ঠাকুরগাঁওয়ে  লাহিড়ী ফাযিল ডিগ্রী মাদ্রাসা ৭ম শ্রেণীর ছাত্রী শিক্ষিকা দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার কারণে আত্মহত্যা চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দিন যাপন করছেন – আশা মনি ।

Tuesday, September 10th, 2019
 মোঃ মজিবর রহমান শেখ ঠাকুরগাঁও জেলা প্রতিনিধি,, ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায় মোবাইলে কথার বলার অভিযোগে শিক্ষিকার দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ার পর এক  মাদ্রাসার ছাত্রী আত্মহত্যার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এখন মাসনিক ভারসাম্যহীন হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার চাড়োল ইউনিয়নের ছোট সিংগিয়া গ্রামে।  ৮ সেপ্টেম্বর রবিবার দুপুরে এমনই অভিযোগ করেন ওই শিক্ষার্থীর মা সাহেরা বেগম (৪৫)। আশা মনি (১২) ছোট সিংগিয়া গ্রামের লতিফর রহমানের মেয়ে এবং সে লাহিড়ী ফাযিল (ডিগ্রী) মাদরাসার ৭ম শ্রেণির ছাত্রী।
অভিযুক্ত ফিরোজা বেগম লাহিড়ী ফাযিল (ডিগ্রী) মাদরাসায় সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে চাকরি করছেন।
এদিকে ঘটনার ৬ মাসের মাথায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আশা মনির কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোনটি বালিয়াডাঙ্গী থানায় হস্তান্তর করেছেন এবং একটি সাধারণ ডায়েরিও করেছেন মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বলে জানান ওসি মোসাব্বেরুল হক। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক লতিফর রহমানের ৪ মেয়ের মধ্যে আশা মনি ছিল সবার ছোট। বাকি ৩ মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মা সাহেরা বেগম মানুষের বাড়িতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করেন। সংসারে ছিল তাদের অনেক অভাব। ছোট মেয়েটিকে লেখাপড়া শিখিয়ে একটি চাকরি করানোর ইচ্ছে ছিল পরিবারটির। আশা মনি এখন মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এলাকার মানুষজনও বিষয়টি নিয়ে খুবই মর্মাহত।
শিক্ষার্থীর মা সাহেরা বেগম অভিযোগ করে বলেন, সম্প্রতি ১০ মার্চ সকালে প্রতিদিনের মত আমার মেয়ে আশা মনি মাদরাসায় যায়। দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে মাদরাসা থেকে আশা মনি বাড়িতে চলে আসে; তখন তার মন খারাপ ছিল। কিছুক্ষণ পর মাদরাসা থেকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জানানো হয়, আমার মেয়েকে মাদরাসার হলরুমে লুকিয়ে ফোনে কথা বলার সময় আটক করেছে বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ফিরোজা বেগম এবং মোবাইল ফোনটি জব্দ করা হয়।
সাহেরা বেগম বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে বাড়িতে মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলে জানায় , তার বান্ধবীর মোবাইল ফোন নিয়ে সে চাপাচাপি করছিল, এসময় শিক্ষিকা ফিরোজা বেগম তাকে ফোন সহ ধরে এবং তাকে বেধরক চরথাপ্পর মারে। পরে সে বাড়িতে চলে আসে।
তিনি বলেন, বিষয়গুলো জানার , পর মেয়েকে নিয়ে বাড়ির পাশে গরুর জন্য খাস কাটতে যাই, এসময় পানি খাওয়ার কথা বলে আশা মনি বাড়িতে এসে ঘরের মধ্যে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফাঁস লাগায়। বাড়িতে গিয়ে দেখা মাত্র চিৎকার করলে আশপাশের লোকজন ছুটে আসলে আশা মনিকে মুমুর্ষ অবস্থায় উদ্ধার করে ঠাকুরগাঁও আধুনিক সদর হাসপাতালে ৪  দিন চিকিৎসা দেয় হয়।  আশা মনির অবস্থা খারাপ হলে তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৪দিন চিকিৎসা দেয়ার পর বাড়িতে আনা হয়।
শিক্ষিকার  দ্বারা লাঞ্ছিত হওয়ায় মেয়েটি দু:খ পেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করে বলে অভিযোগ স্কুলছাত্রীর মায়ের। মা সাহেরা বেগম বলেন, আশা মনিকে সুস্থ করার জন্য ধার-মহাজন করে ৬০ হাজার টাকা দিয়ে যতটুকু পেরেছি চিকিৎসা করেছি, কিন্তু মেয়েটি আমার স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি, সে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। বাবা লতিফর রহমান বলেন, আশা মনিকে চরথাপ্পর মারার অভিযোগ নিয়ে মাদরাসায় গিয়েছিলাম, বিষয়টি নিয়ে মাদরাসায় শালিস বৈঠকের কথা ছিল পরবর্তীতে এটি নিয়ে কেউ আর সাড়া দেয়নি। টাকা পয়সার অভাবে মামলাও করতে পারছি না। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চেয়েছেন। আশা মনির সাথে কথা বলার চেষ্টা করা হলে সে খাতায় লিখে অভিযোগ করেন মাদরাসার শিক্ষিকা ফিরোজা বেগম তাকে মারপিট করেছে, এ লাঞ্ছনা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেঁছে নিয়েছিল। আশা মনির সহপাঠি নারগিস আক্তার বলেন, প্রতিদিন আশা মনি ও আমি মাদরাসায় যাই, সেদিন ফোনের ঝামেলা নিয়ে আশা মনিকে চর-থাপ্পর দেয় শিক্ষিকা ফিরোজা বেগম। বাড়িতে ফিরে আশা মনি আত্মহত্যার চেষ্টা করে।
স্থানীয় বাসিন্দা কহিনুর বেগম ও সেলিনা আক্তার বলেন, শিক্ষিকার লাঞ্ছনা সইতে না পেয়ে আশা মনি আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আজ মেয়েটি মানষিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছে। এ দায় কে নেবে? একজন শিক্ষিকা আচরণ এমন হতে পারেনা।
অভিযুক্ত মাদরাসার সহকারী শিক্ষিকা ফিরোজা বেগমের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, আশা মনিকে মোবাইলে কথার বলার সময় ধরা হয়, তারপর বিষয়টি তার পরিবারকে জানানো হয়। চরথাপ্পর মারা হয়েছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, আমি আশা মনিকে কোন চর-থাপ্পর মারিনি। লাহিড়ী ফাযিল ডিগ্রী মাদরাসার অধ্যক্ষ ফজলে রাব্বী মো: নুরুল ইসলাম বলেন, ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত মতে সম্প্রতি ৪ সেপ্টেম্বর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে এবং আশা মনির ফোনটি থানায় জমা দেয়া হয়েছে। শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ধরনের কাজ আমার শিক্ষিকা কখনই করতে পারেনা।
ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, কিছুদিন আগে আমাকে মাদরাসা থেকে বিষয়টি জানানো হয়। তারপর ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত মতে মাদরাসায় অধ্যক্ষ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করে এবং মোবাইল ফোনটি থানায় জমা দেয়। আমরা শুনেছি মেয়েটা খারাপ। সব বিষয়গুলো বিবেচনা করে মেয়েটিকে মাদরাসা থেকে টিসি দিয়ে বের করে দেয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বালিয়াডাঙ্গী থানার ওসি মোসাব্বেরুল হক বলেন, মাদরাসা থেকে একটি সাধারণ ডায়েরি হয়েছে এবং একটি ফোন জমা দিয়েছে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। শিক্ষার্থীকে চরথাপ্পর মারা হয়েছে  এমন বিষয়টি জানি না; আপনার কাছ থেকে জানলাম। বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।