পাহাড় জমছে বিশ্বে ফেলে দেওয়া ফোন, কম্পিউটার ও যন্ত্রপাতির

Wednesday, January 30th, 2019

ফেলে দেওয়া ফোন, কম্পিউটার ও যন্ত্রপাতির পাহাড় জমছে বিশ্বে

ডেস্ক নিউজঃ প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে যে পরিমাণ পুরনো স্মার্টফোন, কম্পিউটার এবং গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি ফেলে দেয়া হয় সেগুলো স্তূপ করা হলে মিশরের নয়টি পিরামিড বানানো যাবে। এবং এর দাম হবে কোস্টারিকা, ক্রোয়েশিয়া বা তানজানিয়ার মোট জিডিপির চেয়েও বেশি। জাতিসংঘের একটি নতুন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৮ সালে বিশ্বব্যাপী চার কোটি ৮৫ লাখ টন ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যার ওজন বিশ্বের সব বাণিজ্যিক বিমানের মোট ওজনের চাইতেও বেশি।

ফেলে দেওয়া এসব যন্ত্রের মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ বর্জ্য পুনর্ব্যবহারযোগ্য করা হয়। যদি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন না করা যায়, তবে জাতিসংঘের ধারণা এই ই-বর্জ্যের পরিমাণ ২০৫০ সালের মধ্যে ১২ কোটি টনে ঠেকতে পারে। ওয়ার্ল্ড গ্লোবাল কাউন্সিল ফর সাস্টেনিবল ডেভেলপমেন্ট (ডব্লিউবিএসএসডি) এর সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী পিটার বাককার বলেন, ‘বৈশ্বিক ই-বর্জ্য ক্রমেই বেড়ে চলছে এবং বাড়িয়ে তুলছে সামাজিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি।’

এখানে চারটি গ্রাফিক্সের মাধ্যমে ই-বর্জ্যের চ্যালেঞ্জ ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

১. এই পাহাড়সম আবর্জনার মূল্য সৌভাগ্যের সমান : ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাপী যে পরিমাণ ই-বর্জ্য ফেলা হয়েছে তাতে ৬ হাজার ২শ কোটি ৫০ লাখ ডলারেরও বেশি মূল্যমানের স্বর্ণ, তামা ও লোহার মতো ধাতু রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যেটা কিনা বিশ্বের সব রৌপ্য খনির মোট উৎপাদনের তিনগুণ। এমনকি ১২৩টি দেশের জিডিপি চাইতেও বেশি, বলেছে জাতিসংঘ।

ইন্টারন্যাশনাল টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন সংস্থার মতে, ২০১৬ সালে এই ই-বর্জ্য থেকে আনুমানিক দুই হাজার ১৫০ কোটি ডলার মূল্যের স্বর্ণ এবং এক হাজার তিনশ কোটি ডলার মূল্যের তামা সংগ্রহ করা হয়েছে।

২. ব্যক্তিগত ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ মোট ই-বর্জ্যের অর্ধেক: বিশ্বের অর্ধেকেরও বেশি ই-বর্জ্য আসে ফেলে দেয়া ব্যক্তিগত যন্ত্রাংশ থেকে, যেমন কম্পিউটার, স্ক্রিন, স্মার্টফোন, ট্যাবলেট এবং টিভি। এই বর্জ্যের আরেকটি বড় অংশ আসে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি থেকে। এরমধ্যে রয়েছে হিটিং এবং কুলিং অর্থাৎ গরম করা ও শীতল করার সরঞ্জাম।

একটি স্মার্টফোনে গড়ে ৬০টি উপাদান থাকে, যার মধ্যে রয়েছে এমন সব ধাতু যেটা কিনা ইলেক্ট্রনিক্স শিল্পে উচ্চ পরিবাহিতা বা হাই কন্ডাকটিভির জন্য খ্যাত। এই উপাদানগুলো পুনরুদ্ধার করার পর পুন:ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে নতুন পণ্যের সেকেন্ডারি কাঁচামাল হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

২০১৬ সালে চার লাখ ৩৫ হাজার টন ফোন বাতিল করা হয়েছিল, যার সম্ভাব্য মূল্য সাড়ে নয়শ কোটি মার্কিন ডলার, বলছে জাতিসংঘ।তার মধ্যে কিছু উপাদান তথাকথিত বিরল মাটির উপকরণে তৈরি, যেটা কিনা ব্যাটারি এবং ক্যামেরা লেন্সে ব্যবহার করা হয়। এই উপাদানটি পৃথিবীর হাতে গোনা কয়েকটি স্থানে পাওয়া যায়। এবং খনি থেকে এর উত্তোলন ও উৎপাদনের খরচ ক্রমে বেড়েই চলছে।

৩. এসব ই-বর্জ্য দারিদ্র্য-পীড়িত দেশগুলোতে অবৈধভাবে বিক্রি করা হয়: ই-বর্জ্যে থাকা তামা ও সোনার মতো মূল্যবান ধাতুগুলোকে পুনর্ব্যবহারযোগ্য করে তোলা আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার তথ্যানুসারে, নাইজেরিয়ায় এক লাখ মানুষ বিভিন্ন বেনামী ই-বর্জ্য খাতে কাজ করে বলে ধারণা করা হয়। যেখানে চীনে এই সংখ্যা আনুমানিক ছয় লাখ ৯০ হাজার।

তবে, সঠিকভাবে এই বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা না হলে, এই ই-বর্জ্যের পাহাড় বিপজ্জনক হতে পারে। ই-বর্জ্য বিশ্বের মোট আবর্জনার মাত্র দুই শতাংশ হলেও এটিই হতে পারে বিশ্বের মোট বিপজ্জনক বর্জ্যগুলোর ৭০ শতাংশ। নাইজেরিয়ায় এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে দেশটিতে ৬০ হাজার টন ই-বর্জ্য অবৈধভাবে পাঠানো হয়।

এসব ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রায় ৭৭ শতাংশই আসে ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো থেকে। এগুলো বেশিরভাগই বৈধভাবে আমদানিকৃত ব্যবহৃত গাড়ি ভর্তি করে আনা হয়। এই যন্ত্রাংশগুলো যদি মেরামত-যোগ্য বা সেকেন্ড হ্যান্ড পণ্যের মতো সরাসরি ব্যবহারযোগ্যও হয় একপর্যায়ে সেগুলোও ই-বর্জ্য হয়ে উঠতে পারে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ‘নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অবকাঠামো যেহেতু ধনী অর্থনীতির দেশগুলোর তুলনায় কম বেশ কম, তাই এই প্রবণতার পরবর্তী পরিস্থিতির বিষয়টি আঁচ করে এখনই মোকাবেলা করতে হবে’, গবেষণা বলছে।

৪. ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় উপকৃত হবে সবাই: নাইজেরিয়া ও দক্ষিণ আমেরিকার ১৩টি দেশের ই-বর্জ্যের রি-সাইক্লিং শিল্প গড়ে তুলতে জাতিসংঘ একটি প্রকল্পে অর্থায়ন করছে। তারা ‘চক্রাকার অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছে। যেখানে বিভিন্ন সামগ্রী এবং উপাদানগুলিকে পুনরায় ব্যবহার করার মতো ডিজাইন করা হবে এবং ই-বর্জ্যের সরবরাহ শূন্যে নামিয়ে আনবে।

বলা হচ্ছে, ইলেকট্রনিক্সের জন্য একটি বৃত্তাকার মডেল গ্রাহকদের খরচ ২০৩০ সাল নাগাদ সাত শতাংশ এবং ২০৪০ সাল নাগাদ ১৪ শতাংশ কমাতে পারে। জাতিসংঘ বলছে, ‘যদি সঠিকভাবে এই শিল্পটিকে উন্নত করা যায় এবং ইলেকট্রনিক্স ও ই-বর্জ্য খাতে ‘চক্রাকার অর্থনীতি’ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ কর্মক্ষেত্র তৈরি করা সম্ভব হবে।’

বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয় অস্ট্রেলিয়া, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ কোরিয়া এবং জাপানে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং কানাডায় প্রতি বছর জনপ্রতি প্রায় ২০ কেজি ই-বর্জ্য উৎপাদিত হয়, যেখানে ইইউতে এই সংখ্যা ১৭ কেজি ৭০০ গ্রাম। গোটা আফ্রিকা মহাদেশের ১২০ কোটি অধিবাসী প্রতি বছর জনপ্রতি গড়ে মাত্র এক কেজি ৯০০ গ্রাম ইলেকট্রনিক বর্জ্য উৎপাদন করে থাকে।