কোরআনের ভাষায় বৃষ্টির উপকারিতা

Wednesday, July 10th, 2019

পৃথিবীতে আল্লাহ তায়ালার অফুরন্ত রহমত রয়েছে। যার ব্যবস্থা আল্লাহ তায়ালা মানবজাতির কল্যাণ সাধনের জন্য করেছেন। দৈনন্দিনের উপকারার্থে করেছেন। সহজ জীবন চলাচলের জন্য করেছেন। মানুষের অন্ন-বস্ত্র থেকে শুরু করে প্রায় সব ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অপার নেয়ামত পরিলক্ষিত হয়, যার মাধ্যমে মানুষের নিত্যদিনের প্রয়োজন পূরণ হয়। খাবারদাবার সহজলব্ধ হয়। জমিনে তৈরি হয় কৃষিজাত উদ্ভিদ। মানুষ খুঁজে পায় বেঁচে থাকার উপায়। সুখ-শান্তি নেমে আসে জীবন চরাচরে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম ও গুরুত্বপূর্ণ উপাদেয় হলো মৌসুমি বর্ষা। আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণের মাধ্যমেই আল্লাহ তায়ালা বান্দার কল্যাণ এবং রিজিকের ব্যবস্থা করেন। বৃষ্টি বর্ষণের উদ্দেশ্য ও উপকারিতা সম্পর্কে কোরআনের বিভিন্ন আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে।

প্রাকৃতিক জীবনে দেখা যায় কয়েকদিন অঝোর ধারায় বৃষ্টি বর্ষিত হলেই মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। বিভিন্ন ভাষায় আপত্তিকর মন্তব্য করে বসে। কিন্তু কোরআনের বর্ণনায় বোঝা যায়, আল্লাহ তায়ালা মানুষকে যেমন সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন, তেমনি মানুষের কল্যাণেই বৃষ্টি বর্ষণ করে থাকেন।
বৃষ্টি বর্ষণের বিষয়ে প্রিয়নবী (সা.) বলেছেন, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘আমার বান্দারা যদি আমার বিধান যথাযথ মেনে চলত; তবে আমি তাদের রাতের বেলায় বৃষ্টি দিতাম, আর সকালবেলায় সূর্য (আলো) দিতাম এবং কখনও তাদের বজ্রপাতের আওয়াজ শুনাতাম না।’ (মুসনাদে আহমদ)।
আবার দেখা যায়, প্রিয়নবী (সা.) নিজেই আকাশে মেঘ ও বিদ্যুৎ চমকানো দেখলে এবং গর্জন শুনলে পেরেশান হয়ে যেতেন। মেঘের গর্জনের সময় তিনি কথাবার্তা ছেড়ে দিতেন। মেঘের ভয়াবহতা থেকে হেফাজত থাকতে তসবিহ এবং দোয়া পাঠ করতেন।
বৃষ্টি বন্ধে প্রিয়নবী এ দোয়া পড়তেনÑ ‘আল্লাহুম্মা হাওয়াইলানা ওয়ালা আলাইনা; আল্লাহুম্মা আলাল আকামি ওয়াল ঝিবালি ওয়াল উঝামি ওয়াজ জিরাবি ওয়াল আওদিয়াতি ওয়া মানাবিতিশ শাজারি।’ অর্থ : হে আল্লাহ! আমাদের আশপাশে বৃষ্টি বর্ষণ কর। আমাদের ওপর করিও না। হে আল্লাহ! টিলা, পাহাড়, উচ্চভূমি, মালভূমি, উপত্যকা এবং বনাঞ্চলে বৃষ্টি বর্ষণ কর।’ (বোখারি)।
বৃষ্টিবর্ষণ সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা অনেক আয়াত অবতীর্ণ করেছেন, যেমন তিনি এরশাদ করেন, ‘আমি জলধর মেঘমালা থেকে প্রচুর বৃষ্টিপাত করি, যাতে তা দ্বারা উৎপন্ন করি শস্য, উদ্ভিদ ও পাতাঘন উদ্যান।’ (সূরা নাবা : ১৪-১৬)।
‘আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে থাকি পরিমাণ মতো অতঃপর আমি জমিনে সংরক্ষণ করি এবং আমি তা অপসারণও করতে সক্ষম। অতঃপর আমি তা দ্বারা তোমাদের জন্য খেজুর ও আঙুরের বাগান সৃষ্টি করেছি। তোমাদের জন্য এতে প্রচুর ফল আছে এবং তোমরা তা থেকে আহার করে থাক। ওই বৃক্ষ সৃষ্টি করেছি, যা সিনাই পর্বতে জন্মায় এবং আহারকারীদের জন্য তেল ও ব্যঞ্জন উৎপন্ন করে।’ (সূরা মুমিনুন : ১৮-২০)।
‘তিনিই স্বীয় রহমতের প্রাক্কালে বাতাসকে সুসংবাদবাহীরূপে প্রেরণ করেন। আমি আকাশ থেকে পবিত্রতা অর্জনের জন্য পানি বর্ষণ করি। তা দ্বারা মৃত ভূভাগকে সঞ্জীবিত করার জন্য এবং আমার সৃষ্ট জীবজন্তু ও অনেক মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য এবং আমি তা তাদের মধ্যে বিভিন্নভাবে বিতরণ করি, যাতে তারা স্মরণ করে। কিন্তু অধিকাংশ লোক অকৃতজ্ঞতা ছাড়া কিছুই করে না।’ (সূরা ফুরকান : ৪৮-৫০)।
‘তিনিই আল্লাহ, যিনি নভোম-ল ও ভূম-ল সৃজন করেছেন এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে অতঃপর তা দ্বারা তোমাদের জন্য ফলের রিজিক উৎপন্ন করেছেন এবং নৌকাকে তোমাদের আজ্ঞাবহ করেছেন, যাতে তার আদেশে সমুদ্রে চলাফেরা করে এবং নদনদীকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করেছেন।’ (সূরা ইবরাহিম : ৩২)।
‘তিনিই আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন অতঃপর আমি এর দ্বারা সর্বপ্রকার উদ্ভিদ উৎপন্ন করেছি, অতঃপর আমি এ থেকে সবুজ ফসল নির্গত করেছি, যা থেকে যুগ্ম বীজ উৎপন্ন করি। খেজুরের কাঁদি থেকে গুচ্ছ বের করি, যা নুয়ে থাকে এবং আঙুরের বাগান, জয়তুন, আনার পরস্পর সাদৃশ্যযুক্ত এবং সাদৃশ্যহীন। বিভিন্ন গাছের ফলের প্রতি লক্ষ কর যখন সেগুলো ফলন্ত হয় এবং তার পরিপক্বতার প্রতি লক্ষ কর। নিশ্চয়ই এগুলোতে নিদর্শন রয়েছে ঈমানদারদের জন্য।’ (সূরা আনআম : ৯৯)।
‘তুমি কি দেখনি যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, অতঃপর সে পানি জমিনের ঝরনাগুলোতে প্রবাহিত করেছেন, এরপর তা দ্বারা বিভিন্ন রঙের ফসল উৎপন্ন করেন, অতঃপর তা শুকিয়ে যায়, ফলে তোমরা তা পীতবর্ণ দেখতে পাও। এরপর আল্লাহ তাকে খড়কুটায় পরিণত করে দেন। নিশ্চয়ই এতে বুদ্ধিমানদের জন্য উপদেশ রয়েছে।’ (সূরা জুমার : ২১)।
‘তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন। এই পানি থেকে তোমরা পান কর এবং এ থেকেই উদ্ভিদ উৎপন্ন হয়, যাতে তোমরা পশুচারণ কর। এ পানি দ্বারা তোমাদের জন্য উৎপাদন করেন ফসল, জয়তুন, খেজুর, আঙুর ও সব ধরনের ফল। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীলদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সূরা নাহল : ১০-১১)।
‘যদি আপনি তাদের জিজ্ঞেস করেন, কে আকাশ থেকে বারিবর্ষণ করে, অতঃপর তা দ্বারা মাটিকে তার মৃত হওয়ার পর সঞ্জীবিত করে? তবে তারা অবশ্যই বলবে, আল্লাহ। বলুন, সব প্রশংসা আল্লাহরই। কিন্তু তাদের অধিকাংশই তা বোঝে না।’ (সূরা আনকাবুত : ৬৩)।
‘তিনি খুঁটি ব্যতীত আকাশম-লী সৃষ্টি করেছেন; তোমরা তা দেখছ। তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন পর্বতমালা, যাতে পৃথিবী তোমাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে এবং এতে ছড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরনের জন্তু। আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছি, অতঃপর তাতে উদ্গত করেছি সব ধরনের কল্যাণকর উদ্ভিদ।’ (সূরা লোকমান : ১০)।
‘তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর স্রোতধারা প্রবাহিত হতে থাকে নিজ নিজ পরিমাণ অনুযায়ী। অতঃপর স্রোতধারা স্ফীত ফেনারাশি ওপরে নিয়ে আসে এবং অলংকার অথবা তৈজসপত্রের জন্য যে বস্তুকে আগুনে উত্তপ্ত করে, তাতেও তেমনি ফেনারাশি থাকে। এভাবে আল্লাহ সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত প্রদান করেন। অতএব ফেনা তো শুকিয়ে খতম হয়ে যায় এবং যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিতে অবশিষ্ট থাকে। আল্লাহ এভাবে দৃষ্টান্তগুলো বর্ণনা করেন।’ (সূরা রাদ : ১৭)।
‘আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, তা দ্বারা জমিনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেছেন। নিশ্চয়ই এতে তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে, যারা শ্রবণ করে।’ (সূরা নাহল : ৬৫)।
‘যে পবিত্র সত্তা তোমাদের জন্য ভূমিকে বিছানা এবং আকাশকে ছাদস্বরূপ স্থাপন করে দিয়েছেন, আর আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করে তোমাদের জন্য ফলফসল উৎপাদন করেছেন তোমাদের খাদ্য হিসেবে। অতএব আল্লাহর সঙ্গে তোমরা অন্য কাউকে সমকক্ষ করো না। বস্তুত এসব তোমরা জান।’ (সূরা বাকারা : ২২)।
‘তুমি কি দেখ না যে, আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর পৃথিবী সবুজ-শ্যামল হয়ে ওঠে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সব বিষয়ে খবরদার।’ (সূরা হজ : ৬৩)।
‘তুমি কি দেখনি, আল্লাহ আকাশ থেকে বৃষ্টি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা আমি বিভিন্ন বর্ণের ফলমূল উদ্গত করি। পর্বতগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন বর্ণের গিরিপথÑ সাদা, লাল ও নিকষ কালো কৃষ্ণ।’ (সূরা ফাতির : ২৭)।
‘আমি আকাশ থেকে কল্যাণময় বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দ্বারা বাগান ও শস্য উদ্গত করি, যেগুলোর ফসল আহরণ করা হয় এবং লম্বমান খেজুর গাছ, যাতে আছে গুচ্ছ গুচ্ছ খেজুর। বান্দাদের জীবিকাস্বরূপ এবং বৃষ্টি দ্বারা আমি মৃত জনপদকে সঞ্জীবিত করি। এভাবে পুনরুত্থান ঘটবে।’ (সূরা কাফ : ৯-১১)।
‘তার আরও নিদর্শন তিনি তোমাদের দেখান বিদ্যুৎ, ভয় ও ভরসার জন্য এবং আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, অতঃপর তা দ্বারা ভূমির মৃত্যুর পর তাকে পুনরুজ্জীবিত করেন। নিশ্চয়ই এতে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে।’ (সূরা রুম : ২৪)।
‘তখন আমি খুলে দিলাম আকাশের দরজা প্রবল বারিবর্ষণের মাধ্যমে এবং ভূমি থেকে প্রবাহিত করলাম প্রস্রবণ। অতঃপর সব পানি মিলিত হলো এক পরিকল্পিত কাজে।’ (সূরা কামার : ১১-১২)।
‘বল তো কে সৃষ্টি করেছেন নভোম-ল ও ভূম-ল এবং আকাশ থেকে তোমাদের জন্য বর্ষণ করেছেন পানি; অতঃপর তা দ্বারা আমি মনোরম বাগান সৃষ্টি করেছি। তার বৃক্ষ উৎপন্ন করার শক্তিই তোমাদের নেই। অতএব আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্য আছে কি? বরং তারা সত্যবিচ্যুত সম্প্রদায়।’ (সূরা নমল : ৬০)।
পরিশেষে বলছি, বৃষ্টি আল্লাহর নেয়ামত। যদি কখনও তা মানুষের কোনো ক্ষতি কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে বুঝতে হবে এটা মানুষের গোনাহের ফল। কারণ আল্লাহ এ দুনিয়ায় মানুষের জন্য দয়াময়। যারা তাঁকে স্বীকার করেন তাদের যেমন তিনি রিজিক দেন, দুনিয়ার যাবতীয় কল্যাণ দান করেন, ঠিক তেমনি যারা তাঁকে অস্বীকার করে, তাঁর অবাধ্য হয় তাদেরও তিনি এসব নেয়ামত দান করেন।
আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে কোরআনের সুস্পষ্ট আয়াত এবং হাদিস মোতাবেক বৃষ্টির উপকারিতা গ্রহণের তৌফিক দান করুন। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সব ধরনের অনিষ্টতা থেকে হেফাজত করুন। আমিন।