ক্ষতি নেই দুধে সহনীয় ব্যাকটেরিয়া থাকলে

Monday, July 22nd, 2019

 

ডেস্ক নিউজঃ দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য নিয়ে দেশে উদ্ভূত সংকটের নেপথ্যে থাকা মৌলিক বিষয় ও করণীয় সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পশু পালন অনুষদের ডেইরিবিজ্ঞান বিভাগের একদল গবেষক। দেশে উৎপাদিত তরল দুধের গুণগত মানের ওপর সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু প্রতিবেদন, এতে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি ও দুধের দাম পড়ে যাওয়ার বিষয়টি দুঃখজনক ও দুগ্ধশিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি বলে মন্তব্য করেছে দলটি।

গবেষকদের দাবি, দুধে স্বভাবতই কিছু ব্যাকটেরিয়া বা নানা কারণে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সহনীয় মাত্রার বেশি না হলে তা মানবদেহের ক্ষতির কারণ হবে না।

গবেষকেরা বলছেন, দুধে অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি অস্বাভাবিক কোনো বিষয় নয়। অঞ্চল ও পরিবেশভেদে এবং গবাদিপশুর খাদ্যাভ্যাসের ওপর দুধে কী পরিমাণে জীবাণুর উপস্থিতি থাকবে, তা নির্ভর করে। তবে অ্যান্টিবায়োটিক কিংবা বিভিন্ন ধাতুর উপস্থিতির একটি নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে। নির্দিষ্ট মাত্রার চেয়ে বেশি পরিমাণ উপস্থিত থাকলেই তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর বলা যাবে। মূলত, দুধের এ বিষয়গুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে ও আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে তুলনা করে গবেষণার ফল প্রকাশ করতে হবে। অন্যথায় জনমনে বিভ্রান্তি ও শঙ্কার সৃষ্টি হবে, যা মধ্যম আয়ের দেশে দুগ্ধশিল্পের মতো ক্রমবিকাশমান একটি শিল্পের জন্য মোটেই সুখকর নয়।

দুধের গুণগত মান নষ্টের মৌলিক বিষয় ও মান নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের করণীয় এবং ভোক্তা ও খামারিদের সংকট উত্তরণে বিভিন্ন দিক প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে এই গবেষক দল। দলে রয়েছেন ডেইরিবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক বিশিষ্ট ডেইরিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মো. নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. হারুন-অর-রশিদ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ সোহেল রানা সিদ্দিকী, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আশিকুল ইসলাম, মো. আবিদ হাসান সরকার, মো. সাদাকাতুল বারি ও মো. রেজওয়ানুল হাবীব।

প্রতিবেদনে তাঁরা বলেন, কাঁচা তরল দুধে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকা খুবই স্বাভাবিক। পাস্তুরায়ণের মূল উদ্দেশ্য হলো, প্যাথজেনিক (রোগ সৃষ্টিকারী) ব্যাকটেরিয়া সম্পূর্ণভাবে মেরে ফেলা। গবেষকদের দেখা উচিত প্যাথজেনিক ব্যাকটেরিয়া পাস্তুরিত দুধে আছে কি না? তবে পাস্তুরিত দুধে ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বেশি হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। এর প্রথম ও প্রধান কারণ হলো গুদামে কিংবা দোকানে কোল্ড চেইন বজায় না রাখা। চেইন ঠিক না থাকলে ব্যাকটেরিয়া বংশবিস্তার করে, ফলে দুধে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং পরীক্ষার সময় মাথায় রাখতে হবে সমস্যাটি কোথায়—কৃষকপর্যায়ে, প্রক্রিয়াজাতকরণে নাকি বিপণনব্যবস্থায়।

তা ছাড়া দুগ্ধজাত পণ্যে মানবস্বাস্থ্যের উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে। দইয়ে থাকে উপকারী ল্যাকটিক এসিড ব্যাকটেরিয়া। দই ও ফার্মেন্টেড (গাঁজন) দুগ্ধজাতীয় দ্রব্যে ব্যবস্থাপনার ত্রুটির জন্য সেখানেও ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া চলে আসতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া চিহ্নিত না করে মোট ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে দইকে ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করা যাবে না।

চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিক সম্পর্কে গবেষকেরা বলেন, গবাদিপশুর চিকিৎসা কিংবা রোগ প্রতিরোধে কয়েক দশক ধরে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগের সঙ্গে সঙ্গে গাভির শরীর পুরোপুরি মাত্রায় তা শোষণ করতে পারে না। এ কারণে কিছু অ্যান্টিবায়োটিক মল-মূত্রের সঙ্গে এবং কিছু দুধের মধ্যে আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে দুগ্ধবতী গাভিকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগে বিশেষ সতর্কতা ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মাত্রাতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা যাবে না। আবার দুধে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়া গেলেই সেই দুধ খাওয়া যাবে না, সেটা ঠিক নয়। এর একটি নির্দিষ্ট মাত্রা রয়েছে, যা পৃথিবীর অনেক দেশেই পাওয়া যায়। অনুমোদিত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও সহনীয় মাত্রার বেশি পাওয়া গেলেই তা খাবার অনুপযোগী বলে গণ্য হবে।

ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পুষ্টিগুণের কারণে দুধকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ও আদর্শ খাদ্য হিসেবে অভিহিত করা হলেও নানাবিধ ভারী ধাতু, যেমন: সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও মার্কারি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়াচ্ছে। নর্দমার ময়লা পানি বা কলকারখানার বর্জ্যের প্রবাহ সেচ হিসেবে ঘাসের জমিতে ব্যবহারে ভারী ধাতু গবাদিপশুর খাদ্যে চলে যায়। সেখান থেকে যায় মাংসে, দুধে। এ ক্ষেত্রেও ভারী ধাতু শনাক্ত হলেই দুধ খাওয়া যাবে না, তা ঠিক নয়। সহনীয় মাত্রার ওপরে আছে কি না, সেটা নির্ধারণ করতে হবে। অন্যথায়, মানুষ ফল-সবজিতে ফরমালিনের উপস্থিতির মতো অযথা আতঙ্কিত হবে, পুষ্টিকর দুধ খাওয়া কমিয়ে দেবে এবং দুগ্ধশিল্প হুমকির মুখে পড়বে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গবেষক দলটি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করেছে। তাঁরা বলেন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুগ্ধশিল্প নিয়ে কোনো প্রতিবেদন প্রকাশের আগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। কোনো উৎস থেকে নমুনা সংগ্রহ করলেই তা সারা দেশকে প্রতিনিধিত্ব করবে—এমনটা বলা যাবে না। দুধে ক্ষতিকর অণুজীব, অ্যান্টিবায়োটিক বা ভারী ধাতুর দূষণের জন্য মূলত পরিবেশদূষণ, কোল্ড চেইন বজায় না রাখা, অনিয়মতান্ত্রিক চিকিৎসা, অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, কৃষিক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিকের ব্যবহার দায়ী। সুস্বাস্থ্যের জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন ২৫০ মিলিলিটার দুধ পান করা প্রয়োজন। এ দুগ্ধশিল্পের বিকাশের জন্য দেশে আদর্শ মানদণ্ড তৈরি এবং দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যের পরীক্ষার জন্য রেফারেন্স ল্যাবরেটরি গড়ে তুলতে হবে। প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন শাখা থাকতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ডেইরি ডেভেলপমেন্ট বোর্ড এবং ডেইরি রিসার্চ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে হবে।

দেশের বিভিন্ন বাজার, প্রক্রিয়াজাত প্রতিষ্ঠান ও খামারিদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে দুধে ক্ষতিকর উপাদানের উৎস জানতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠন করেছে। বিশেষজ্ঞ দলকে এসব নমুনা পরীক্ষা করে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে শিগগির গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ ও সুপারিশ প্রদান করতে বলা হয়েছে।