জমে উঠেছে উত্তরবঙ্গের বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থান হাটে আগাম শীতের সবজির বাজার

Wednesday, November 20th, 2019

 

রশিদুর রহমান রানা (শিবগঞ্জ, বগুড়া প্রতিনিধি) বগুড়া জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার উত্তরে ঐতিহাসিক শিবগঞ্জ উপজেলা মহাস্থান হাটে আগাম শীতকালীন সবজির কাঁচা বাজার বেশ জমে উঠেছে । সপ্তাহে শনিবার ও বুধবার হাট ছাড়াও প্রতিদিন বগুড়ার সদর, শিবগঞ্জ, সোনাতলা, গাবতলী, কাহালু, ক্ষেতলাল ও কালাই উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষকগণ তাদের উৎপাদিত সবজি বিক্রি করতে আসেন এ হাটে।

মহাস্থান সবজি বাজার ঘুরে দেখাযায় হাটের বিশাল মাঠের অংশজুড়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে শীতকালীন সবজি ফুলকপি ও বাঁধাকপি। একপাশে ডাটা আর অন্য পাশে শোভা পাচ্ছে সারিসারি বাঁধাকপি। ভ্যান, ভটভটি বোঝায় মুলাগুলো যেন নজর কাড়ছিল। স্তপ থেকে ঝাঁঝ ছড়াচ্ছিলো পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচের লাল ও সবুজ রংয়ের বেগুনের তো গুণেরই শেষ নেই। করলা,পেঁপে, লাউ শোভা পাচ্ছিলো গাঢ় সবুজে। তরতাজা এসব সবজির গায়ে তখনও লেগেছিল শিশিরকণা। সবজিগুলোর ক্ষেত থেকে তুলে সরাসরি বিক্রি করতে বাজারে নিয়ে এসেছে কৃষক। ভোর থেকে তাদের এই বিক্রির আয়োজন চলে।

ক্ষেত থেকে সবজি তোলার পর ভটভটি, ভ্যান, রিকশা, বাইসাইকেল সহ বিভিন্ন যানবাহনের মাধ্যমে সকাল ৭টার মধ্যেই কৃষকরা সবজি নিয়ে এই বাজারে উপস্থিত হয়। বাজারে পা রাখা মাত্র স্থানীয়সহ দেশের নানা প্রান্তর থেকে আসা পাইকাররা ঘিরে ধরে কৃষকদের। যে যার মতো সবজি নিয়ে বাজারের নির্ধারিত স্থানে গিয়ে অবস্থান নেন। পরে পাইকাররা দরদাম কষে সবজি কিনতে শুরু করেন। এভাবেই দিনব্যাপী চলে সবজি কেনা-বেচা। বিকেল হতেই দূর-দূরান্তর পাইকারদের কেনা ছোট খাটো যানবাহনে সবজি নিয়ে ছুটে যান নিজ এলাকার বাজারগুলোতে,আর দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাড়রা তাদের সবজি কিনে রাজধানী ঢাকা, চট্রগ্রাম, সিলেট, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ তাদের নিজ নিজ আড়ৎ এ নিয়ে যায় প্রতিদিন ৫০/৬০ টি ট্রাক সবজি নিয়ে লোড হয়ে থাকে বলে শ্রমিক নেতা খায়রুল ইসলাম খাজা জানান। এ কাজে পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও দেখা যায়।

স্থানীয় ইউপি সদস্য তোফাজ্জল হোসেন তোফা, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান জিয়া, সিরাজুল ইসলাম সহ হাটে আশা কৃষক ফজলুর রহমান, গোলাম রব্বানী, আমজাদ হোসেন, লাল মিয়া, লুৎফর রহমান সহ বেশ কয়েকজন কৃষকদের সাথে কথা বললে তারা জানান, বগুড়া জেলার মধ্যে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী মহাস্থান কাঁচা বাজার সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম। রাজধানী ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকাররা এখানে নিয়মিত আসেন। এছাড়া স্থানীয় ভাবে বড় পাইকাররাও কেনাকাটার জন্য এ মোকামের ওপর নির্ভরশীল। তাই সব সময়ই মহাস্থান বাজারে পণ্যের ব্যাপক চাহিদা হয়ে থাকে।

তারা আরও জানান, আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় গতবারের থেকে এবছর শীতকালীন সবজির আবাদ ভালো হয়েছে। বাজারেও সবজির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। দামও বেশ ভালো। সব মিলিয়ে এ মোকামে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণ সবজির আমদানি ঘটাচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষকেরা, করতোয়া নদীর তীর ঘেষে এই হাটে, রংপুর বগুড়া মহাসড়ক সংলগ্ন হওয়ায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো থাকায় রাজধানী ঢাকা সহ দেশের প্রসিদ্ধ সব বাজারগুলোতে খুব সহজেই পৌঁছানো যায় মহাস্থান হাটের সবজি। শক্তিশালী হাট পরিচালনা কমিটি দ্বারা পরিচালিত ঐতিহাসিক মহাস্থান হাটের সূদৃঢ় মনিটরিং ব্যবস্থার কারণে লেনদেন ঝুঁকিমুক্ত হওয়ায় সারা বছর এখানে পাইকারি ব্যবসায়ীদের সমাগম হয়ে থাকে।

হাট ইজারাদার রায়নগর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ সফিকুল ইসলাম শফি ও হাট পরিচালনা কমিটির সদস্য বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সমাজ সেবক আলহাজ্ব আজমল হোসেন,মোশারফ হোসেন জানান, প্রতিদিন এখানে প্রায় ৩০ থেকে ৪০লক্ষ টাকার সবজি ক্রয়-বিক্রয় হয়ে থাকে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় এখানে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সমাগম ঘটে প্রচুর।

সবজির হাটে সরেজমিনে দেখা যায় বিচিত্র ধরণের শীতের সবজির সমারোহ। পাইকারি হিসেবে ফুলকপি-৯০০-১২০০টাকা মন, বাঁধাকপি-১০০০-২০০০টাকা, করোলা-১৫০০-১৮০০টাকা মন, পাতা-পিঁয়াজ- ২০০০-২৮০০টাকা মন, মুলা-৮০০-১০০০টাকা মন, বেগুন-১২০০-১৪০০টাকা মন, ঝিঙে-১০০০-১২০০টাকা মন, পটল-৮০০-১২০০টাকা মন, সবুজ লাউ-২৫০০-৩০০০টাকা ১০০পিছ এবং কাঁচা মরিচ-১০০০-১২০০টাকা মন দামে বিক্রি করছেন কৃষকরা।

অন্য পাইকাররা সবজি কিনতে নিয়মিত এ মোকামে আসেন। কারণ এখানে চাহিদা মতো প্রায় সব ধরনের টাটকা তরতাজা সবজি পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে উত্তরবঙ্গের বগুড়ার ঐতিহাসিক মহাস্থান সবজী বাজার বেশ জমে উঠেছে। প্রতিদিন নারী-পুরুষ কাজ করতে পেরে তাদের বাড়তি আয় ভালো হওয়ায় তারাও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে স্বাছন্দে জীবন যাপন করছে বলে বেশ কয়েকজন শ্রমিকদের সাথে কথা বললে তারা জানান।