পাচার হয় করের ৩৬% পরিমাণ টাকা

Thursday, November 21st, 2019

প্রতীকী ছবিপ্রতীকী ছবি

ডেস্ক নিউজঃ বাংলাদেশে বছরে যত টাকা কর আদায় হয়, তার ৩৬ শতাংশের সমান টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যায়। এই তথ্য দিয়েছে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড)। ২০১৫ সালে কী পরিমাণ কর আদায় হয়েছিল, তা বিবেচনা করে অর্থ পাচারের হিসাব করেছে আঙ্কটাড। তবে ওই বছর কত অর্থ পাচার হয়েছে, তা বলা হয়নি।

আঙ্কটাড বলেছে, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে সিংহভাগ অর্থ পাচার হয়। গত চার বছরে টাকা পাচারের পরিমাণ আরও বেড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদেরা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ দেশে কর-রাজস্ব আদায় হয়েছিল ১ লাখ ৪০ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা। আঙ্কটাডের দেওয়া তথ্য বিবেচনা করলে ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ৫০ হাজার ৬৪০ কোটি টাকার মতো পাচার হয়েছে।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) নিয়ে গতকাল বুধবার প্রকাশিত আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ৪৭টি স্বল্পোন্নত দেশের প্রায় সব দেশ থেকেই কমবেশি অর্থ পাচার হয়। স্বল্পোন্নত দেশগুলোর কর আদায়ের ৩৬ থেকে ১১৫ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ পাচার হয়ে যায়।

আঙ্কটাডের পক্ষে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। প্রতিবেদনটি প্রকাশ উপলক্ষে রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন ডাকা হয়।

আঙ্কটাড বলছে, আমদানি–রপ্তানি কার্যক্রমের মাধ্যমে কর ফাঁকি রোধ করা বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের যে বাণিজ্য হয়, এর ৭ শতাংশের সমপরিমাণ মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে হয়।

টাকা পাচার সম্পর্কে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, কর রাজস্বের অনুপাতে হয়তো টাকা পাচারের হিসাবটি ঠিকই আছে। গত কয়েক বছরে কর আদায় বেড়েছে, তাই টাকা পাচারের পরিমাণও বেড়েছে। অনেক দিন ধরেই এ দেশ থেকে ব্যাপক হারে টাকা পাচার হচ্ছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। কত টাকা পাচার হয়েছে, তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।

তাঁর মতে, যত দিন বেআইনিভাবে টাকা অর্জনের উপায় থাকবে, তত দিন টাকা পাচার হতেই থাকবে। বাংলাদেশ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় ঘুষ প্রদানে এক নম্বর। এই ব্যাপকতা যত দিন থাকবে, তত দিন কালোটাকা অর্জিত হবে। তিনি আরও বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চাপের মুখে টাকা পাচারে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ফল কি আসছে? আমার উত্তর, না।’

আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমের মাধ্যমে টাকা পাচারের ঘটনা বেড়েছে। সম্প্রতি টাকা পাচারের কিছু ঘটনাও বেরিয়ে এসেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এমন বেশ কয়েকটি ঘটনা তদন্ত করেছে। যেমন ক্রিসেন্ট গ্রুপের প্রতিষ্ঠান রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার লিমিটেডের পণ্য রপ্তানিতে ১৯০টি বিলের বিপরীতে ৩৭৮ কোটি ৯ লাখ টাকা রপ্তানিমূল্য প্রত্যবসিত হয়নি। এর মানে, এই টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। চলতি মাসেই ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এ কাদেরসহ ১৫ জনের বিরুদ্ধে টাকা পাচারের মামলা হয়েছে।

গত বছর এসবি এক্সিম নামের একটি প্রতিষ্ঠান টেরাকোটা টাইলস রপ্তানির নামে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে পাচার করেছে। এ ছাড়া কয়েক বছর আগে পোশাক রপ্তানি করে বিসমিল্লাহ গ্রুপ প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা পাচার করে।

টাকা কীভাবে পাচার হয়, এর উত্তরে সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য গতকালের সংবাদ সম্মেলনে বলেন, টাকা পাচারের ৮০ শতাংশই হয় আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রমে মিথ্যা ঘোষণার মাধ্যমে। টাকা পাচার রোধ করা গেলে কর আহরণ আরও বাড়ত। ওই টাকা দেশেই বিনিয়োগ হতো।

Untitled-4গত রোববার রাজধানীতে মানি লন্ডারিং নিয়ে রাজধানীতে এক আলোচনা সভা হয়। সেখানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, দুদক বিশ্বাস করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে টাকা পাচার (মানি লন্ডারিং) হয় আমদানি-রপ্তানির নামে। গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটিসহ বিভিন্ন সংস্থার বৈশ্বিক সূচকে দেখা যায়, প্রায় ৮০ শতাংশ টাকা পাচার হয় বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রমে।

কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই) বিভিন্ন দেশ থেকে অর্থ পাচার নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। গত জানুয়ারি মাসে সর্বশেষ প্রতিবেদনটি প্রকাশ করে জিএফআই। সেখানে বলা হয়েছে, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে ৫৯০ কোটি ডলার বা প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এই হিসাবটির সঙ্গে গতকাল প্রকাশিত আঙ্কটাডের হিসাবের মিল আছে।

জিএফআইয়ের ওই প্রতিবেদনে ১৪৮টি উদীয়মান ও উন্নয়নশীল দেশের অর্থ পাচারের তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০১৫ সালে অর্থ পাচারে বাংলাদেশের অবস্থান ১৯তম। ২০১৪ সালের জিএফআইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই বছর বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বা সাড়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদন
আঙ্কটাডের প্রতিবেদনে টাকা পাচার ছাড়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ঝুঁকি ও করণীয় বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাতে বিদেশি ঋণের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে কমে ২ শতাংশে নেমে এসেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে তা বেড়ে ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। দায়দেনা সঠিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে আরও সতর্ক হতে হবে।

আঙ্কটাডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলডিসির টেকসই উন্নয়নের জন্য রাজস্ব-জিডিপির অনুপাত ১৫ শতাংশ দরকার। এলডিসিগুলোর গড় রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত ২০০০ সালে ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ২০১৭ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৯ শতাংশ। বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত এখনো ৯ শতাংশের মতো। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের কর আহরণ এখনো দুর্বল।

এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশ এখন অনুদান বা নমনীয় ঋণ থেকে কঠিন শর্তের ঋণের দিকে যাচ্ছে। অবকাঠামো খাতে কঠিন শর্তের ঋণ পাওয়া যাবে। কারণ, অবকাঠামো নির্মাণ করলে দ্রুত সুবিধা পাওয়া যাবে। কিন্তু স্বাস্থ্য, শিক্ষার মতো সামাজিক খাতে কঠিন শর্তের ঋণ পাওয়া যাবে না। তাই এই খাতের অর্থায়ন চাহিদা মেটাতে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ আহরণ বাড়াতে হবে।

অনুষ্ঠানে এলডিসি প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান। এ ছাড়া বক্তব্য দেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম প্রমুখ।