ডেঙ্গু জ্বরের হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা

Friday, August 9th, 2019

বর্তমানে এক আতঙ্কের নাম ডেঙ্গু্ । এই  Dengue শব্দের অর্থ কি তা কিন্তু স্পষ্ট নয়। শব্দটি এসেছে পূর্ব আফ্রিকার Swahili আদিবাসীদের একটি বাগধারা “Ka-dinga pepo” থেকে যার অর্থ হচ্ছে শরীরে কামড়ানীর মত ব্যাথা যুক্ত কাপুনী। আরা তারা বিশ্বাস করত এই ব্যাথা যুক্ত কাপুনী হত এক প্রকার খারাপ আত্মার সংস্পর্শে। পরবর্তীতে এই Dinga শব্দটি স্প্যানিশরা পরিবর্তীত করে Dengue করে,  স্প্যানিশ ভষায় Dengue শব্দের অর্থ সাবধান বা সর্তকতা অবলম্বন করা। স্প্যানে এক প্রকার জ্বর হত যারদ্বারা সমস্ত শরীরের হাড়ে প্রচন্ড ব্যাথা অনুভূত হত রোগী হাটতে পারত না (Movement Disorder) তখন থেকে তার এই ধরনের রোগীদের প্রতি অতিরিক্ত সর্তকতামূলক ব্যবস্থা গ্রহন করতে বলেই এই জ্বরকে তারা Dengue Fever নামে অভিহিত করে। ওয়েষ্ট ইন্ডিজে এই রোগ কে তারা Dandy Fever নামে অভিহিত করে। সর্ব প্রথম চাইনিজ মেডি্ক্যাল এনসাইক্লোপেডিয়ার মাধ্যমে র্খ্রিস্টপূর্ব ২৬৫-৪২০ অব্দে চীনের  জিন সাম্রাজ্যে এ রোগের প্রাদুর্ভাবের কথা জানা যায়, এই রোগের কারন সম্পর্কে তারা দুষিত পানি ও উড়ন্ত পোকা-মাকড়ের কথা উল্লেখ করেছিল।

১৭৮০ সালে এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকাতে ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারন করেছিল। ১৭৭৯ সালে এটাকে প্রথম রোগ হিসাবে অভিহিত করা হয় এবং ১৭৮৯ সালে সর্ব প্রথম বেনজামিন রাস এই রোগটিকে Breakbone Fever নামে অভিহিত করেন। বিংশ শতকের প্রথম ভাগে এর ভাইরাসঘটিত কারণ এবং সংক্রমণ বিষয়ে বিশদ জানা যায়।

ডেঙ্গু বা ডেঙ্গু জ্বর , ডেঙ্গু ভাইরাস নামক জীবানু দ্বারা এডিস নামক মশার কামড়ের মাধ্যমে মানব দেহে সংক্রমিত হয় । ভাইরাসটির চারটি প্রকার আছে – DEN1, DEN 2, DEN 3, DEN 4 । ডেঙ্গু ভাইরাস বাহিত এডিস মশার কামড়ের ৪-৭ দিন পর এর লক্ষনগুলি প্রকাশ পাইতে শুরু করে।

লক্ষনগুলি :   -:সাধারন ডেঙ্গু জ্বর :-

1). হঠাৎ উচ্চ মাত্রায় জ্বর   ২). প্রচন্ড মাথাব্যাথা ৩). চোখের পিছনে ব্যাথা ৪). প্রচন্ডরুপে শরীরের মাংসপেশী ও জয়ন্টগুলিতে ব্যাথা ৫). প্রচন্ড দূর্বলতা ৬). বমি বমি ভাব, বমি ৭). শরীরে লালচে Rash উঠতে পারে (জ্বরের ২-৩দিন পর) নাও উঠতে পারে।

সাধারন ডেঙ্গু জ্বর সচারাচর ৭ দিনের মধ্যে ভাল হয়ে যায় এবং খুব কম ক্ষেত্রেই এটা জটীল আকার ধারন করে।

-: রক্তক্ষরন জনিত ডেঙ্গু জ্বর (Dengue hemorrhagic fever):-

এই ক্ষেত্রে সাধারন ডেঙ্গু জ্বর না কমে বরং শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরন শরু হয়ে নিম্নক্ত লক্ষনগুলি প্রকাশ পায় :-

১). মুখ, মাড়ি, নাক দিয়ে রক্ত ক্ষরন শুরু হয়। ২). শরীরের চামড়া বিবর্ন হয়ে যায়। ৩). লিঙ্ফনোড ও রাক্তবাহী নালিকা গুলি ধ্বংসের দিকে চলে যায়। ৪). অভ্যন্তরীন রক্ত ক্ষরন দরুন কাল পায়খানা, কালচে বমি দেখা যায়। এমন কি প্রসাবের  সাথেও রক্ত দেখা যায়।

৫). রক্তের Platelets এর মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে। ৬).শরীরের চামড়ায় নীচে ছোট ছোট রক্তের বিন্দু দেখা যায় (Bruising) ৭). Pulse খুবই দূর্বল থাকে।

রক্তক্ষরন জনিত ডেঙ্গু জ্বরের সঠিক চিকিৎসা না করলে রোগ আরও জটিল আকার ধারন করে রোগীকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যাবে।

 -: ডেঙ্গু শক সিন্ড্রম  (Dengue shock syndrome) :-

ডেঙ্গু শক সিন্ড্রম হচ্ছে রোগের মাত্রা তীব্র থেকে তীব্রতর হওয়া। রোগী আরও একধাপ মৃত্যুর দিকে চলে যায়। শক সিন্ড্রমে নিম্নক্ত লক্ষনা গুলি প্রকাশ পায় –

১). প্রচন্ডরুপে পেট ব্যাথা করতে থাকে ২). রোগী তার স্বাভাবিক Sense হারিয়ে ফেলে ৩). খুব দ্রুত Blood Pressure কমতে থাকে (Hypotension) ৪). অনবরত বমি করতে থাকে ৫). রক্ত ক্ষরনের মাত্রা অনেক বেড়ে যায়। ৬). রক্তনালী গুলি ছিদ্র হয়ে রক্ত রস বের হতে থাকে৭). ফুসফুস, লিভার, হার্ট ড্যামেজ হতে পারে

ডেঙ্গু শক সিন্ড্রমের দ্রুত চিকিৎসা না করলে রোগীর নিশ্চিত মৃত্যু।

ডেঙ্গু জ্বরের নিশ্চিত হওয়ার জন্য ল্যাবরেটরী টেষ্ট(Diagnosis of dengue fever):-

  1). NS1 (Nonstructural protein 1) Antigen test- এটা জ্বর আসার ১ম থেকে ৩ দিনের  মধ্যেই করতে হয় যদি NS1  পজিটিভ হয় তবে ধরে নিতে হবে রোগী ডেঙ্গু   ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত। ২). Serum  IgG এবং IgM test – যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা দেহে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত দেহে ঐ   ভাইরাসের বিরুদ্ধে এক ধরনের Antibody তৈরি করে এই Antibody তৈরি করতে দেহের  ৫দিনের বেশী সময় লাগে। তাই ৫ দিন পর IgG এবং IgM test করে যদি পজিটিভ পাওয়া  যায় তবে নিশ্চিত ধরতে হবে এটা ডেঙ্গু ভাইরাস জনিত জ্বর। ৩). CBC :-  এর মাধ্যমে আমরা রক্তের Platelet count করতে পারব। Hemorrhagic Dengueর    ক্ষেত্রে Platelet খুব দ্রুত কমতে থাকে (Thrombocytopenia) । Thrombocytopenia হলে  রোগীর যে Bleeding manifestations হয় সেগুলো রোগীর শরীরে দেখা না গেলেও আমরা একটা টেস্ট   করে সেটা দেখতে পারি। রোগীর সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক প্রেশারের মাঝে বিপি মেশিনের কাফটাকে ফুলিয়ে ৫ মিনিট রাখতে হবে, Thrombocytopenia থাকলে রোগীর বাহুর চামড়ার নীচে ছোট ছোট   রক্তের বিন্দু দেখা যাবে (Petechiae), একে বলে Positive Tourniquet test. ।

৪). SGPT, SGOT :-  যেহেতু ডেঙ্গু ভাইরাস লিভারকেও আক্রমন করতে পারে তাই এক্ষেত্রে  লিভার বড় হয়ে যেতে পারে (Hepatomegaly)। তাই SGPT, SGOT পরীক্ষা করে লিভারের  অবস্থা আমরা জানতে পারি। যদি SGPT, SGOT নরমালের চেয়ে বেশী পাওয়া যায় তবে এই   ক্ষেত্রে আমাদের লিভারের দিকে নজর দিতে হবে।

৫). PT (Prothrombin time), aPTT (Activated partial thromboplastin time) :- এই টেষ্টের  মাধ্যমে আমরা জানতে পারি রক্তক্ষরিত হইলে রক্ত জমাট বাধতে কতটা সময় লাগে। যদিও এই টেষ্টটা এত গুরুত্বপূর্ন না তথাপি আগের থেকে জানা থাকলে রোগীর  Hemorrhagic হওয়ার সম্পর্কে কিছুটা ধারনা পাওয়া যায়।

-: হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসা :-

(আমি সম্মানিত হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারদের বলব আপনারা কোন চিন্তাভাবনা না করে নিম্নের ঔষধগুলি ব্যবহার করুন, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সাফল্য আমাদের নিশ্চিত। যদি ঔষধ পেতে কষ্ট হয় তবে আমার সাথে যোগাযোগ করবেন।  )

১). Eupatorium Perfoliatum :- Q , (৫ফোটা + ১চা চামিচ পানি  = ১ডোজ)
এবং

২). Rhus Toxicodendron :- 30 (৫বড়ি = ১ডোজ)

১ডোজ করে ১ ও ২ নং ঔষধ ৩ ঘন্টা পর পর পাল্টা পাল্টি করে খাবেন, ঘুমাইলে

দরকার নাই ঘুম থেকে উঠে আবার ঐ একই নিয়মে চলবে।

৩). Belladonna :- 3 (২ফোটা + ১চা চামিচ পানি = ১ডোজ) জ্বরের তাপমাত্রা ১০২ ডিগ্রীর মধ্যে থাকলে, ১ডোজ করে ১০মিনিট পর পর খাবেন যতক্ষন  পর্যন্ত জ্বরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রায় নেমে না আসে। এই ঔষধে শরীরের Joint Pain  থাকলেও কমবে।

৪). Arnica Montana :- 3 (৩বড়ি) + Cuprum Metallicum :- 6 (৩বড়ি)  = ৬বড়ি = ১ডোজ। জ্বরের তাপমাত্রা ১০২ – ১০৩ ডিগ্রী বা তারবেশী হলে ১ডোজ করে  ১৫মিনিট পর পর ৩-৪বার খেয়ে ১ঘন্টা অপেক্ষা করবেন, যদি জ্বরের তাপমাত্রা না কমে তবে  পূনরায় ঐ নিয়মে চলতে থাকবে এবং জ্বরের তাপমাত্রা অবশ্যই কমবে। এই ঔষধে জ্বরের সাথে   খিচুনী থাকলে তাও কমবে ইনশাঅল্লাহ।

   শরীরে Rash দখা দিলে

 

৫). Antimonium Crudum :- 6 (৫বড়ি = ১ডোজ),  শরীরে Rash থাকলে ১ডোজ করে    রোজ ২বার খাবেন।

 রক্তক্ষরন জনিত ডেঙ্গু(Hemorrhagic Dengue )বা রক্তের Platelets কমতে থাকলে ৬). Kalium Muriaticum :- 3X (২টা ট্যাবলেট) + Ferum Phosphoricum t- 3X   (২টা ট্যাবলেট)  = ৪টা ট্যাবলেট = ১ডোজ।  ১ডোজ করে রোজ ৪বার খাবেন।

৭). Hamamelis Virginica : 200(৩বড়ি)+ Arnica Montana :3

(৩বড়ি) = ৬বড়ি = ১ডোজ। ১ডোজ করে রোজ ৪বার খাবেন। (প্রয়োজনে ৩ ঘন্টা পর  পর খাওয়ান যাবে। )      ৬ ও ৭ নং ঔষধ আশ্চর্যজনক ভাবে খুব দ্রুত Platelets এর সংখ্যা বাড়িয়ে দ্রুত রক্তক্ষরন  বন্ধ করবে ইনশাঅল্লাহ ।

পরমর্শ (Advice) :-

ক). রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে।খ). জ্বরের কারণে রোগীর Dehydration থাকে, তাই  রোগীকে প্রচুর তরল খাবার খাওয়াতে হবে ।

গ).  রোগীর যদি রক্ত বা Blood Plasma-এর পরিমান কমে যায় (Hypovolumia) বা শকের লক্ষন দেখা যায় তবে দ্রুত রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে কর্তব্যরত ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহন করতে হবে। প্রয়োজনে IV fluid (Normal saline) দেওয়া যেতে পারে।

লেখক

লেকচারার ডা: মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম

আনসার হোমিও কমপ্লেক্স

ডি.আই.টি, নারায়নগঞ্জ

মোবাইল :- 01912074922