একদিন নবীজির বাড়িতে

Friday, November 8th, 2019

আয়েশা (রা.) জানালেন, আমার কাছে এক মহিলা এলেন। তার সঙ্গে ছিল তার দুই মেয়ে। সে আমার কাছে কিছু চাইল। আমার কাছে তাকে দেওয়ার মতো একটি খেজুর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটাই তাকে দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করল। তারপর এ খেজুরটি দুই মেয়ের মাঝে বণ্টন করে দিল। তা থেকে নিজে খেল না। তারপর আমার কাছ থেকে উঠে পড়ল। তার দুই মেয়েকে নিয়ে চলে গেল। (কিছুক্ষণ পর) আমার কাছে নবী (সা.) এলেন। তাঁর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করলাম। সব শুনে নবী (সা.) বললেন ‘যাকে কয়েকজন মেয়ে দেওয়া হয়েছে। সে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে। এ মেয়েরা দোজখ থেকে আত্মরক্ষার দেয়াল হবে তার জন্য।’ (মুসলিম : ১৬/১৭৯)

নবীজি (সা.) তাঁর নিজের সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন। তা এই মুহূর্তে না বললেই নয়। তিনি (সা.) বলেছেন ‘আমি তো অভিশাপ দেওয়ার জন্য আসিনি। এসেছি রহমত হিসেবে।’ ওমর (রা.) এর সামনে একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন ‘খ্রিষ্টানরা মিরয়ম পুত্র ঈসা (আ.) এর প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করেছে। তোমরা আমার অতিপ্রশংসা করো না।’ জুনদুব ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, আমি নবীজিকে বলতে শুনেছি, তিনি (সা.) বলেছেন ‘তোমাদের কাউকে অন্তরঙ্গ বন্ধু (খলিল) বানানোর অভিযোগ থেকে আমি আল্লাহর দরবারে মুক্ত। আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু তো আল্লাহই হয়েছেন। যেমন ইবরাহিম (আ.) এর অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়েছেন আল্লাহ। হ্যাঁ, যদি আমার উম্মত থেকে কাউকে আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু বানাতাম, তাহলে আমি আবু বকরকে খলিল বানাতাম।’ (মুসলিম : ৫/১৩)।
রাসুল (সা.) আরও এরশাদ করেন ‘একটি কথা ভালোভাবে শুনে রাখ তোমাদের পূর্বে যেসব জাতি এসেছে, তারা তাদের নবীদের কবরকে সিজদার স্থান হিসেবে গ্রহণ করেছে। সাবধান! কবরগুলোকে সিজদার স্থান করো না। আমি অবশ্যই এসব থেকে কড়াভাবে নিষেধ করছি।’ (মুসলিম : ৫/১৩)।

নবীজি (সা.) এর সন্তানবাৎসল্য
নবীজি যুগের আগের কথা। নবীজি জীবনের শুরু দিকেরও কথা। সেই সময়কে বলা হয় জাহেলি যুগ। অন্ধকার আর মূর্খতার যুগ। সেই সময়ে মেয়ে হয়ে জন্ম নেওয়া কী যে কষ্টের ছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আজকের বাবারা তুলনামূলক মেয়েদের বেশি আদর করেন। আর সেই সময়ে বাবারাই ছিল মেয়েদের প্রধান শত্রু। মেয়ে জন্মের পর বাবাদের মুখ কালো হয়ে যেত। কারও কাছে মেয়ে জন্মের কথা বলতে মুখ শুকিয়ে যেত। মেয়ে জন্ম দেওয়ায় নিজেকে দাঁড় করাত লজ্জাজনক কাজ সম্পাদনকারীদের কাতারে। ক্ষোভে আর লজ্জায় শেষ পর্যন্ত মেয়েটিকে মেরেই ফেলত। জীবন্ত কবর দিত। আর কিছু না করলেও মেয়েটিকে দেখলেই মুখ ভার করে রাখত।
সে যুগে ওয়াহশি (হিংস্র) নামক এক লোক ছিল। যেমন নাম, তেমন তার কাজ। তার একটি মেয়ে হলো। মেয়েটিকে সঙ্গে সঙ্গে সে হত্যা করল না। ধীরে ধীরে মেয়েটি বড় হলো। এখন সে আব্বু আব্বু বলে ডাকতে পারে। বাইরে থেকে তার আব্বু এলে দৌড়ে গিয়ে কোলে উঠতে পারে। মিষ্টি মিষ্টি চেহারা। বাবার ভালো লাগার মতোই মেয়ে। বয়স মাত্র ৬ বছর। হঠাৎ ওয়াহশির মনে কী যেন উদয় হলো। ভাবান্তরে পড়ে গেল। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল। কোদাল বেলচা হাতে নিয়ে চলল ময়দানে। সেখানে গিয়ে একটি গভীর গর্ত খনন করল। গর্ত খুঁড়ে চলে এলো বাড়িতে। ডাকল তার স্ত্রীকে। বলল, তোমার মেয়েকে ভালো করে সাজিয়ে দাও। তাকে এক জায়গায় নিয়ে যাব। মা তার মেয়েকে খুব ভালো করে সাজিয়ে দিল।
মেয়ে চলেছে তার বাবার সঙ্গে। মেয়ের আনন্দ আর ধরে না। বেড়াতে যেতে কার না ভালো লাগে?
যেতে যেতে পৌঁছল তারা সেই গর্তের কাছে। ওয়াহশি মেয়েকে দাঁড় করাল এর কিনারায়। মেয়েকে বলল, দেখত এর ভেতর কী আছে? মেয়ে এগিয়ে যায় তা দেখার জন্য। মাথা ঝুঁকিয়ে দেয় গর্তের দিকে। অমনি পাষ- বাবা তার মেয়েকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয় গর্তে।
মেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে : বাবা! আমি গর্তে পড়ে গেছি। আমাকে তাড়াতাড়ি তোল। আমার ভীষণ ভয় করছে। বাবা! বাবা! আমাকে তোল।’ মেয়ের ডাকের জবাবে বাবা দ্রুত মাটি ফেলতে থাকে গর্তে। ডাক আসে, ‘বাবা! আমাকে উঠাও।’ আরও দ্রুত মাটি ফেলতে থাকে ওয়াহশি। ধীরে ধীরে ভরে যায় গর্ত। মেয়ের চিৎকার আর ‘বাবা’ ডাকও একসময় হারিয়ে যায় মরু ময়দানের সেই গর্তে। ওয়াহশি যেন একটা ভালো কাজ করতে পেরেছে সেই গর্ব নিয়ে ফিরে আসে বাড়িতে। (আস-সিরাহ : ৪৭-৪৮)।
এমনই যুগের কথা বলছি। সেই সময়েই নবীজি (সা.) এ পৃথিবীর বুকে এলেন। সম্মানিত করলেন নারী জাতিকে। নারী মর্যাদা পেল বোনের, মর্যাদা পেল স্ত্রীর, মর্যাদা পেল মায়ের, খালার, ফুফুর। মেয়েরা হলো আদরের কন্যা, ভগ্নি, ভাতিজি। নবীজির ভালোবাসা সবচেয়ে বেশি পেল মেয়েরা। নবীজি (সা.) যখন তাঁর কন্যা ফাতেমা (রা.) এর কাছে আসেন, তখন তিনি ফাতেমার হাতটি ধরে তাতে চুমু বসিয়ে দেন। নিজের জায়গা থেকে সরে নিজের স্থানটিতে আদর করে মেয়েকে বসান। ফাতেমা (রা.)ও রাসুলে করিম (সা.) এর জন্য পাগলপারা। নবীজি যখন তার বাড়িতে যান, সঙ্গে সঙ্গে তিনি দাঁড়িয়ে যান। নবীজির হাত ধরে হাতে চুমু দেন, আর তার নিজের বসার স্থানে নবীজিকে বসান।’ (সিরাতুন নবী : ৬/১০৬)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) শুধু নিজের মেয়েকে আদর করেন, এমন নয়। অন্যদের আদর করতে উৎসাহিত করেন।
আয়েশা (রা.) জানালেন, আমার কাছে এক মহিলা এলেন। তার সঙ্গে ছিল তার দুই মেয়ে। সে আমার কাছে কিছু চাইল। আমার কাছে তাকে দেওয়ার মতো একটি খেজুর ছাড়া আর কিছুই ছিল না। এটাই তাকে দিয়ে দিলাম। সে তা গ্রহণ করল। তারপর এ খেজুরটি দুই মেয়ের মাঝে বণ্টন করে দিল। তা থেকে নিজে খেল না। তারপর আমার কাছ থেকে উঠে পড়ল। তার দুই মেয়েকে নিয়ে চলে গেল। (কিছুক্ষণ পর) আমার কাছে নবী (সা.) এলেন। তাঁর কাছে এ ঘটনা বর্ণনা করলাম। সব শুনে নবী (সা.) বললেনÑ ‘যাকে কয়েকজন মেয়ে দেওয়া হয়েছে। সে তাদের সঙ্গে ভালো আচরণ করেছে। এ মেয়েরা দোজখ থেকে আত্মরক্ষার দেয়াল হবে তার জন্য।’ (মুসলিম : ১৬/১৭৯)।
আনাস (রা.) বললেন, নবী (সা.) বলেছেন ‘যে ব্যক্তি দুটি কন্যাসন্তানকে লালন-পালন করে বড় করল, সে আমার সঙ্গে মিলিত হয়ে কেয়ামত দিবসে উপস্থিত হবে। নবীজি তাঁর দুই আঙুল একত্রিত করে মিলিত হওয়া দেখালেন।’ (মুসলিম : ১৬/১৮০)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মেয়ে ফাতেমা বিশ্বের সেরা চার মহিলার একজন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন ‘চারজন বিশ্বের সেরা নারী ১. খাদিজা ইবনাতু খুওয়াইলিদ (রা.), ২. ফাতিমা ইবনাতু মুহাম্মাদ (রা.), ৩. ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া ও ৪. ইমরানের মেয়ে মরিয়ম।’ (ইবন আবি শায়বাহ : ৭/৫৩০)।
আয়েশা (রা.) বললেন রাসুলুল্লাহ (সা.) এর সঙ্গে ফাতেমা (রা.) এর কথাবার্তাই বেশি মিল। যখন ফাতেমা (রা.) নবী (সা.) এর কাছে আসেন, তখন আওয়াজ দিয়ে ওঠেন। মারহাবা! মারহাবা বলেন। তার দিকে উঠে যান। তার হাত ধরে তাতে চুমু দেন। আর তার নিজের স্থানেই বসিয়ে দেন। (মুসতাদরাক : ৪/১৩৮)।
নবী পরিবারের সদস্য ও নবীজির জামাতা আলী (রা.) এর ব্যাপারে জানলাম, আয়েশা (রা.) জানালেনÑ  আল্লাহর কসম! রাসুলের কাছে পুরুষদের মাঝে আলী (রা.) এর চেয়ে প্রিয় আর কাউকে দেখিনি। আর মেয়েদের মাঝে তার স্ত্রী ফাতেমার চেয়ে প্রিয় আর কেউ ছিল না নবীজির কাছে। (মুসতাদরাক : ৪/১৩৮)।