গভীর সংকটে সুদানের জনগণ

Tuesday, June 11th, 2019

আফ্রিকান দেশ সুদানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। সেই সঙ্গে চলছে সামরিক সরকারের দমন-পীড়ন। গেল এপ্রিল মাসে প্রচ- গণআন্দোলনের মুখে দেশটির দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশীরের পতনের পর সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। এর পরপরই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী সরকারবিরোধীদের সঙ্গে ক্ষমতার ভাগাভাগি বা ভবিষ্যতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করে। কিন্তু বিরোধী দল সামরিক সরকারকে আস্থায় আনতে পারেনি; তাই তারা অস্থায়ী সরকার কাঠামোতে বিরোধীদলীয় সদস্য সংখ্যা অধিক করার জন্য আলোচনার পাশাপাশি আন্দোলনও চালাতে থাকে।
গেল রমজানের শেষ দিনগুলোতে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপে এ প্রতিবাদ ও আন্দোলন সহিংসতায় রূপ নেয়। বলতে গেলে ঈদের দিন ছিল সুদানের প্রতিবাদী জনতার ওপর সে দেশের সামরিক সরকারের নির্দয় হামলার সবচেয়ে লোমহর্ষক দিন।
সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিনিয়ত জানাচ্ছে, এরই মধ্যে গুলিতে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং আধাসামরিক বহিনীর লোকেরা রাস্তায় টহল দিয়ে যাকেই পাচ্ছে বেধড়ক পেটাচ্ছে। আলজাজিরার সংবাদে বলা হয়, সুদানের বর্তমান ক্ষমতার দ-মু-ের নায়ক দুই জেনারেল অন্তর্র্বর্তীকালীন সামরিক কাউন্সিলের প্রধান লে. জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল বুরহান এবং লে. জেনারেল মোহামেদ হামদান দাগালো সৌদি আরব সফর করে দেশে ফেরার পর বিরেধীদের সঙ্গে তাদের আচরণ পাল্টে গেছে। আগের আলোচনার বা সমঝোতার সুর এখন নেই।
সুদানের এই রাজনৈতিক সংকট শুরু হয়েছে জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে। ৩ জুন বিক্ষোভকারীদের ওপর সরকারি বাহিনীর আক্রমণের নির্দেশ দেওয়ার পর থেকেই দেশটি এক অরাজকতায় ডুবে গেছে।
বিরোধী দলের সমর্থকরা বলছেন, গত ক’দিনে ১১৩ জন নিহত হয়েছে। কিন্তু সরকার ৪৬ জনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সুদানের রাজধানী খার্তুমের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগের সঙ্গেই চোখ রাখছে বিশ্বের বড় বড় কয়েকটি শহরÑ রিয়াদ থেকে কায়রো এবং আঙ্কারা থেকে মস্কো। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছেÑ রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সুদানের রাজধানী যখন উত্তাল তখন দেশটিকে ঘিরে বিশ্বের অন্য দেশগুলোর এ আগ্রহের পেছনে কারণ কী। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সংঘাতের পেছনে যেসব বিষয় ও দেশের ভূমিকা রয়েছে, সুদানের সংকটেও আছে সেসব দেশ। বিশেষ করে, সৌদি আরব ও তার মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে তুরস্ক ও কাতারের বিরোধ।
সৌদি আরবসহ সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং সুদানের প্রতিবেশী দেশ মিসর খার্তুমের সামরিক শাসককে বড় ধরনের সমর্থন দিচ্ছে।
এই তিনটি দেশই চেষ্টা করেছে ওই অঞ্চলে আরব বসন্তের মতো জনপ্রিয় আন্দোলন ঠেকাতে। চেষ্টা করেছে এই আন্দোলনের কোনো প্রভাবই যাতে তাদের দেশে ছড়িয়ে পড়তে না পারে। বিশেষ করে ইসলামপন্থি দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে দমন করার ব্যাপারে তারা খুবই সতর্ক থেকেছে।
তারা প্রত্যেকেই মনে করে এ আন্দোলন এবং মুসলিম ব্রাদারহুড তাদের মতো স্বৈরাচারী সরকারের জন্য বড় ধরনের হুমকি।
সুদানের সামরিক বাহিনীকে অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিচ্ছে রিয়াদ এবং আবুধাবি। দেশটির বেসামাল অর্থনীতিকে সামাল দিতে এরই মধ্যে তারা ৩০০ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ারও অঙ্গীকার করেছে।
এ মাসের শুরুর দিকে বিরোধীদের ওপর সরকারি দমন-পীড়ন শুরু হওয়ার আগে সুদানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় জেনারেলরা রিয়াদ, আবুধাবি ও কায়রো সফর করেছেন। এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা যেসব উদ্যোগ নিচ্ছেন সেগুলোতে এসব দেশের সমর্থন নিশ্চিত করা।
সুদানের বিষয়ে সৌদি আরব, আমিরাত ও মিসরের অবস্থানের বিপরীতে আছে তুরস্ক ও কাতার। খার্তুমের সঙ্গে তাদেরও আছে দীর্ঘদিনের সুসম্পর্ক।
আফ্রিকার এ দেশটিতে কৃষি ও খাদ্য খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছে কাতার। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগান এবং ওমর আল-বাশিরের শাসনামলেও সুদান ও তুরস্কের মধ্যে নতুন করে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
লোহিত সাগরে এক সময় অটোমান সাম্রাজ্যের দখলে ছিল এমন একটি বন্দর সুয়াকিনের উন্নয়নের জন্যে তুরস্ক ও সুদানের মধ্যে ২০১৮ সালের মার্চ মাসে ৪০০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি সই হয়েছিল। সমঝোতা হয়েছিল যে, সেখানে তুর্কি নৌবাহিনীর ছোটখাটো একটি স্থাপনাও নির্মাণ করা হবে।
ওমর আল-বাশির তার দীর্ঘ তিন দশকের শাসনামলে এ দুটি পক্ষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পেরেছিলেন। এটা তিনি করতে পেরেছিলেন ইসলামপন্থিদের দূরে সরিয়ে রাখার মাধ্যমে। ইয়েমেনে ইরানপন্থি হুতি মিলিশিয়াদের সঙ্গে যুদ্ধে তারা সৌদি আরবকে সৈন্য পাঠিয়েও সহযোগিতা করছে।
ওমর আল-বাশির হঠাৎ করেই ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলেন। সুদানে ইরানের যত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল সেগুলো আকস্মিকভাবে বন্ধ করে দেন।
এর পরপরই ২০১৫ সালের মার্চ মাসে সৌদি আরব সফর শেষে তিনি সৌদি আরবের কাছে সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। এই সৌদি আরবের সঙ্গে সুদানের বর্তমান সামরিক শাসকেরও রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
সুদানের বর্তমান আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছে পশ্চিমা দেশগুলো এবং আফ্রিকান ইউনিয়ন। আফ্রিকান ইউনিয়ন এরই মধ্যে সুদানের সদস্যপদ স্থগিত করেছে এবং দেশটিতে বেসামরিক প্রশাসনের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে না দিলে কঠোর অবস্থান নেওয়ার কথাও জানিয়েছে আফ্রিকার দেশগুলোর এ জোট। কিন্তু এ জোটের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মিসরের সঙ্গেই সুদানের সামরিক কাউন্সিলের রয়েছে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সমর্থন।
এ সংকটে মধ্যস্থতা করতে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবিই আহমেদ শুক্রবার খার্তুমে সফর করেন। তবে এরই মধ্যে ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার অভিযোগে বিরোধী দলের বেশ কয়েকজন নেতাকেও সামরিক সরকার আটক করেছে।
সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, বিরোধীদের আন্দোলন, সেই সঙ্গে সামরিক বাহিনীর দমন-পীড়ন সমানে চলছে সুদানে। কেউ জানে না, আরব বসন্তের নতুন হাওয়া সুদানকে নতুন জীবনের জয়গানে মুখরিত করবে কি না। নাকি জনতার এ ত্যাগ ও আন্দোলন মিসরের মতো সামরিক স্টিমরোলারে পিষ্ট হয়ে সাময়িকভাবে অবদমিত হবে।