চমকে যাবেন পিঁপড়ার ভাষা আর পথচলার কৌশল জানলে

Thursday, November 28th, 2019
পিঁপড়ার ভাষা আর পথচলার কৌশল জানলে চমকে যাবেন

ডেস্ক নিউজঃ গুটি গুটি পায়ে সবখানে ঘুরে বেড়ানো প্রাণী পিঁপড়া। গর্তের ভেতর থেকে কিলবিল করতে করতে বেরিয়ে আসে ঝাঁকে ঝাঁকে। পৃথিবী জনসংখ্যার বিস্ফোরণে টালমাটাল। তলে তলে পিঁপড়ারাও যে ওজনের দাঁড়িপাল্লায় মানুষের প্রধান চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠছে, সে খবর আমরা কয়জন রাখি?

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির প্রাণিবিজ্ঞানী অধ্যাপক এডওয়ার্ড ওসবোর্ন উইলসন সারা জীবন কাটিয়ে দিলেন পিঁপড়ার চরিত্র অনুসন্ধান নিয়ে। অনেক বই লিখেছেন তিনি। এ রকমই একটি বই ১৯৯৪ সালে প্রকাশিত ‘জার্নি টু দ্য অ্যান্টস’। সহযোগী গবেষক বার্ট হোয়েলডব্লার-এর সঙ্গে ওসবোর্ন লিখেছেন, দাঁড়িপাল্লার এক দিকে পৃথিবীর সব পিঁপড়া চাপালে তা অন্য ধারে সব মানুষের মিলিত ওজনের সমান হবে। সাংঘাতিক কথা!

বিবর্তনের ইতিহাসে মানুষের আগে পিঁপড়া। প্রায় ১৪ কোটি বছর আগে ক্রিটেশিয়াস যুগে পিঁপড়ার উদ্ভব। মানুষ সে তুলনায় অনেক নবীন, মাত্র ৩০ লাখ বছর আগে। মানুষ উন্নত। সাধারণত তারা নিজের প্রজাতির অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগে মুখনিঃসৃত শব্দ কাজে লাগায়। পিঁপড়ারাও ‘কথা’ বলে, তবে তা অন্যভাবে।

তারা অত্যন্ত উন্নত এক যোগাযোগ ব্যবস্থার মালিক। নানাভাবে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রেখে খাবার সংগ্রহ করে, প্রজনন করে, সন্তান লালন করে, এমনকি যুদ্ধ‌ও করে। তাদের যোগাযোগের একটি মাধ্যম হলো ফেরোমন।

ফেরোমন হলো রাসায়নিক পদার্থ। পিঁপড়ার নাক নেই। তারা রাসায়নিকটাকে শনাক্ত করতে পারে মাথার অ্যান্টেনা দিয়ে। অ্যান্টেনা রাসায়নিক-সংবেদী অঙ্গ। রাসায়নিকটি দেহের কিছু গ্রন্থি থেকে নিঃসৃত হয়। ফেরোমন হলো একটি নয়, একগুচ্ছ রাসায়নিক। তাদের জীবনে ফেরোমনের গুরুত্ব অপরিসীম। ফেরোমনই কোটি কোটি বছর তাদের টিকে থাকার চাবিকাঠি। কাজের প্রকৃতির দিক থেকে ফেরোমন দু’ধরনের। ট্রেল ফেরোমন আর অ্যালার্ম ফেরোমন। প্রথমটার মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ, খাবারের খোঁজ করা, খাবার নিয়ে আসা, প্রজনন, কলোনির সীমানা নির্দেশ— এ রকম নানা ধরনের কাজ হয়। আর দ্বিতীয়টায় হয় সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সহকর্মীদের সাবধান করা ও যুদ্ধের জায়গায় ডেকে আনা আর শত্রুকে তাড়ানো। তাড়ানো মানে, এক প্রজাতির পিঁপড়া ভুল করে বা ইচ্ছা করে অন্য প্রজাতির এলাকায় ঢুকে পড়লে তার ফেরোমন-কোড অন্য প্রজাতির সঙ্গে মেলে না। সে তখন সাবধান হয়ে যায়।

ট্রেল ফেরোমন বিষযুক্ত আর বিষহীন পিঁপড়াদের শরীরের একাধিক গ্রন্থি থেকে বের হয়। কিছু পিঁপড়া, যেমন, বুলেট অ্যান্ট, ফায়ার অ্যান্ট, ইউরোপীয় ফায়ার অ্যান্ট-দের উদরের শেষে হুল থাকে। হুলের গোড়ায় থাকে বিষগ্রন্থি। এই বিষই শত্রুকে ঘায়েল করতে কাজে লাগে আর ফেরোমন হিসেবে কাজ করে। বিষহীনদের শরীরের পিছনে থাকে ডিউফোর গ্রন্থি। খাদ্যনালীর পিছনে থাকা এই অংশ থেকে ফেরোমন বের হয়। এক প্রজাতির ফেরোমন সঙ্কেত অন্য প্রজাতির থেকে আলাদা। ফেরোমন যেন গোপন কোডের মতো কলোনির নিজস্বতা বজায় রাখে।

কলোনি থেকে বেরিয়ে খাবারের খোঁজে পিঁপড়া কর্মীরা নানা দিকে যায়। যাওয়ার সময় দেহের শেষ প্রান্ত থেকে বিন্দু বিন্দু ফেরোমন মাটিতে ফেলতে ফেলতে যায়। আসলে বিন্দু বলতে যতটা বোঝায়, এটা তার থেকে অনেক কম। কণা কণা, বলা যেতে পারে। খাবার না পেলে নিজের ফেলে যাওয়া ফেরোমন-সঙ্কেত ধরেই কর্মী বাসায় ফেরত আসতে পারে। কিন্তু খাবার পেলে মুখে করে কিছুটা নমুনা নিয়ে আসে আর ফেরত আসার পথে আগের ফেলে আসা কণাগুলোর মাঝে মাঝে আবার ফেরোমন ফেলে আসে। ফলে ফেরোমনের একটা রেখা তৈরি হয়। মানে দাঁড়াল, যাওয়ার সময় বিচ্ছিন্ন কণা-পথ আসার সময় অবিচ্ছিন্ন রেখা-পথে পরিণত হলো। মুখের স্যাম্পেল টেস্ট করে বাকিদের পছন্দ হলে ওই ফেরোমনের টানা রেখা ধরে খাবারের কাছে পৌঁছাতে বাকিদের আর কোনো অসুবিধাই হয় না। একাধিক পিঁপড়া যখন একই পথে ফেরোমন কণা ফেলতে ফেলতে যায় আর আসে, তখন তৈরি হয় ফেরোমন ‘হাইওয়ে’। খাবার শেষ হয়ে গেলে পিঁপড়ারা আর ফেরোমন ফেলে না। একটু বাদেই ফেরোমন উবে গেলে ‘হাইওয়ে’র আর চিহ্নই থাকে না।

অ্যালার্ম ফেরোমন কর্মীদের মধ্যে আক্রমণাত্মক ভাব জাগিয়ে তোলে। অ্যান্টেনা ও সামনের জোড়া পায়ে সহকর্মীকে স্পর্শ অনেকের মধ্যে যুদ্ধং-দেহি ভাব জাগিয়ে তোলে। এমন যুদ্ধের পরিবহে সাধারণ কর্মীরা খুব একটা সক্রিয় না থাকলেও, সৈনিক-কর্মীরা মুখ হাঁ করে, সামনের জোড়া পা উপরে তুলে আর উদরের পিছনের অংশ উপরে তুলে শত্রুর সামনে ‘পজ়িশন’ নেয়। অনেকটা ঠিক, ‘আয় দেখি কত বড় বাহাদুর হয়েছিস, আয় লড় দেখি। এর পরই শুরু হয়ে যায় তুমুল লড়াই। লড়াইগুলো চলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মৃত্যু পর্যন্ত।