বন্যায় তিন দেশে নিহত শতাধিক

Wednesday, July 17th, 2019

ভারী বর্ষণ, পাহাড় ধস ও বজ্রপাতে দক্ষিণ এশিয়ার তিন দেশ— ভারত, নেপাল ও বাংলাদেশে এ পর্যন্ত শতাধিক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে। তিন দেশে প্রবল বৃষ্টিপাতে বন্যায় প্রায় ৫৫ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মৌসুমি বৃষ্টিপাতের প্রভাবে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে গত শনিবার থেকে বজ্রপাত পানিতে ডুবে মারা গেছে প্রায় ১৭ জন।

এদের মধ্যে অধিকাংশই কৃষক। এ ছাড়াও ভারতের আসাম ও বিহারে বন্যায় অন্তত ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে আসামে ১৭ জন এবং বিহারে ১৪ জন মারা গেছেন। বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ২০ লাখ মানুষ। এ ছাড়া হিমাচল প্রদেশে ভারী বর্ষণে বহুতল ভবন ধসে ১৩ সেনাসদস্যসহ ১৪ মৃত্যু হয়েছে।

গত ১০ দিন ধরে টানা পানি বাড়তে থাকায় আসামে প্রায় ৪৩ লাখ লোক ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বিহারে রাস্তা ও রেললাইন পানিতে তলিয়ে গেছে। লোকজন সহায়-সম্বল মাথায় নিয়ে বুক সমান পানি ভেঙে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে যাচ্ছে, টেলিভিশন চ্যানেলগুলো এমন দৃশ্য দেখিয়েছে।

ভারতের আসাম রাজ্যে বন্যা পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি হচ্ছে। আসামের ৩৩টির মধ্যে ৩০টি জেলা প্লাবিত হয়েছে। প্রতি বছর দক্ষিণ এশিয়ায় বন্যার কারণে বহু লোককে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়, অনেক লোকও মারা যায়। চলতি বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে নিহত ও উদ্বাস্তু লোকজনের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।

গত সোমবার রাতে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি আরও বেড়েছে। হিমালয় থেকে নেমে আসা এ নদী ভারতের আসাম হয়ে বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে সাগরমুখী হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদীগুলোর পানিও বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যায় বিরল এক শৃঙ্গী গণ্ডারের আবাসস্থল আসামে কাজিরাঙ্গা ন্যাশনাল পার্কের অধিকাংশ ডুবে গেছে। গত সোমবার ওই এলাকায় চারজন ডুবে মারা গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

এক সংবাদ সম্মেলনে আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সানোয়াল রাজ্যর ৩৩টি জেলার মধ্যে ৩১ থেকে ৩২টি বন্যাক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন। পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত সঙ্কটজনক’ বলে বর্ণনা করেছেন তিনি। ঘরবাড়ি ছেড়ে যারা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে আসছেন তাদের জন্য অস্থায়ীভিত্তিতে ত্রাণশিবির খোলা হয়েছে।

রাজ্যজুড়ে উদ্ধার ও ত্রাণকাজ চালাতে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। যেকোনো সময় ব্যবহারের জন্য বিমান বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলে রাজ্যটির পানি সম্পদমন্ত্রী কেশব মোহন্ত জানিয়েছেন।

আগামী দুই দিন আসাম ও বিহারে ব্যাপক বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে ভারতের আবাহওয়া দপ্তর। প্রতিবেশী নেপালের অধিকাংশ জেলায় ভারী বৃষ্টিপাতে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে ৬৪ জন নিহত ও ৩১ জন নিখোঁজ রয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

দেশটির দক্ষিণপূর্ব অংশ দিয়ে বয়ে যাওয়া কোসি নদীর পানি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে স্থানীয় এক জেলা কর্মকর্তা জানিয়েছেন। এই নদীটি নেপাল থেকে নেমে বিহার হয়ে গঙ্গায় গিয়ে পড়েছে।

সুনসারি জেলার সহকারী প্রশাসক চিরঞ্জিব গিরি রয়টার্সকে বলেছেন, আমাদের বিশ্লেষণ বলছে, এখন বিপদ কেটে গেছে, নদীর পানি কমে আসছে। বাংলাদেশে বন্যার কারণে এক লাখ ৯০ হাজার লোককে ঘরবাড়ি ছাড়তে হয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কক্সবাজার জেলায় এক লাখেরও বেশি লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। এই জেলাতে প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আশ্রয় নিয়ে আছে। জুলাই থেকে বন্যা ও ভূমিধসে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে কয়েক হাজার আশ্রয়স্থল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

গত সপ্তাহে ভূমিধসে এখানে দুটি শিশু মারা গেছে বলে জানিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। এদিকে কুড়িগ্রামে প্রতিবন্ধীসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়াও গাইবান্ধায় মহাসড়কে ফাঁটল, হুমকিতে ওয়াপদা বাঁধ, লালমনিরহাটে চরম খাদ্য সঙ্কটে বন্যাকবলিতরা, সিলেটের সুনামগঞ্জে পানিতে থাকতে পারছে না মানুষ, বন্যাকবলিত এলাকার জন্য সায়েমা ওয়াজেদের নকশায় নৌকা তৈরি হচ্ছে, সিলেট নগরের ২০ এলাকা পানির নিচে, জামালপুরে রেকর্ড ছাড়িয়েছে যমুনার পানি, তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি।

এদিকে নদ-নদীর পানি ৬৩টি পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের ৯৩টি নদ-নদীর পানি সমতল স্টেশনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ৬৩টি পয়েন্টে পানি সমতল বৃদ্ধি ও ২৯টি পয়েন্টে পানি হ্রাস পেয়েছে। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২৩টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সুরমা-কুশিয়ারা ব্যতীত দেশের সকল নদ-নদীর পানি সমান বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং তৎসংলগ্ন ভারতের আসাম ও মেঘালয় প্রদেশসমূহের অনেক স্থানে ২৪ ঘণ্টায় মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে এবং আগামী ২৪ ঘণ্টায় আত্রাই নদী, বাঘাবাড়ি ও পদ্মা নদী গোয়ালন্দ পয়েন্টে বিপদসীমা অতিক্রম করতে পারে।

আজ বুধবার কুড়িগ্রাম, জামালপুর, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও টাঙ্গাইল জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। লালমনিরহাট, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা পরিস্থিতি আগামী ২৪ ঘণ্টায় উন্নতি হতে পারে।

গত রোববার ১৪টি নদীর ২৫টি পয়েন্টে পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। পানি পরিস্থিতি একটি পয়েন্টে অপরিবর্তিত রয়েছে এবং একটি পয়েন্টের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। নদ-নদী পরিস্থিতি সম্পর্কে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গতকাল জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় (পরশু ৯টা থেকে গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত) বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়নি।

আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো সংবাদ
কুড়িগ্রাম : কুড়িগ্রামে বন্যার পানিতে ডুবে এক প্রতিবন্ধীসহ চারজন মারা গেছে। এ ছাড়াও পুকুরের পানিতে ডুবে মারা গেছে অপর এক শিশু। গত সোমবার তাদের মৃত্যু হয়। চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য পরির্দশক বাবুল কুমার জানান, গত সোমবার বন্যার পানিতে তিনজনের মারা যাওয়ার খবর দিয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীরা। এরা হলেন— চিলমারী ইউনিয়নের ঢুষমারা থানার গাছবাড়ী এলাকার মাইদুলের ১৮ মাসের কন্যা মনি খাতুন।

সে খেলতে খেলতে পানিতে পড়ে মারা যায়। অষ্টমীরচরের খর্দ্দ বাঁশপাতারী গ্রামের ফরিদুল ইসলামের ৯ মাস বয়সী ছেলে হাসানুল হক চৌকি থেকে পানিতে পড়ে মারা যায় এবং রানীগঞ্জ থানার চুনমুল পাড়ার প্রতিবন্ধী বীথি (১০) পানিতে ডুবে মারা যায়।

অপরদিকে, উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের ব্যাপারীগ্রামে বাড়ির পেছনে খেলতে গিয়ে হাবিবুল্লাহ (৬) নামে এক শিশু পানিতে ডুবে মারা যায়। সে ওই গ্রামের কৃষক মাহবুরের ছেলে। হাতিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়াও ফুলবাড়ী উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের আটোয়াটারী গ্রামের লোকমানের মেয়ে আলো খাতুন (৩) পুকুরের পানিতে ডুবে মারা গেছে। ফুলবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক আরজিনা আক্তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

লালমনিরহাট : লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার দোয়ানি পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি কমে গেলেও সানিয়াজান নদীর পানি বেড়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়ছে শত শত পরিবার। বন্যাকবলিত পরিবারগুলো স্থানীয় গাইডবানের আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে পানিবন্দি হয়ে পড়ায় এসব এলাকায় দেখা দিয়েছে চরম খাদ্য সংকট। এ ছাড়া পানি ঢুকে পড়ার কারণে জেলার ৫৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

তিস্তার পানির তোড়ে জেলার আদিতমারি উপজেলার নদী রক্ষা কুটিরপাড় বাঁধের ২০০ মিটার ধসে গিয়ে হাজারো ঘরবাড়ি প্লাবিত হয়েছে। এদিকে গত আট দিন থেকে চরাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি থাকলেও অধিকাংশ এলাকাতেই পৌঁছায়নি ত্রাণ বা কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতা।

ফলে দুর্ভোগে পড়েছে বানভাসি মানুষ। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১৫৩ মেট্রিক টন চাল ও নগদ আড়াই লাখ টাকা বিতরণ করা হলেও ৬৩টি চরের অধিকাংশ দুর্গত মানুষই পাননি সরকারি সাহায্য— এমনটাই দাবি ভুক্তভোগীদের।

গাইবান্ধা : গাইবান্ধার ভরতখালী ইউনিয়নের ভাঙ্গামোড় ও দক্ষিণ উল্যা এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ ওয়াপদা বাঁধ সংলগ্ন আঞ্চলিক মহাসড়কে ফাটল ধরেছে। মহাসড়ক ও বাঁধের ওপর দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে পানি যাচ্ছে। ফলে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পাঁচ উপজেলার ১৬৫টি গ্রামের প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এলাকাবাসী ও পউবো বস্তা ফেলে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছেন।

পুরাতন বাদিয়াখালি থেকে ভরতখালি বাজার পর্যন্ত কয়েক স্থান দেবে যাওয়ায় বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। যেকোনো সময় বাঁধের কয়েক স্থান ভেঙে শতাধিক গ্রাম তলিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধা-সাঘাটা আঞ্চলিক মহাসড়কের ভরতখালী ইউনিয়নের ভাঙ্গামোড় এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ ওয়াপদা বাঁধ সংলগ্ন অংশে ফাটল ধরেছে।

এটি ভেঙে গেলে মুহূর্তেই শতাধিক গ্রাম তলে যাবে। বাঁধের পাশেই গটিয়া গ্রামে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট ফজলে রাব্বী মিয়ার বাড়ি। বাঁধটি ভেঙে গেলে গটিয়াসহ শতাধিক গ্রাম তলিয়ে যাবে। বিগত ২০১৭ সালের ভয়াবহ বন্যায় ভাঙ্গামোড় এলাকার এই স্থানেই বাঁধের কিছু অংশ দেবে যায়। পরে সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় বাঁধটি রক্ষা করা হয়েছিল।

এ বছর যাদি বাঁধটি রক্ষায় এখনই ব্যবস্থা নেয়া না হয়, তাহলে ভেঙে শতাধিক গ্রাম মুহূর্তেই তলিয়ে যেতে পারে। পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান বলেন, গাইবান্ধার ফুলছড়ি পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ১২৮ সেন্টিমিটার এবং শহরের ঘাঘট নদীর পানি ৭৮ সেন্টিমিটার বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙনরোধের চেষ্টা চলছে।

সুনামগঞ্জ : গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলার এক লাখ ২০ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রশাসন থেকে ত্রাণ বিতরণ করা হলেও তা পাচ্ছেন না অনেকেই।

সরেজমিন বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার রাধানগর, লালপুর, কুতুবপুর ও বিসিক এলাকা ঘুরে দেখা যায়, এখনো পানির নিচে বসবাস করছেন অনেকে। রাধানগর ও লালপুর এলাকার ২০ পরিবার ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের সহযোগিতায় একটি দোকান-কোটায় আশ্রয় দিলেও গুড় চিড়া ও পাঁচ কেজি চাল দিয়ে চলছে তাদের বর্তমান জীবন। তা ছাড়া এখনো অনেক পরিবার রয়ে গেছে পানির নিচে।

মায়ার ভিটা ছেড়ে আসতে চাইছেন না তারা। মাঝে মধ্যে মসজিদের টিউবওয়েল থেকে পানি পান করলেও বেশির ভাগ মানুষ হাওর থেকেই পানি তুলে খাচ্ছেন। প্রত্যেককে দুটি করে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট দেয়া হলেও তা প্রথমদিনই শেষ হয়ে যায়। রাধানগর এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সাবিনা খাতুন বলেন, ‘আমরার বাড়ির মাঝে কোমর পানি। আমরা অসহায়। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়া খুব অসহায়ের মধ্যে আছি।

আমরার কাজ করার সুযোগ নাই। এখন কেউ যদি দয়া করে তাইলে খাইয়া তাইক্কা বাঁচতাম।’ সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌররাং ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ফুল মিয়া বলেন, সরকার যে ত্রাণ দিচ্ছে তা খুব কম। সবাইকে ঠিকমতো দিতে পারি না। আমারা এই গৌরারং ইউনিয়ন অনেক ক্ষতিগ্রস্ত। তাই আমি চাইব ত্রাণের মাত্রাটা যেন বাড়িয়ে দেয়া হয়।

এদিকে বন্যায় সুনামগঞ্জের সদর, দোয়ারাবাজার, ছাতক, জামালগঞ্জ, বিশ্বম্ভরপুর, তাহিরপুর, দিরাই, শাল্লা, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ, জগন্নাথপুর, ধর্মপাশা উপজেলায় লক্ষাধিক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১১টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ২২টি আশ্রয়কেন্দ্রে মানুষ উঠলেও বেশির ভাগ মানুষ রয়ে গেছেন পানির সঙ্গেই।

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে ২২ বছরে এমন বন্যা হয়নি বলে জানিয়েছেন এলাকাবাসী। ১৯৯৭ সালের পর কখনোই বাড়িতে পানি প্রবেশ করেনি। এর আগে যতবারই বন্যা হয়েছে, এলাকার মানুষ মহাসড়কের উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু এবার সেই সড়কেই হাঁটু থেকে কোমর পানি।

প্রায় এক সপ্তাহ ধরে মানুষ খেয়ে না খেয়ে আছে, চুলা জ্বালানোর জায়গাটুকুও শুকনা নেই। এ চিত্র চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলার। শুধু চন্দনাইশ নয়, টানা ১০ দিনের বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, বাঁশখালী, পটিয়া, আনোয়ারা, হাটহাজারী, বোয়ালখালী উপজেলার প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ গত এক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দি হয়ে আছে। অনাহারে-অর্ধাহারে দিনযাপন করছেন তারা।

বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, চট্টগ্রাম-বান্দরবান ও চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক। জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, জেলার তিনটি নদীর পানি গত চারদিন ধরে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। এর মধ্যে হালদা ও কর্ণফুলী নদীর পানি বিপদসীমা থেকে নেমে গেছে। দোহাজারী পয়েন্টে সাঙ্গু নদীর পানি এখনো বিপদসীমার ৯৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ফলে প্লাবিত হয়েছে চন্দনাইশ ও সাতকানিয়া উপজেলা।

ভয়াবহ বন্যার পানিতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন সাতকানিয়া উপজেলার মানুষ। টানা বৃষ্টিতে উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় সবগুলোই প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে নলুয়া, ঢেমশা, কেঁওচিয়াসহ ছয়-সাতটি ইউনিয়নের অবস্থা ভয়াবহ। এসব এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় ফুট পানি উঠেছে।

সাঙ্গু নদীর পানি বিপদসীমার দেড় মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্থানীয়দের অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে শহরে ও আশাপাশের উপজেলার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় খাবার এবং পানীয় জলের অভাব দেখা দিয়েছে ওই এলাকায়। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় নৌকা দিয়ে পারাপার হচ্ছে মানুষ। ফসলের ক্ষেত, গোলার ধান, মৎস্য খামার, পশু ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে গবাদিপশুর।

এদিকে বন্যার পানি পল্লী বিদ্যুতের সাব-স্টেশনে ঢুকে পড়ায় গত চারদিন ধরে উপজেলার কেঁওচিয়া, সোনাকানিয়া, মাদার্শা ও আমিলাইশ ইউনিয়নের প্রায় ২০টি গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ আছে। সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মোবারক হোসেন বলেন, গত রোববার থেকে সাঙ্গু নদীতে বিপদসীমার দেড় মিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। উপজেলার ১৭টি ইউনিয়নের মধ্যে প্রায় সবগুলো ইউনিয়ন প্লাবিত।

বানভাসি মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে ৯৫ মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত জেলা প্রশাসন থেকে ৮০০ শুকনো খাবারের প্যাকেট এবং উপজেলা পরিষদের উদ্যোগে আরও সাড়ে তিন হাজার শুকনো খাবারের প্যাকেট ও বিতরণ করা হয়েছে।

দোহাজারী সড়ক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গাছবাড়িয়া-চন্দনাইশ-বরকল (শহীদ মুরিদুল আলম সড়ক) জেলা সড়কের সাতঘাটিয়া পুকুরপাড় থেকে বরকল ব্রিজ পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার জুড়ে গত দুইদিন ধরে চার ফুট পানির নিচে ডুবে আছে।

এ ছাড়া পটিয়া-চন্দনাইশ-বৈলতলী জেলা মহাসড়কের নবম কিলোমিটার থেকে ১১তম কিলোমিটার পর্যন্ত সড়ক তিনদিন ধরে তিন ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। এ দুটি সড়কে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা। গত ১০ দিনের ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধস ও বন্যার পানিতে ভেসে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে তিনজন নিহত হয়েছেন।

তারা হলেন— জঙ্গল খিরামের বাসিন্দা কালেন্দী রানী চাকমা (৪০), জাফতনগর ইউনিয়নের নাসির উদ্দিনের ছেলে মহিউদ্দিন ইমতিয়াজ (২০) ও লেলাং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মফিজুর রহমান।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বৃষ্টি কমলেও প্লাবিত হচ্ছে উপজেলার নতুন নতুন এলাকা। উপজেলার উত্তরাঞ্চল তুলনামূলক উঁচু হওয়ায় ধীরে ধীরে পানি দক্ষিণাঞ্চলের দিকে নামতে শুরু করায় প্লাবিত হচ্ছে এসব এলাকা। উপজেলার দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভূজপুর, পাইন্দং, হারুয়ালছড়ি, সুয়াবিল, সুন্দরপুর, কাঞ্চননগর, লেলাং, ধর্মপুর, বখতপুর, নানুপুর, জাফতনগর, রোসাগিংরী, সমিতিরহাট, আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নসহ ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট পৌরসভা এলাকার বিভিন্ন গ্রামের প্রায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে আছে। বন্যার পানিতে বীজতলাসহ বহু গ্রামীণ রাস্তাঘাট, মৎস্যখামার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাটবাজার ডুবে রয়েছে।

বোয়ালখালী উপজেলার এলাকাবাসী জানান, ১০ দিনের টানা বর্ষণে পানিপ্রবাহ বেড়েছে কর্ণফুলী নদীতে। ঢল নেমেছে ভাণ্ডালজুড়ি খালে। এতে উপজেলার জ্যৈষ্ঠপুরার ভাণ্ডালজুড়ি খালে সাতটি বসতঘর তলিয়ে গেছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরও ১০ পরিবারের বসতঘর। এ ছাড়া টানা বৃষ্টির ফলে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে, ডুবেছে ফসলি জমি।

পটিয়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রাপ্ত খবরে জানা গেছে, টানা বর্ষণে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ভেঙে পড়েছে বেশ কিছু বসতঘর। পানিতে ভেসে গেছে প্রায় ২০০ পুকুরের মাছ।

প্লাবিত হয়েছে উপজেলার কেলিশহর, হাইদগাঁও, কচুয়াই, খরনা, ভাটিখাইন, ছনহরা, ধলঘাট, হাবিলাসদ্বীপ, জিরি, কুসুমপুরা, আশিয়া, কোলাগাঁও ছাড়াও পৌরসভার কয়েকটি ওয়ার্ড। শ্রিমাই খালের বেড়িবাঁধের ভাটিখাইন, ছনহরা ও কচুয়াইসহ বেশ কয়েকটি স্পটে ভাঙন দেখা দিয়েছে। ফসলি জমিতে পানি প্রবেশ করে তলিয়ে গেছে আউশের বীজতলা।

রাউজানে ভারী বর্ষণে ডাবুয়া ও সর্তা খাল দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ডুবে গেছে ফসলি জমি ও সড়ক। পানিতে তলিয়ে গেছে আউশ ধানের বিস্তীর্ণ বীজতলা। পানিতে ডুবে আছে হলদিয়া ইউনিয়নের উত্তর সর্তা, হলদিয়া, গর্জনিয়া, এয়াসিন নগর, জনিপাথর, বৃকবানপুর, ডাবুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম ডাবুয়া, লাঠিছড়ি, কেউকদাইর, রামনাথপাড়া, পূর্ব ডাবুয়া, হাসান খিল ও দক্ষিণ হিংগলা, চিকদাইর ইউনিয়নের পাঠানপাড়া, দক্ষিণ সর্তা ও চিকদাইর, গহিরা ইউনিয়নের দলইনগর ও কোতোয়ালি ঘোনা, নোয়াজিশপুর ইউনিয়নের সড়ক ও জমি। হালদা নদী ও তেলপারই খাল দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে নদীমপুর ও পশ্চিম নদীমপুর এলাকার ফসলি জমি।

সিলেট : সিলেট জেলায় বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে পাহাড়ি ঢল অব্যাহত থাকায় সুরমা নদীর বৃদ্ধি পেয়ে নদীর পানি উপচে সিলেট নগরের প্রায় ২০টি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের সর্ববৃহৎ পাইকারি বাজার কালিঘাটও রয়েছে। ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছেন নগরের কালিঘাট ও উপশহরের ব্যবসায়ীরা। সিলেট জেলার নদ-নদীর পানি এখনো বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সিলেটের অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে।

এর ফলে এখনো পানিবন্দি হয়ে আছেন দুই লক্ষাধিক মানুষ। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন সরকারি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে। সিলেট নগরের মিরাবাজারে জামেয়া ইসলামিয়া স্কুল-কলেজের সরকারি বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।

এখানে ৮০টি বন্যা আক্রান্ত পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সুরমা নদীর পানি বৃদ্ধির কারণে সিলেট নগরী ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। দুর্ভোগে পড়েছেন অন্তত ৫০ হাজার নগরবাসী। পানিবন্দি হয়ে নগরের নিচু এলাকার বাসিন্দারা।

জামালপুর : যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, ঝিনাই, জিঞ্জিরামসহ অন্যান্য নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরের সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার রেকর্ড ১৩৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের গেজ রিডার আব্দুল মান্নান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

পানি বেড়ে যাওয়ায় নতুন করে প্লাবিত হয়েছে মাদারগঞ্জ উপজেলার গুনারিতলা, আদার ভিটা ইউনিয়ন ও পৌরসভা, ইসলামপুর পৌরসভা, মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর, নাংলা, কুলিয়া, সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ও কামরাবাদ ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা।

সবমিলিয়ে জেলার সাত উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়ন ও তিনটি পৌরসভার অন্তত তিন লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। দুর্গত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি, খাবার ও গো-খাদ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। দুর্গতরা আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন উঁচু সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

দুর্গত এলাকায় কাজ না থাকায় চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে বানভাসিদের। অধিকাংশ এলাকায় ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করছেন দুর্গতরা। বিভিন্ন সড়কে পানি ওঠায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পানি ওঠায় বন্ধ করে দেয়া হয়েছে ২৭৭ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত ২৯০ মেট্রিক টন চাল, নগদ তিন লাখ টাকা ও দুই হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বরাদ্দ দেয়া হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলে অভিযোগ বন্যা দুর্গতদের।

এদিকে বন্যাকবলিত এলাকার জন্য সায়েমা ওয়াজেদের নকশায় তৈরি হচ্ছে নৌকা। বন্যাকবলিত এলাকার মানুষকে ঘরসহ নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে নৌকা তৈরির প্রকল্প হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান।

বাংলাদেশের অটিজম বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এই নৌকার নকশা তৈরি করেছেন বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ কক্ষে জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনের তৃতীয় দিনের প্রথম অধিবেশন শেষে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সুযোগ্য কন্যা সায়মা ওয়াজেদ আমাদের একটি প্রস্তাব দিয়েছেন, একটি ডিজাইন দিয়েছেন, এস্টিমেট দিয়েছেন ১০ লাখ টাকার একটি নৌকা। যে নৌকায় বন্যা কবলিত জনগণ তাদের মালামাল, এমনকি ঘর পর্যন্ত অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে পারবেন।

আমরা সেটারও প্রকল্প গ্রহণ করছি। ডিসিরা দুর্যোগ, বন্যা-সাইক্লোনে কাজ করতে স্পিডবোটের সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাব করেছেন জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সংখ্যা বাড়ানো এবং সারা বছর জ্বালানি সরবরাহের প্রস্তাব করেছে। বন্যার সময় বন্যাকবলিত জনগণকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরানোর জন্য নৌকার প্রস্তাব দিয়েছেন, আমরা নৌকার জন্য আগে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়েছিলাম। ওনারা (ডিসিরা) তিন লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়েছেন।

আমরা সেই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছি। দেশে চলমান বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে এনামুর রহমান বলেন, প্রথমে ১০টি জেলা আক্রান্ত ছিল, এর দুদিন পর ১৫টি এবং গত সোমবার পর্যন্ত ২০টি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যাকবলিত প্রত্যেক জেলায় এ পর্যন্ত ৭০০ মেট্রিক টন চাল, ১১ ধরনের চার হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। প্রথমে দুই কোটি ৯৩ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়, গত সোমবার আরো ৩৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

গবাদি পশুর খাদ্যের জন্যও প্রত্যেক জেলায় এক লাখ করে টাকা এবং শিশুদের খাদ্যের জন্য এক লাখ করে টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রত্যেক জেলায় ৫০০টি করে তাঁবু পাঠানো হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী। বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে কি-না, এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তেমন আশঙ্কাজনক অবস্থা নেই। আবহাওয়াবিদদের মতে, বৃষ্টিপাত আরো হতে পারে। চীন, নেপাল ও ভারতে বৃষ্টি হলে এবং ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার পানি বৃদ্ধি পেলে আমাদের আরেকটু অবনতি হতে পারে।

আমরা আগাম প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছি, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের সামর্থ্য রয়েছে। জেলা-উপজেলা থেকে ত্রাণ সরবরাহের ব্যাপারে ডিসিদের দেয়া প্রস্তাব প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, আমরা এরই মধ্যে ৬৪ জেলায় ৬৬টি ত্রাণগুদাম নির্মাণের কাজ শুরু করেছি, এগুলোর কাজ শেষ হলে আমরা জেলা প্রশাসকের অধীনে ত্রাণসামগ্রী জেলা পর্যায়ে রাখার ব্যবস্থা হবে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বজ্রপাতে প্রতিদিনই মানুষ প্রাণ হারায় জানিয়ে এনামুর রহমান বলেন, মৃত্যু নিরোধে বজ্রপাত নিরোধক টাওয়ার বসানোর জন্য ডিসিরা প্রস্তাব দিয়েছেন। তাদের প্রস্তাবের আগেই আমরা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এবং কর্মশালাও করেছি।

দেশের যে জায়গায় বজ্রপাতের আশঙ্কা বেশি, সেখানে আগে টাওয়ার বসবে। মন্ত্রণালয় সিনিয়র সচিব শাহ কামাল বলেন, বন্যা প্রবণ ৩৫টি জেলায় সায়মা ওয়াজেদের প্রস্তাবিত নৌকার একটি করে দেয়া হবে। যে নৌকা হবে বেশ বড় এবং এতে ঘরসহ মানুষ ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ওঠানো যাবে।