। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ‘বুলবুলের’ প্রভাবে পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার বিভিন্ন আমন ধানের ক্ষেত ঘুরে এমনই তথ্য পাওয়া গেছে।

এদিকে এখন পর্যন্ত সরকারিভাবে ধান  কেনা কার্যক্রমও শুরু হয়নি। তবে ধান কেনার প্রচার-প্রচারণা চলছে। কিন্তু ধান বিক্রির প্রক্রিয়া জটিল হওয়ায় কৃষকরা বিপাকে পড়েছে। এছাড়া চারভাগের একভাগ কৃষক কেবল সরকারের কাছে ধান বিক্রি করতে পারবে। ফলে এসব জটিলতা ও লোকসানের কারণে আগামী মৌসুমে ধান আবাদে উৎসাহ বিমুখ হয়ে পরেছেন কৃষকরা।

আমন চাষিরা জানান, এক মণ ধান উৎপাদনে বীজ, সার, ওষুধসহ নানা খরচ থেকে শুরু করে বাজার পর্যন্ত নিতে ৭০০-৭৫০ টাকা খরচ হয়। কিন্তু বর্তমানে এক মণ ধানের বাজার দাম ৫২০-৫৫০ টাকা। শ্রমের কোনো মূল্যই নেই।

ছোট বাইশদিয়া ইউনিয়নের সাজির হাওলা গ্রামের আমন চাষি জাহাঙ্গীর হাওলাদার ভাঙা কণ্ঠে আক্ষেপ করে বলেন, ধান লাগাইয়া লাভ কি? যা খরচ ওয় (হয়), তাইতো ওডে (ওঠে) না।

জাহাঙ্গীর বলেন, আল্লাহ ধানতো দেছে মোটামুটি, ধানেরতো দাম পাই না। টাহা (টাকা) বদলা-কামলারে দিয়া হ্যারপরতো (তারপর) আমাগো কিছু থাহে না। আল্লাহ তো অনেক খন্দ (ফলন) দেছে এবার, তাতে কি লাভ হইছে?

তিনি আরও জানান, বর্তমানে ১ কেজি পোঁজের দাম ২৬০ টাকা আর ১ মণ ধানের দাম ৫২০-৫৫০ টাকা। অর্থাৎ ২ কেজি পেঁয়াজের দামে ১ মণ ধান।

কৃষি বিভাগ জানিয়েছেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের ক্ষয়ক্ষতির কারণে এবার আমন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্র অর্জন হয়নি। প্রতি হেক্টরে তাদের লক্ষ্যমাত্র ছিল ৩ দশমিক ৫ মেট্রিকটন। কিন্তু প্রতি হেক্টরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ধানের উৎপাদন কম হয়েছে। সেই ক্ষতি পুষিয়ে আনতে সরকারিভাবে ধান কেনার জন্য প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এজন্য মাইকিং ও লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। এ উপজেলায় মোট ১৮ হাজার ১৩ জন কৃষক এবার আমন আবাদ করেছে। এরমধ্যে কার্ডধারী মাত্র ৪ হাজার কৃষকের ধান কিনবে সরকার। ফলে বেশিরভাগ কৃষক হতাশাগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন।

উল্লেখ্য, এ উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নে ৩৫ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ করা হয়েছে। এরমধ্যে উফশী ২২ হাজার এবং স্থানীয় জাতের ১৩ হাজার ৫০০ হেক্টর।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার রাঙ্গাবালী, ছোটবাইশদিয়া, বড়বাইশদিয়া, চরমোন্তাজ ও চালিতাবুনিয়া ইউনিয়নে প্রত্যাশার চেয়ে আমনের ভালো ফলন হয়েছে। মাঠভরা পাকা সোনালী ধান উৎসবমুখর পরিবেশে কাটা। আর আঁটি বেঁধে বাড়ির উঠান কিংবা নির্ধারিত জায়গায় নিয়ে যাওয়া। সেখানে মাড়াই করে রোদে শুকানো। পরে গোলায় তোলা।

এসব কাজে কৃষকের পাশাপাশি কৃষাণিরাও ব্যস্ত সময় পার করছে। তবে বর্তমানে ধানের বাজারদর মন্দা থাকায় তাদের এই শ্রম বৃথা হয়ে যাবে নাতো, এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কৃষক পরিবারের।

কথা হয় উপজেলার ছোটবাইশদিয়া ইউনিয়নের উত্তর চতলাখালী গ্রামের কৃষক রেজাউলের সঙ্গে। তিনি ৪-৫ জন কৃষকের সঙ্গে ধান কাটছিলেন। কাজের ফাঁকে বলেন, ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের প্রভাব কাটিয়ে মোটামুটি ধানের খন্দ (ফলন) হইছে। কিন্তু  বাজারে দাম নাই। শেষ পর্যন্ত যদি দাম না উঠে (বাড়ে) তাহলে লোকসানতো হবেই, কষ্টও যাবে বৃথা।’

স্থানীয় কৃষকরা জানান, মাঠের ফলন দেখে কৃষকরা খুশি হয়েছিল। কিন্তু বাজারদর দেখে ততোটাই নাখোশ হয়েছে। অনেক কৃষক ঋণ কিংবা ধারদেনা করে ধান আবাদ করেছে। সেই দেনার বোঝা হালকা করতে কম দামেই ধান বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। কিন্তু সরকার ধান কেনা শুরু করলে এ সংকট নিরসন হবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

দিনমজুরদের সঙ্গে ধান আঁটি বাঁধায় ব্যস্ত উপজেলার রাঙ্গাবালী ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের কৃষক নাজির হাওলাদার বলেন, নিজের সঞ্চয় ও ঋণ করে ৬৫০ শতাংশ জমিতে আমন দিছি। কিন্তু বাজারে ধানের দাম নাই। ৬০০ টাকা রোজে চারজন দিনমজুর ধান কাটে। দিনমজুরের টাকা আর ঋণের কিস্তি দিতে এখন কম দামেই ধান বেচতে হইবে, উপায় নাই। প্রত্যেকবার এইভাবে লোকসান হলে ধান দেওয়া বাদ দিয়ে অন্য কাজ করবে মানুষ।

এসময় ওই গ্রামের আরেক কৃষক আলী আহম্মেদ মুন্সি বলেন, সবাই লাভের আশায়ই চাষবাস করে। আমি ৩০ কড়া জমিতে ধান লাগাইছি। কিন্তু এহন (এখন) দেখছি, লাভতো দূরের কথা চালানই (মূলধন) শেষ।

এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্বে) মো. আব্দুল মন্নান বলেন, সরকারিভাবে ধান কেনা শুরু হলেই ধানের দাম বৃদ্ধি হয়ে যাবে।