নবীপ্রেমের অনুসরণীয় উপমা

Friday, November 16th, 2018


চুনতির শাহ হাফেজ আহমদ (রহ.) কখনও স্বাভাবিক মানুষের
মতো কথাবার্তা বলতেন না। সবসময় আপন ভুবনে থাকতেন। মুখে কোরআনের আয়াত আওড়াতেন বা অতীতের বুজুর্গদের স্মৃতিচারণ করতেন অনেকটা দুর্বোধ্য ভাষায়। ১৯ দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী মাহফিলে কখনও মাইকে একটি কথাও বলেননি, কোনো নামাজে ইমামতি করেননি। এমনকি শেষ মোনাজাতও তিনি পরিচালনা করেননি। কাউকে মুরিদ করাননি। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো খলিফাও রেখে যাননি। কোনো কিতাবপত্রও লিখে যাননি। পৈতৃক সম্পদের
অতিরিক্ত কোনো সম্পদও রেখে যাননি

ঐতিহ্যবাহী ১৯ দিনব্যাপী চুনতি সিরাতুন্নবী মাহফিল ১৯ নভেম্বর থেকে শুরু হচ্ছে। প্রতি বছর রবিউল আউয়াল মাসের ১১ থেকে শেষ তারিখ পর্যন্ত একটানা এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয় দক্ষিণ চট্টগ্রমের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি গ্রামে। চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসা সংলগ্ন বিশাল সিরাত ময়দানে এবারের মাহফিল হবে ৪৮তম।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে ধর্মীয় অঙ্গনে যখন চরম হতাশা বিরাজ করছিল, তখন একজন মজজুব ওলির উদ্যোগে এ মাহফিলের সূচনা হয়। প্রথমে (১৯৭২) দিনব্যাপী, তারপর তিন দিন, পাঁচ দিন, সাত দিন, ১০ দিন, ১২ দিন, ১৫ দিন, ১৭ দিন ও সর্বশেষ ১৯ দিনে এ মাহফিলের কর্মসূচি স্থির হয়। বায়তুল মোকাররমের খতিব মরহুম মাওলানা উবায়দুল হক, খতিবে আজম মাওলানা সিদ্দিক আহমদ, প্রখ্যাত চিন্তানায়ক মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, চট্টগ্রাম আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মরহুম মাওলানা জালাল উদ্দিন আল কাদেরীসহ বিভিন্ন ঘরানার প্রায় সব শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন বিভিন্ন সময়ে বক্তা হিসেবে এ মাহফিলে অংশ নেন। মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, সৈয়দ আলী আহসানের মতো রাষ্ট্রপ্রধান থেকে নিয়ে মন্ত্রী, চিন্তাবিদ ও দেশবরেণ্য ব্যক্তিত্বরাও এ মাহফিলে যোগদান করেন। এখনও রাজনৈতিক দল ও মতের বিভিন্নতা সত্ত্বেও নেতৃস্থানীয় লোকরা সিরাত মাহফিলের মঞ্চে যেভাবে একাত্ম একাকার হয়ে যান, তার দৃশ্য বড়ই মধুর।
রহমতের নবী আল্লাহর পেয়ারা হাবিব নবী করিম (সা.) এর এ ধূলির ধরায় আগমনের সারণি হিসেবে রবিউল আউয়াল মাসে পবিত্র মিলাদুন্নবী বা নবীজন্মদিন উদযাপনের রেওয়াজ দীর্ঘদিনের। এসব মাহফিল প্রধানত নবী করিম (সা.) এর জন্মকালীন কিছু অলৌকিক ঘটনা, হজরতের মুজেজার বর্ণনা ও দরুদ-সালামের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত। চুনতির সিরাতুন্নবী মাহফিলে আলোচ্য বিষয় এমনভাবে বিন্যস্ত করা হয়, ফলে নবীজির সমগ্র জীবনের একটি তথ্যচিত্র, সমাজ ও যুগের চাহিদার আলোকে নবীজীবনের আদর্শ ও ইসলামের পুরো ইতিহাস আলোচনায় এসে যায়। এ মাহফিলের বক্তাদের অন্তত কয়েক মাস আগে থেকে নির্ধারিত বিষয়বস্তুর ওপর পড়াশোনা করে নোট তৈরি করতে হয়। সিরাতুন্নবী মাহফিলের এ ব্যতিক্রম ধারাটি নিশ্চিতভাবেই পবিত্র মিলাদুন্নবী (সা.) বা সিরাতুন্নবী (সা.) উদযাপনের ক্ষেত্রে জাতির সামনে একটি দিকনির্দেশনা।
মাহফিল প্রতিদিন বাদ জোহর থেকে শুরু হয়ে বাদ এশা পর্যন্ত কয়েকটি অধিবেশনে বিভক্ত থাকে। অধিবেশনের শুরুতে তেলাওয়াতে কোরআন ও নাতে রাসুল পাঠের রেওয়াজ, কেরাত ও নাত চর্চার ক্ষেত্রে উৎসবের আমেজে নতুন প্রজন্মের প্রতিভা ঝালাই করার এক বিরাট সুযোগ। জ্ঞান সাধনায় সমৃদ্ধ ও সমাজের কাছে অবদান রেখেছেন, এমন মান্যবর ব্যক্তিত্বরা প্রত্যেক অধিবেশনে সভাপতির আসন অলংকৃত করেন। জীবনভর সমাজের সেবা, জ্ঞানের সাধনা ও গণমানুষের শ্রদ্ধার আসনে থেকে যারা জীবন সায়াহ্নে উপনীত সিরাতুন্নবী মাহফিলের সম্মানজনক সভাপতির আসন যেন তাদের প্রতি অলিখিত এক সম্মাননা।
মাহফিলে অংশগ্রহণকারী শিশু-কিশোর নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষ এবং বিশেষ ব্যবস্থায় মহিলাদের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে দুইবেলা খাবারের আয়োজন করা হয়। রাসুলে পাক (সা.) এর মহব্বতের দাবিতে মেহমানদারি আয়োজনে অংশগ্রহণকারী ও আতিথেয়তা গ্রহণকারী উভয়ে মনে করে মাহফিলের তবরুকের মধ্যে দৈহিক ও আত্মিক নিরাময়ের উপাদান আছে। ১৯ দিনের মেহমানদারি, বক্তাদের মোটা অঙ্কে সম্মানীসহ বিপুল খরচের জোগান হয় সর্বসাধারণের দান ও অংশগ্রহণে। শেষ দিনের মাহফিল সারা রাত ধরে চলে এবং আখেরি মোনাজাতের পরপর ফজরের জামাতের মাধমে মাহফিলের সমাপ্তি হয়। স্থানীয় জনসাধারণ, চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা এবং এলাকার তরুণরা স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে মাহফিলের সার্বিক কার্যক্রমে অংশ নিতে পেরে নিজেদের সৌভাগ্যবান মনে করে।
সামগ্রিকভাবে বিচার করলে মাহফিলের আলোচ্য বিষয়গুলোর মূল প্রতিপাদ্য হলোÑ আল্লাহর রাসুলের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা আর তার পবিত্র জীবন ও সুন্নত অনুসরণের তাগাদা। আমাদের সমাজে একটি শ্রেণি নবীজির ভালোবাসার দাবিতে এমন আত্মহারা হয়ে যান যে, নবীজির আদর্শ অনুসরণের কথা তারা বেমালুম ভুলে যান। আরেকটি শ্রেণি নবীজীবনের আদর্শের দোহাই দেয় বটে, নবীজির প্রতি ভালোবাসার আলাদা অস্তিত্ব তারা স্বীকার করে না। এক্ষেত্রে চুনতির সিরাতুন্নবী দেশ ও জাতির জন্য একটি আলোকবর্তিকা। এখানে একদিকে নবীজীবনের আদর্শ অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর কর্মপন্থা সমাজের সামনে তুলে ধরা হয়, অপরদিকে আল্লাহর পেয়ারা হাবিবের মহব্বতে জীবনকে রঙিন করার প্রেরণায় উজ্জীবিত করা হয়। এ মাহফিলের সব কাজ আল্লাহর রাসুলের ভালোবাসায় কীভাবে নিবেদিত, তা উপলব্ধির জন্য মাহফিলের প্রতিষ্ঠাতার মজজুব থাকাকালীন সমুচ্চারিত একটি বাক্য বিবেচনা করাই যথেষ্ট হবে।
মাওলানা হাফেজ আহমদ (রহ.)। ১৯০৭ সালে চুনতি গ্রামেই তার জন্ম। লেখাপড়া করেন চট্টগ্রাম দারুল উলুম মাদ্রাসায়, তারপর কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসায়। দেশে ফিরে পৈতৃক জমিদারি দেখাশোনার জন্য তখনকার বার্মার আকিয়াব চলে যান। সেখানে স্থানীয় শাহি জামে মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। কথিত আছে ইমামতিতে থাকা অবস্থায় এক শবেকদরের রাতে তিনি আধ্যাত্মিক নেয়ামত লাভ করেন। তারপর থেকে ইমামতি ত্যাগ করেন এবং স্বাভাবিক জীবনের ছন্দ হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘ ৩৭ বছর তিনি বনেজঙ্গলে লোকালয়ে পাগল বেশে ঘুরতেন। তখন একটি উর্দু নাতের প্রথম কলি আওড়াতেন। ‘হাম মাজারে মুহাম্মদ পে মর জায়েঙ্গে/জিন্দেগি মে য়্যহি কাম কর জায়েঙ্গে।’ ‘আমি মুহাম্মদ (সা.) এর রওজার ওপর প্রাণ ত্যাগ করব, এ দুনিয়ায় এ কাজটিই আমি করে যাব।’ সুদীর্ঘ মত্ততার দিনগুলোতে এটিই ছিল তার সার্বক্ষণিক জপনা।
স্বাধীনতার পরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। এর পরই ১৯ দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী (সা.) প্রতিষ্ঠা করেন এবং চুনতি মাদ্রাসাকে কামিল হাদিসে উন্নীত করেন। সিরাতুন্নবী (সা.) এর বিষয়সূচি বিন্যাসে তাকে সর্বাত্মক সাহায্য করেন আলেমকুল শিরোমণি চুনতি হাকিমিয়া আলিয়া মাদ্রাসার নাজেমে আলা মাওলানা ফয়জুল্লাহ (রহ.)। বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা হলো, চুনতির শাহ হাফেজ আহমদ (রহ.) কখনও স্বাভাবিক মানুষের মতো কথাবার্তা বলতেন না। সবসময় আপন ভুবনে থাকতেন। মুখে কোরআনের আয়াত আওড়াতেন বা অতীতের বুজুর্গদের স্মৃতিচারণ করতেন অনেকটা দুর্বোধ্য ভাষায়।
১৯ দিনব্যাপী সিরাতুন্নবী মাহফিলে কখনও মাইকে একটি কথাও বলেননি, কোনো নামাজে ইমামতি করেননি। এমনকি শেষ মোনাজাতও তিনি পরিচালনা করেননি। কাউকে মুরিদ করাননি। আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো খলিফাও রেখে যাননি। কোনো কিতাবপত্রও লিখে যাননি। পৈতৃক সম্পদের অতিরিক্ত কোনো সম্পদও রেখে যাননি।
১৯৮৩ সালের ২৯ নভেম্বর সর্বস্তরের মানুষের হৃদয়ের এ মানিক আপন প্রভুর সান্নিধ্যে চলে যান। তার ইন্তেকালের পর দীর্ঘ ৩৬ বছর ধরে এ মাহফিলের কার্যক্রম বিরতিহীনভাবে চলছে। জীবনের শুরুতে এ মাহফিলের নগণ্য কর্মী হওয়ার মধুময় স্মৃতিতে আমার হৃদয় এখনও আপ্লুত।