সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নির্মম পরিণতি

Monday, November 12th, 2018

অকস্মাত্ কিছু কিছু বড় ঘটনার অভিঘাত এই পৃথিবীর মানুষের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। উহার রেশ রহিয়া যায় বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া। সতেরো বত্সর পূর্বে নিউইয়র্কে ঘটিয়াছিল তেমনই একটি ঘটনা। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর এখন অবধি কথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে সারা বিশ্বে নিহত হইয়াছেন ৫ লক্ষাধিক মানুষ।

যুক্তরাষ্ট্রের ব্রাউন ইউনিভার্সিটির ওয়াটসন ইনস্টিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড পাবলিক অ্যাফেয়ার্স-এ প্রকাশিত এই সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, কথিত এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ব্যয় হইয়াছে ৫ লক্ষ ৬০ হাজার কোটি ডলার। অবশ্য মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাবমতে, ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংসের পর হইতে এখন অবধি যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবাবদ ব্যয় করিয়াছে দেড় লক্ষ কোটি ডলার। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতিটি মার্কিন নাগরিককে কথিত যুদ্ধবাবদ গড়ে কর দিতে হইয়াছে প্রায় ২৩ হাজার ডলার। যুদ্ধ অব্যাহত রাখিতে সেইসময় বাজেট ঘাটতির মুখে পড়িতে হইয়াছিল বিশ্বের বৃহত্ পরাশক্তিধর দেশটিকে। কিন্তু সেইসময় প্রয়োজনে ঋণ লইয়া হইলেও তাহারা অব্যাহত রাখে কথিত এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ। বিশ্ব দেখিয়াছে আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পরাশক্তিদের জোটবদ্ধ আগ্রাসন। তবে ২০০১ সাল হইতে এখন অবধি এইসকল যুদ্ধে মোট কতজন নিহত হইয়াছেন, তাহা সঠিকভাবে জানা সম্ভব হয় নাই। তাহা ছাড়া, যুদ্ধের প্রভাবে অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি বা রোগসহ পরোক্ষভাবে কতজন মারা গিয়াছেন—তাহাও নিরূপণ করা সম্ভব হয় নাই। তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, ব্রাউন ইউনিভার্সিটির গবেষকরা বলিতেছেন যে, আমেরিকার জনগণ, গণমাধ্যম এবং আইনপ্রণেতারা এই সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ লইয়া খুব বেশি মাথা ঘামান না। এই কারণে গবেষকরা মনে করিতেছেন যে এই যুদ্ধ দিনকে দিন আরও তীব্রতর হইতেছে।

এই বিশ্বে কথিত শান্তি-স্বস্তি আনয়নের জন্য বিংশ শতকে পরাশক্তিদের দুইটি পক্ষকে আমরা দুইটি মতবাদ বিশ্বব্যাপী রফতানি করিতে দেখিয়াছি। মেরুর নেতারা যদি ঠিক করেন যে, তাহাদের আদর্শের পেঙ্গুইনকে মরুভূমিতেও ছড়াইয়া দিবেন, তবে সেই পেঙ্গুইন বাঁচিবে কীভাবে? বরং তাহার মৃতদেহ হইতে রোগ ছড়াইতে পারে। একইভাবে ওয়াশিংটন বা মস্কোর নিজস্ব ‘অপূর্ব গোলাপ’ অন্যদেশের আবহাওয়ায় নাও বাঁচিতে পারে। সকল জনপদের নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য রহিয়াছে, কিন্তু পরাশক্তিরা নিজেদের কথিত আদর্শিক বৈশিষ্ট্য চাপাইয়া দিতে চেষ্টা করে বহুল-বৈচিত্র্যের বিভিন্ন জনপদে। তাহাতে যে হিতে বিপরীত হইতে পারে—ইহাতে অবাক হইবার কিছু নাই। অনেক ক্ষেত্রেই বাঘের ঘরে ঘোগের বসবাসের মতো সন্ত্রাসের বীজতলার সন্ধান পাওয়া যায় কথিত সন্ত্রাসবিরোধী দেশেই। তাই শেষাবধি এই ধরনের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ পরিণত হয় নির্মম প্রহসনে। নিহত হয় লক্ষ লক্ষ উলুখাগড়া। এইক্ষেত্রে নিজেদের মতাদর্শ ও অবয়বকে স্বচ্ছ দর্পণে দেখিতে হইবে সন্ত্রাসবাদ বিরোধীদের। নচেত্ মানুষের রুধিরের স্রোত থামিবে না সহজে।