মশার কারখানা থানায় জব্দ গাড়িতে

Monday, August 19th, 2019

রাজধানীর বিভিন্ন থানার জব্দ করা গাড়ি এখানে রাখা হয়। গাড়ি ও চারপাশের পুরো এলাকাতে বছরের বেশির ভাগ সময় জমে থাকে পানি, যা এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ। গতকাল কাঁচপুর এলাকায়।  ছবি: হাসান রাজারাজধানীর বিভিন্ন থানার জব্দ করা গাড়ি এখানে রাখা হয়। গাড়ি ও চারপাশের পুরো এলাকাতে বছরের বেশির ভাগ সময় জমে থাকে পানি, যা এডিস মশার প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ। গতকাল কাঁচপুর এলাকায়। ছবি: হাসান রাজা

ডেস্ক নিউজঃ ভবনের সামনে বড় সাইনবোর্ডে লেখা ধানমন্ডি মডেল থানা। মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকলেই হাতের বাঁ পাশে চোখে পড়ে বেশ খানিকটা জায়গাজুড়ে আবর্জনা, জব্দ করা পুরোনো গাড়ির স্তূপ। পড়ে আছে বৈদ্যুতিক তার, মরিচা ধরা মোটরসাইকেল, পুরোনো টায়ার, ব্যক্তিগত গাড়ির ভাঙা অংশ। কাছে গিয়ে খেয়াল করলেই চোখে পড়ে এসব আবর্জনার মধ্যে জমে থাকা পানি আর মশা।

গতকাল ধানমন্ডি মডেল থানাসহ পাঁচটি থানা ঘুরে এমনই চিত্র দেখা গেছে। ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় পুলিশের শীর্ষ পর্যায় থেকে থানা প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশ পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখার নির্দেশ ছিল। থানা চত্বর মোটামুটি পরিচ্ছন্ন থাকলেও যেসব স্থানে জব্দ করা মোটরগাড়ি রাখা আছে, সেগুলো এখনো আগের মতোই রয়েছে।

সরকারের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা ৩১ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট রাজধানীর ১৪টি স্থানে মশা জরিপ করেছিল। এর মধ্যে ১২টি স্থানেই এডিস মশার লার্ভা ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে আছে। এসব স্থানের মধ্যে রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের ২০-৬০ শতাংশ পাত্রে এডিস মশার লার্ভা পেয়েছেন জরিপকারীরা।

ওই জরিপের পরপরই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জ্যেষ্ঠ কীটতত্ত্ববিদ ভূপেন্দর নাগপাল ঢাকায় ৫ আগস্ট এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পুলিশের জব্দ করা গাড়িতেও পানি জমে এডিস মশা জন্ম নেয়। তিনি বলেন, মানুষ যদি মশামুক্ত করার জন্য সপ্তাহে এক ঘণ্টা করে ব্যয় করে, তা হলেই শহরকে ডেঙ্গুমুক্ত করা সম্ভব।

পুলিশ সদস্যরা বলছেন, জব্দ করা গাড়ি, গাড়ির টায়ার, হেলমেট, ডাবের খোল, পুলিশের পুরোনো জুতাসহ অব্যবহৃত বিভিন্ন জিনিস থানা চত্বরে খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকে। বৃষ্টি হলেই এতে পানি জমছে।

এ বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি-মিডিয়া) সোহেল রানা বলেন, এডিস মশার বংশবিস্তার রোধে পুলিশ চত্বর ও আশপাশের এলাকা পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন রাখতে পুলিশের মহাপরিদর্শক জাবেদ পাটোয়ারী নির্দেশ দিয়েছেন। এ নিয়ে তিনি পদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সও করেন।

জব্দ করা মোটরযানে মশার বাসা
ধানমন্ডি, পল্টন, খিলগাঁও, মিরপুর ও শেরেবাংলা থানা ঘুরে দেখা গেছে, মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করা গাড়ি রাখার জায়গায় এডিস মশা প্রজননের উপযুক্ত পরিবেশ রয়েছে।

ধানমন্ডি মডেল থানার ভেতরেই গাড়ি রাখার স্থান। আছে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন। পুরো ডাম্পিং স্টেশনে চারটি ব্যক্তিগত গাড়ি, তিনটি সিএনজি আর অর্ধশতাধিক পুরোনো মোটরসাইকেল রাখা। বৈদ্যুতিক তারসহ স্তূপ করে রাখা হয়েছে আবর্জনা। মোটরসাইকেলের ভাঙা তেলের ট্যাংক, ব্যক্তিগত গাড়ি ও সিএনজির পাদানিতে জমে আছে বৃষ্টির পানি।

অবশ্য থানার পরিদর্শক (অভিযান) আশফাক রাজীব দাবি করলেন, নিয়মিত এসব জায়গা পরিষ্কার করা হয়।

একই চিত্র দেখা যায় পল্টন মডেল থানার গাড়ি রাখার স্থানেও। কাচ ভেঙে যাওয়া গাড়িগুলোর ভেতরে পানি জমে আছে, অনেক গাড়ি ও ট্রাকের ভেতর জন্মেছে গাছ। ফেলে রাখা জুতা, হেলমেট ও ডাবের খোসার ভেতরেও জমে থাকা পানিতে মশা বাসা বেঁধেছে।

শেরেবাংলা নগর থানা চত্বরের পানি নামার পথগুলো মাটি জমে বন্ধ হয়ে আছে। থানা ভবনের পেছন দিকে নালার মধ্যে বেশ কিছু বোতলও পড়ে আছে। চত্বরের বাইরে জব্দ করা আটটি গাড়িতেও পানি জমে রয়েছে। সেখানে মশার বসবাস।

শেরেবাংলা নগর থানা কর্তৃপক্ষ জানায়, গত জুলাই মাসে এই থানার একজন উপসহকারী পরিদর্শক ও গাড়িচালক ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন।

থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ জানান, তাঁরা নিজ উদ্যোগে থানা চত্বর পরিষ্কার রাখেন। নিজেরাই ওষুধ ছিটান। নালায় পানি জমে থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, এখনো নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। তাই নর্দমার বিষয়টি ঠিক হয়নি।

মিরপুর মডেল থানার প্রাঙ্গণ বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন দেখা গেল। তবে জব্দ করা গাড়ির মধ্যে জমে আছে পানি। সে পানিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে মশা। থানা প্রাঙ্গণে কমপক্ষে ২০টি ব্যক্তিগত গাড়ি ও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মোটরসাইকেল রয়েছে।

এ বিষয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. দাদন ফকির বলেন, থানা চত্বর পরিষ্কার করা হয়। এমনকি এলাকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রচারণাও চালানো হয়। তবে আদালতের আদেশ ছাড়া জব্দ করা গাড়ির বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। সর্বশেষ ১০ আগস্ট মশার ওষুধ ছিটানো হয়েছে বলে জানান তিনি।

আক্রান্ত হচ্ছেন পুলিশ সদস্যরা
রাজধানীর অভিজাত এলাকায় গড়ে ওঠা বনানী থানাতে গত দেড় মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১২ পুলিশ সদস্য। তাঁদের ছয়জন এখনো চিকিৎসাধানী। ধানমন্ডি মডেল থানায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ছুটিতে আছেন পাঁচ পুলিশ সদস্য। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ধানমন্ডি থানার এক কনস্টেবল বলেন, তিনি নিজে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পুলিশ হাসপাতালে ১০ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। ঈদের আগে-পরে মিলিয়ে আক্রান্ত হয়েছেন আরও পাঁচজন।

এ চিত্র শুধু দুটি থানারই নয়, রাজধানীর প্রায় সব থানাতেই পুলিশ সদস্য বা তাঁদের পরিবারের সদস্যরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন বা চিকিৎসাধীন।

রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, এই হাসপাতালে এ পর্যন্ত ১ হাজারে ৮০০ পুলিশ ও তাদের পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসা নিয়েছেন। গতকাল ওই হাসপাতালে ৭৭ জন ভর্তি ছিলেন।

তবে ২৫টি থানায় খোঁজ নেওয়া হয়। এর মধ্যে রমনা, শাহবাগ, নিউমার্কেট, বিমানবন্দর, খিলগাঁও, বংশাল, দারুস সালাম, হাতিরঝিল, পল্লবী থানায় কারও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। আর বাকি ১৭টি থানার মধ্যে গত দুই মাসে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ৫০ জন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। চিকিৎসার পর বিশ্রামে আছেন কেউ কেউ। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন বনানী থানার পুলিশ সদস্যরা। অন্য থানাগুলোর মধ্যে ধানমন্ডি ও মোহাম্মদপুর থানায় ছয়জন করে, কলাবাগান ও তেজগাঁও থানায় চারজন করে। উত্তরা পশ্চিম থানায় তিনজন, পল্টন, হাজারীবাগ, গুলশান, শেরেবাংলা নগর, খিলক্ষেত থানায় দুজন করে এবং মিরপুর, লালবাগ, ওয়ারী, আদাবর, ও যাত্রাবাড়ী থানায় একজন করে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন।

পল্টন মডেল থানায় যাঁরা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে কনস্টেবল রিয়াজ উদ্দিন কিছুদিন আগে চিকিৎসা শেষে বাসায় বিশ্রামে আছেন। রিয়াজ উদ্দিন বলেন, থানার ব্যারাকে দিনের বেলায় মশা কামড়ায়।

পল্টন ও খিলগাঁও থানায় পুলিশ সদস্যদের থাকার ব্যারাক ঘুরে দেখা যায়, একেকটি কক্ষে সাত থেকে আটজন সদস্যের থাকার বিছানা। কাপড় ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গাদাগাদি করে রাখা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কনস্টেবল বলেন, রাতের বেলা দায়িত্ব থাকলে সচরাচর দিনের বেলাতেই ব্যারাকে ফিরে ঘুমাতে হয়। তখন মশা কামড়ায়। দায়িত্ব শেষে এতটাই ক্লান্তি লাগে যে মশারি টানাতে ইচ্ছা করে না।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক মুহা. নুরুল হুদা বলেন, জব্দ করা গাড়ি রাখার জন্য সরকারের পক্ষ থেকেই আলাদা জায়গা বের করে দেওয়ার কথা। বাইরের দেশগুলোতে এমন হয়। কিন্তু ঢাকা শহরের ভেতরে জায়গা না থাকায় এটি হয়তো সম্ভব হচ্ছে না। যেহেতু থানার ভেতরেই রাখতে হচ্ছে, সুতরাং এসব পরিচ্ছন্ন রাখা ছাড়া বিকল্প নেই।