ইসলামি শিক্ষাবিজ্ঞান একটি মূল্যায়ন

Monday, November 5th, 2018


ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল রয়েছে। আমরা মনে করি মাদ্রাসা শিক্ষাই একমাত্র ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অন্যান্য শিক্ষা ব্যবস্থা তাই ইসলামিক নয়। আবার কখনও কখনও বিজ্ঞজনদেরও দেখা যায় কথায় কিংবা লেখায় হরহামেশা ব্যবহার করেন ‘ইসলামি শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষা’। এটি কত বড় মারাত্মক তা আমাদের অবহেলার কারণে অনুধাবন পর্যন্ত করতে পারি না। মাদ্রাসা শিক্ষাকে ইসলামি শিক্ষা এবং অন্যান্য সাধারণ শিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করে দুটি জঘন্য অপরাধ আমরা করে থাকি। যথাÑ ১. ইসলামি শিক্ষার প্রকৃতি ও পরিধিকে ছোট করে ফেলি, যা মানবতার জন্য কল্যাণকর হতে পারে না; হয়ও না। এবং ২. ইসলামি শিক্ষাকে সেকেলে বলে ধরে নেওয়া হয়। এ দুটির কোনোটিই সত্য নয়। কারণ হলোÑ
১. ইসলাম শুধু প্রচলিত অর্থেও একটি ধর্ম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। (সূরা আলে ইমরান : ১৯)। যদি তাই হয় তাহলে জীবনের চলার পথে সব বিষয়ের সমন্বিত রূপ হবে ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা। সেখানে ধর্মীয় বিষয়গুলোর পাশাপাশি অন্যান্য দুনিয়াবি বিষয়াবলির সমন্বয় ঘটবে তিনটি মূলনীতিকে সামনে রেখে। যেমনÑ ক. তাওহিদ। এখানে তাওহিদ বা এক আল্লাহর এবং তার একত্ববাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কিছুই শিক্ষা দেওয়া হবে না। খ. কোরআন ও সুন্নাহর পরিপন্থি কোনো কিছুই শেখানো হবে না এবং গ. কল্যাণকর। সে শিক্ষা হবে মানবতা তথা সব সৃষ্টিকুলের কল্যাণার্থে। এ তিনটি বিষয় ঠিক রেখে যে কোনো শিক্ষা ব্যবস্থায়ই ইসলামী শিক্ষা হিসেবে গণ্য হবে। কারণ, রাসুল (সা.) এর হাদিসে বলা হয়েছে, ‘… ওই জ্ঞান যা মানুষের উপকারে আসে (মৃত্যুর পরও তার বিনিময় ওই ব্যক্তি পাবেন)।’ (বোখারি)। এখানে জ্ঞানকে মানবকল্যাণের জন্য বিবেচিত করা হয়েছে। লক্ষ্য করুন, মাদ্রাসায় যে শিক্ষা দেওয়া হয় তাতে কোনো চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সমাজতত্ত্ববিদ, বিজ্ঞানী পাওয়ার সম্ভাবনা কতটুকু? তাহলে ইসলামি জীবন ব্যবস্থায় এগুলোর কি প্রয়োজন হবে না? এগুলো আমাদের জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীকভাবে জড়িত। তাহলে? অথচ আমাদের দেশে আলিয়া মাদ্রাসায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে (কামিলে) মাত্র চারটি বিষয়ের দক্ষতার সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। তা হলোÑ তাফসির, হাদিস, ফিকহ ও আরবি সাহিত্য।
২. ‘ইসলামি ও আধুনিক শিক্ষা’ পরিভাষা ব্যবহার করলে প্রকারান্তে ইসলামকে হেয় করা হয়। এতে বোঝা যায় ইসলামি শিক্ষা আধুনিক নয়। এটি পুরাতন; সেকেলে। আধুনিক মানুষ তখন এ থেকে সরাসরি মুখ ফিরিয়ে নেবে, এটাই স্বাভাবিক। অথচ, ইসলামের এবং এ শিক্ষার মূল দুটি উৎস কোরআন ও হাদিসের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো তা কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের জন্য কার্যকরি হবে। এখন এগুলোকে সময়োপযোগী হিসেবে বোঝা, উপস্থাপন করা কিংবা ব্যবহার উপযোগী করা কাদের দায়িত্ব? নিশ্চয় আমাদের। এ লক্ষ্যেই হয়তো আল্লাহ তায়ালা মানব সৃষ্টির শুরুতে বলেছিলেন, ‘আমি পৃথিবীতে খলিফা প্রেরণ করতে চাই।’ (সূরা বাকারা : ৩০)। আর প্রতিনিধিদের কি কোনো কাজ থাকবে না? অবশ্যই। তা হলো, আল্লহর কাছে মনোনীত এ ধর্মকে বুঝে, নিজে যেমন আমল করবে তেমনি অন্যদের পালন করার উৎসাহ-উদ্দীপনা জোগাবে এবং তা নিশ্চিত করার প্রাণবন্ত প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে। তাহলেই তো মুক্তি সম্ভব।
এসব কারণে ইসলামি শিক্ষাবিজ্ঞান সম্পর্কে সাম্যক জ্ঞান থাকা একজন মোমিন, মুসলিমের জন্য অতীব জরুরি। ইসলামি শিক্ষা বিজ্ঞানে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো অবশ্যম্ভাবীভাবে থাকবেÑ
তাওহিদ বা একত্ববাদ। এ শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হবে তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। তার একক ইবাদত সেখানে নিশ্চিত হবে।
মানুষ হলো খলিফা (প্রতিনিধি)। ইসলামি শিক্ষায় এ মূলনীতি আবশ্যকীয়। মানুষ যখন বুঝতে পারবে তাদের প্রতিনিধি হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছে তখন তারা তাদের নিজেদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হবে, তেমনি তা ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণে নিজেদের ব্যস্ত রাখবে।
মাকাসিদুশ শরিয়া (ইসলামি বিধানের উদ্দেশ্যগুলো) ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থায় সুস্পষ্টভাবে শিক্ষা দেওয়া হবে। উদ্দেশ্য জানলে মানুষ তা পালন করতে উৎসাহী হবে এটাই স্বাভাবিক। শরিয়তের প্রতিটি বিধানের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বিধানদাতা কর্তৃকই নির্ধারিত। এগুলো যে কোনো বিবেচনায় মানব কল্যাণময়।
ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা ইসলামি শিক্ষার অন্য একটি বৈশিষ্ট্য। দুনিয়া এবং আখেরাতের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ জীবন ব্যবস্থায় প্রকৃত সফলতা নিহিত। ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা এটিকে নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে। তখনই শুধু মানুষ আখেরাতের জবাবদিহিতাকে সামনে রেখে দুনিয়ার দায়িত্ব-কর্তব্যকে যথাযথভাবে পালন করবে।
ন্যায়পরায়ণতা শুধু আইন ও বিধানের ক্ষেত্রে নয় বরং জীবনের প্রতিটা স্তরে নিশ্চিত করে ইসলামি শিক্ষা ব্যবস্থা। সেখানে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ তৈরি হবে না; সাম্যতা সেখানে অবশ্যম্ভাবী হিসেবে উপস্থিত হবে। বঞ্চনা তাই বিতাড়িত হবে প্রতিটা ক্ষেত্রে।
মানবকল্যাণকে নিশ্চিত করে ইসলামি শিক্ষা। এ শিক্ষার মূল লক্ষ্যই হলো মানবকল্যাণ।
মধ্যপন্থি জীবন ব্যবস্থা উত্তম, এটি ইসলামি শিক্ষার অনন্য লক্ষ্য। বাড়াবাড়ির যেমন স্থান নেই সেখানে আবার হেলায় ফেলায় গড্ডালিকায় নিজেকে ভাসিয়ে দেওয়ার কোনো স্পৃহা তৈরি হবে না এ শিক্ষায় শিক্ষিতরা।
সর্বোপরি এটি একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা ব্যবস্থা হবে। যেখানে জীবনের প্রয়োজন মেটানো সহজলভ্য এবং সক্ষম হবে। জীবনের কী প্রয়োজন তা পূরণে সক্ষম হবে এ শিক্ষা ব্যবস্থা।
কোনো শিক্ষা ব্যবস্থা যখন উপরোক্ত বিষয়গুলোকে নিশ্চিত করবে তখন মানব সভ্যতায় হানাহানি, মারামারি, হিংসা-বিদ্বেষ, হত্যা-রাহাজানি, দুর্নীতি ইত্যাদি বন্ধ হয়ে প্রতিষ্ঠা পাবে অনাবিল শান্তি। এটিই কি আমাদের কাম্য নয়?