হুমায়ূন আহমেদের তিন ইচ্ছে পূরণের গল্প

Monday, November 19th, 2018


বিতর্কের জাল জানি রবে চিরকাল ঘিরে তোমারই চারিদিকে/তবু তুমি রবে বেঁচে তোমার সৃষ্টির মাঝে তোমারই এ নন্দিত নরকে- নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের শ্রদ্ধার্ঘ্যে লেখা কবি চমক হাসানের কবিতার অংশবিশেষ এটি। লেখক হুমায়ূন তার গল্প, উপন্যাসে সৃষ্টি করেছেন অসামান্য, বৈচিত্র্যময় সব চরিত্র। তার মত এতোটা পাঠকপ্রিয় লেখক এই বাংলায় আর জন্মায়নি, ভবিষ্যতে জন্মাবেন কী-না, কারো জানা নেই। তিনি পাঠক-দর্শক তথা বাঙালির কাছে এতটাই জনপ্রিয় যে, তার একটি নাটকের কাল্পনিক ‘বাকের ভাই’ চরিত্রের জন্য ঢাকার রাস্তায় মিছিল হয়েছিল।
মঙ্গলবার ছিল এই কিংবদন্তির ৭০তম জন্মদিন। ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়ায় জন্মগ্রহণ করেন সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ। ২০১২ সালের ১২ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। শেষ ইচ্ছানুযায়ী নিজ হাতে গড়ে তোলা গাজীপুরের নুহাশপল্লীর লিচুতলায় তাকে সমাহিত করা হয়।
কিন্তু জানেন কি, কীভাবে মৃত্যুর আগের শেষ তিন ইচ্ছে পূর্ণ হয়েছিল জনপ্রিয় এই লেখকের? সেই গল্পই শুনিয়েছেন অন্যপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী মাজহারুল ইসলাম। হুমায়ূন আহমেদের এই ঘনিষ্ঠজন বলেন, ‘উনি তো অনেক ফান করতেন, বিশেষ করে মৃত্যু নিয়ে অনেক মজা করতেন। তেমনি সার্জারির চার-পাঁচদিন আগে তিনি আমাদের ডেকে বললেন, দেখো আমার এত-বড় সার্জারি হবে বাঁচবো কি-না ঠিক নেই। তো ফাঁসির আসামিদের যেমন মৃত্যুর আগে ২টা-তিনটা ইচ্ছা পূরণ করার সুযোগ দেয়া হয় সেরকম আমিও তিনটা ইচ্ছা পূরণ করতে চাই সার্জারির আগে।
এমন কথা শুনে উনার স্ত্রী (মেহের আফরোজ শাওন) রেগে গেলেন। তো যাই হোক। এরপর তিনি বললেন-প্রথম ইচ্ছা অ্যাস্টোরিয়াতে একটা সি-ফুড রেস্তোরায় সবাইকে নিয়ে লাঞ্চ করবেন। আরেকটি হল-পিআর সেভেন্টিন বলে একটা ওপেন ফুডকোর্ট আছে যেখানে তিনি বাচ্চাদের নিয়ে যেতে খুব পছন্দ করতেন- সেখানে বাচ্চাদের নিয়ে যাবেন তিনি। আর তৃতীয় ইচ্ছা -তার স্ত্রীকে নিয়ে ক্যান্ডেল লাইট ডিনারে যাবেন এবং সেখানে থাকবেন কেবল তারা দুজন।’
অবশ্য, মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদের তিন নম্বর ইচ্ছেটি পূরণ করার কথা ছিল সার্জারির দুদিন আগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সেদিন বাচ্চাদের রেখে আর বের হতে চাইলেন না। ফলে মাজহারুল ইসলামের উপরই দায়িত্ব পড়লো গরুর মাংস কিনে এনে রান্না করার। এভাবে পূরণ হয় তার তিন নম্বর ইচ্ছেটি।
বাংলা কথাসাহিত্যে তিনি সংলাপ-প্রধান নতুন শৈলীর জনক। তার বেশ কিছু গ্রন্থ পৃথিবীর নানা ভাষায় অনূদিত হয়েছে, বেশ কিছু গ্রন্থ স্কুল-কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত। সত্তর দশকের শেষভাগে থেকে শুরু করে মৃত্যু অবধি তিনি ছিলেন বাংলা গল্প-উপন্যাসের অপ্রতিদ্বন্দ্বী কারিগর।
এই কালপর্বে তার গল্প-উপন্যাসের জনপ্রিয়তা ছিল তুলনাহীন। বাংলাদেশের সম্পদ ও বিংশ শতাব্দীতে জনপ্রিয় বাঙালি কথাসাহিত্যিকদের মধ্যে অন্যতম এই পথিকৃৎ, তার লক্ষ-কোটি ভক্তকে শোকে নিমজ্জিত করে ২০১২ সালে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। স্ব-শরীরে আজ হুমায়ূন আহমেদ না থাকলেও তার ভিন্নধর্মী ও বহুমাত্রিক লেখনীর কারণে পাঠকদের মাঝে তিনি বেঁচে থাকবেন বহুকাল। তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।