দেশ ছেড়েছে বিদেশি কোম্পানি

Monday, August 19th, 2019

ডেস্ক নিউজঃ সাভারের চামড়া শিল্পনগরে তাইওয়ানের একটি কোম্পানির সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে ট্যানারি প্রতিষ্ঠা করেছিল বে গ্রুপ। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও চামড়াশিল্প নগরের কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) কার্যকর না হওয়ায় সম্প্রতি কোম্পানিটি বাংলাদেশ ছেড়েছে।

তাইওয়ানের ওই কোম্পানিটির নাম টেচ্যাং লেদার প্রোডাক্টস। চীন, তাইওয়ান ও ভিয়েতনামে তাদের কারখানা রয়েছে। বে জানিয়েছে, বিশ্বব্যাপী চামড়ার বড় সরবরাহকারীদের একটি টেচ্যাং। তারা ২০১১ সালে ‘এশিয়ান ট্যানারি অব দ্য ইয়ার’ পুরস্কার পেয়েছিল।

বে গ্রুপের চেয়ারম্যান শামসুর রহমান বলেন, টেচ্যাং বিদেশি ব্র্যান্ড টিম্বারল্যান্ড ও ক্লার্কসের কার্যাদেশ নেওয়ার পর ব্র্যান্ড দুটি চামড়াশিল্প নগরের সিইটিপি নিরীক্ষা করতে এসে দেখে বর্জ্য পরিশোধন ঠিকমতো হচ্ছে না। লবণ পরিশোধনের কোনো ব্যবস্থাই নেই। এটা দেখে তারা কার্যাদেশ বাতিল করে। টেচ্যাং এরপর অংশীদারত্ব চুক্তি বাতিল করে চলে যায়।

শামসুর রহমান বলেন, চামড়াশিল্প নগরে তারা ২০০ কোটি টাকার মতো বিনিয়োগ করেছেন। দুই বছর ধরে সেখানে কোনো উৎপাদন নেই। এ বছর তাঁরা কোনো চামড়া কেনেননি। প্রতি মাসে শ্রমিক-কর্মচারীদের বসিয়ে-বসিয়ে ৪৫ লাখ টাকা বেতন দিতে হচ্ছে। তাতে কোম্পানিটি এখন ঋণখেলাপি হওয়ার উপক্রম।

সাভারে ২০০ একর জমিতে চামড়াশিল্প নগর প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশন (বিসিক) ২০০৩ সালে প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের ১ হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ের মধ্যে ৬৪২ কোটি ৭৯ লাখ টাকা রাখা হয়েছে সিইটিপি ও অন্যান্য বর্জ্য পরিশোধনব্যবস্থা নির্মাণের জন্য। বিসিক এ অর্থের মধ্য থেকে ৪৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে সিইটিপি ও ডাম্পিং ইয়ার্ড নির্মাণে চীনা প্রতিষ্ঠান জিংসু লিংঝি এনভায়রনমেন্টাল প্রোটেকশন কোম্পানিকে ২০১২ সালের ১১ এপ্রিল কার্যাদেশ দেয়। কাজ শেষের সময়সীমা ছিল দেড় বছর। অবশ্য সাত বছর পেরিয়ে গেছে, এখনো সিইটিপির নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।

বড় উদ্যোক্তারা বলছেন, এই সিইটিপি লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপের (এলডব্লিউজি) স্বীকৃতি পাবে না। এ স্বীকৃতি না পেলে বৈশ্বিক বড় ক্রেতারা বাংলাদেশের চামড়া কিনবে না। এখনই বৈশ্বিক বড় ক্রেতার সঙ্গে কাজ করা বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশি চামড়া কিনতে পারে না। তাই ২০১৮-১৯ অর্থবছরেও ৯৪৫ কোটি টাকার বিদেশি চামড়া আমদানি করতে হয়েছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাপেক্স ও বে গত নভেম্বরে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলাদা ইটিপি করার অনুমতি চায়। তারা বলছে, জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বিষয়টি অনুমোদন দিয়েছে। পরে তারা বিসিকের কাছে ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করলেও তারা তা দেয়নি।

চামড়া পড়ে আছে রাস্তায়। প্রথম আলো ফাইল ছবি।চামড়া পড়ে আছে রাস্তায়। ফাইল ছবি।

এ ক্ষেত্রে বাধা হিসেবে কাজ করেছে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ)। তারা বলছে, দুই ট্যানারিকে আলাদা ইটিপি করার অনুমতি দিলে সিইটিপিতে নজর কমে যাবে। এতে পুরো খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এর বিপক্ষ মতও আছে। অন্য পক্ষ বলছে, সিইপিটির বর্জ্য পরিশোধন ক্ষমতা দিনে ২৫ হাজার ঘনমিটার। অথচ ভরা মৌসুমে বর্জ্যের পরিমাণ ৪০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত দাঁড়ায়। তাতে পাইপলাইন উপচে রাস্তাঘাট বর্জ্যে সয়লাব হয়ে যায়। ফলে সিইটিপির সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিচ্ছে। অ্যাপেক্স ও বে ট্যানারিকে আলাদা ইটিপি করার অনুমতি দেওয়া হলে সরকারি উদ্যোগে বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক আবু ইউসুফ বলেন, অ্যাপেক্স ও বে সিইটিপির ব্যয় বহনের শর্তেও নিজেরা আলাদা ইটিপি করতে চায়। এ ক্ষেত্রে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। এতে নতুন করে সিইটিপির সক্ষমতা বাড়াতে হবে না।

অবশ্য বিসিক চেয়ারম্যান মো. মোশতাক হাসান বলেন, ট্যানারিগুলোতে চামড়া প্রক্রিয়াকরণে অতিরিক্ত পানি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ কারণে বর্জ্যের পরিমাণ বেশি হয়। এটা রোধ করতে মিটার বসানো হবে।

বে গ্রুপের শামসুর রহমান বলেন, চামড়াশিল্প নগরের ১২৩টি ট্যানারি চালু হয়েছে। যার একটিও কমপ্লায়েন্ট বা সার্বিক মানসম্পন্ন নয়। কয়েকটি ট্যানারি যদি এলডব্লিউজি স্বীকৃত হতো, তাহলে দেশে পরিবেশবান্ধব চামড়ার জোগান পাওয়া যেত। দেশে অন্তত ৫০টি পাদুকা রপ্তানিকারক কারখানা গড়ে উঠত।

দেশে একমাত্র এলডব্লিউজি স্বীকৃত (গোল্ড) ট্যানারি গাজীপুরের অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার। এটি ১৩৫টির বেশি বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য তৈরি করে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তাদের রপ্তানি আয় বেড়েছে ১৩ শতাংশ, পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা।

অ্যাপেক্স ট্যানারির নির্বাহী পরিচালক আবদুল মাজেদ বলেন, ‘ছোট ছোট অখ্যাত ক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি করলে কম দাম পাওয়া যায়। এ কারণেই চামড়ার বাজারে ধস।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, খরচ দিয়ে হলেও আমাদের ইটিপি করার অনুমতি দেওয়া হোক। দেওয়া হয়নি। এখন তো সবাই ডোবার দশায়।’