দুদকের মামলা সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে

Wednesday, July 10th, 2019

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। প্রথম আলাে ফাইল ছবিসুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ফাইল ছবি

ডেস্ক নিউজঃ ফারমার্স ব্যাংকের (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে চার কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হয়। পরে ‘রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ নামে হস্তান্তর দেখিয়ে আত্মসাৎ ও অর্থ পাচার করা হয়। এমন এক অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান করছিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এত দিন সেই ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির’ নাম প্রকাশ না করলেও আজ বুধবার মামলা করার মাধ্যমে সেই ব্যক্তির নাম আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করল সংস্থাটি। সেই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিটি হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা)।

আজ বুধবার দুদকের ঢাকা সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংস্থাটি। মামলায় ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম শামীমসহ ৬ কর্মকর্তাও আসামি হয়েছেন। আসামি হয়েছেন এস কে সিনহার কথিত পিএস রঞ্জিত ও তাঁর স্ত্রী।

দুদক সূত্র জানায়, গত বছরের জানুয়ারিতে এ অনুসন্ধান শুরু হয়। ফারমার্স ব্যাংকে জালিয়াতির ঘটনা অনুসন্ধান করতে গিয়ে বিষয়টি নজরে আসে দুদকের। পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন ও সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধানের সমন্বয়ে গঠিত একটি দলকে অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয়। দীর্ঘ অনুসন্ধান শেষে তাঁরা কমিশনে প্রতিবেদন জমা দেন। আজই কমিশন মামলার অনুমোদন দিলে সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

মামলার আসামিরা হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা, ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এ কে এম শামীম, ব্যাংকটির সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট, সাবেক ক্রেডিট প্রধান গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও গুলশান শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক মো. জিয়া উদ্দিন আহমেদ, গুলশান শাখার ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট লুৎফুল হক, এস কে সিনহার কথিত পিএস রণজিৎ চন্দ্র সাহা, রঞ্জিতের স্ত্রী সান্ত্রী রায় (সিমি), টাঙ্গাইলের মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা।

মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা অসৎ উদ্দেশ্যে পরস্পর যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে চার কোটি টাকা ভুয়া ঋণ নিয়ে একই দিনে পে-অর্ডারের মাধ্যমে ব্যক্তিগত হিসাবে স্থানান্তর করেন। পরে ওই টাকা ব্যক্তিগত হিসাব থেকে অস্বাভাবিক নগদে এবং চেক ও পে-অর্ডারের মাধ্যমে অন্য হিসাবে হস্তান্তর ও রূপান্তরের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছেন। পাশাপাশি ওই টাকার উৎস ও অবস্থান গোপনের মাধ্যমে পাচার বা পাচারের চেষ্টায় সম্পৃক্ত ছিলেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, জনৈক মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় আলাদা দুটি চলতি হিসাব খোলেন। এর পরদিনই তাঁরা দুই কোটি করে চার কোটি টাকা ঋণের আবেদন করেন। ব্যাংকে হিসাব খোলা এবং ঋণ আবেদনপত্রে দুজনই তাঁদের ঠিকানা বাড়ি নম্বর ৫১, সড়ক নম্বর ১২, সেক্টর ১০, উত্তরা আবাসিক এলাকা উল্লেখ করেন। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ওই বাড়িটি সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ব্যক্তিগত বাড়ি। ঋণ আবেদনে ঋণের বিপরীতে জামানত হিসাবে রঞ্জিত চন্দ্র সাহার স্ত্রী সান্ত্রী রায়ের সাভারে অবস্থিত ৩২ শতাংশ জমির কথা উল্লেখ করেন। তাঁরা দুজনও সাবেক প্রধান বিচারপতির পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন।

এজাহার বলছে, ঋণসংক্রান্ত আবেদন দুটি কোনো রকম যাচাই-বাছাই, রেকর্ডপত্র বিশ্লেষণ এবং ব্যাংকের কোনো নিয়ম-নীতি না মেনেই শুধু গ্রাহকের আবেদনের ওপর ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ শাখার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঋণ প্রস্তাব তৈরি করে হাতে হাতে ঋণ প্রস্তাব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যান। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির কর্মকর্তারা যাচাই-বাছাই ছাড়াই অফিস নোট তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর দিয়ে সাবেক এমডি এ কে এম শামীমের কাছে নিয়ে যান। ফারমার্স ব্যাংকের ঋণ নীতি অনুযায়ী ঋণ দুইটির প্রস্তাব অনুমোদন করার ক্ষমতা ব্যবস্থাপনা পরিচালকের না থাকা সত্ত্বেও তিনি এ–সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই বা নির্দেশনা না দিয়ে ওই ঋণ প্রস্তাব দুটির অনুমোদন দিয়ে দেন।

ঋণ অনুমোদন হওয়ার পরের দিনই আবেদনকারীদের আবেদনের ভিত্তিতে ঋণ হিসাবে অনুমোদিত চার কোটি টাকার পৃথক দুটি পে-অর্ডার সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নামে ইস্যু করা হয়। পরে ওই পে–অর্ডার সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখায় এস কে সিনহার হিসাবে জমা হয়। তিনি বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক ক্যাশ ও চেক/পে-অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তিকে দিয়ে ওই অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলেন।

এর আগে গত বছরে জিজ্ঞাসাবাদের পর নিরঞ্জন ও শাহজাহানের আইনজীবীরা গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে চার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে তাঁর বাড়ির দাম। ফারমার্স ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে এস কে সিনহার ব্যাংক হিসাবে ওই টাকা দেওয়া হয়। আফাজ মাহমুদ রুবেল ও নাজমুল আলম নামের দুই আইনজীবী ওই দিন বলেন, দুদকের তলবে হাজির হয়ে তাঁরা ১৭১ পৃষ্ঠার নথিপত্র জমা দিয়েছেন। তাঁদের দুই মক্কেল কোনো অন্যায় করেননি দাবি করে আইনজীবীরা বলেন, সরল বিশ্বাসে তাঁরা সান্ত্রী রায় ও রঞ্জিত সাহাকে সহায়তা করেছেন।

আইনজীবীদের দাবি, এস কে সিনহার উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরের ছয়তলা বাড়িটি ২০১৬ সালের শুরুর দিকে টাঙ্গাইলের বাসিন্দা সান্ত্রী রায় ছয় কোটি টাকায় কেনার জন্য বায়না করেন। সান্ত্রী রায় সাবেক প্রধান বিচারপতির ‘কথিত পিএস’ রঞ্জিতের স্ত্রী। বাড়িটি বায়না করার পর হাউস বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশনের ৫৫ লাখ টাকা এবং বাড়ি নির্মাণের সময় নেওয়া আরও ১ কোটি ৪০ লাখ টাকাসহ মোট ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়। বাকি চার কোটি টাকা পরিশোধ করা হয় ফারমার্স ব্যাংকের পে-অর্ডারের মাধ্যমে।

ফারমার্স ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার জন্য জন্য সান্ত্রী রায় ব্যবহার করেন নিরঞ্জন ও শাহজাহানকে। নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা শান্তি রায়ের স্বামী রঞ্জিতের ভাতিজা। আর শাহজাহান রঞ্জিতের বন্ধু। ফারমার্স ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার সময় বন্ধক রাখা হয় সান্ত্রী রায়ের মালিকানায় থাকা সাভারের ৩২ শতাংশ জমি।

আইনজীবীদের তথ্যানুযায়ী, ২০১৬ সালের মে মাসে জমির বায়না দলিল হয় এবং ওই বছরের ৮ নভেম্বর দুটি পে-অর্ডারের মাধ্যমে এস কে সিনহা সোনালী ব্যাংক সুপ্রিম কোর্ট শাখার মাধ্যমে ৪ কোটি টাকা গ্রহণ করেন। ২৪ নভেম্বর হস্তান্তর দলিলের মাধ্যমে বাড়িটি সান্ত্রী রায় বুঝে নেন।

জিজ্ঞাসাবাদ শেষে নিরঞ্জন সাংবাদিকদের বলেছেন, তিনি কৃষিকাজ করেন। চাচার কথামতো তাঁকে সহায়তার জন্য ঋণ নিয়েছেন। শাহজাহান জানান, রঞ্জিত তাঁর বন্ধু। টাঙ্গাইলের ধনবাড়ি এলাকায় তাঁর দোকান রয়েছে। রঞ্জিতের কথামতো ঋণ নিয়ে তাঁকে দিয়ে দিয়েছেন। রঞ্জিত সে টাকা কাকে দিয়েছেন, সেটা তিনি জানেন না।