১২ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৮শে কার্তিক, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

হেদায়েত পেতে কেন তাকওয়া প্রয়োজন

প্রকাশিতঃ অক্টোবর ১৩, ২০১৮, ১২:০৭ পূর্বাহ্ণ


কোরআন থেকে হেদায়েত পেতে হলে মানুষের সর্বপ্রথম যে গুণটি অর্জন করতে হবে, তা হচ্ছে তাকওয়া। তাকওয়ার গুণ ছাড়া কোনোভাবেই কোরআন থেকে হেদায়েত পাওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ তায়ালা কোরআনের প্রথমেই স্পষ্টভাবে বলে দিয়েছেনÑ ‘তা মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত গ্রন্থ।’ যদিও কোরআনের সূরা বাকারার ১৮৫নং আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানবজাতির হেদায়েতের জন্য।’ এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণ হয় যে, কোরআন হেদায়েতের পথ দেখাতে চায় গোটা মানবজাতিকে; কিন্তু মানবজাতির মধ্যে যারা মুত্তাকি হয়েছে, তাকওয়ার নীতি অবলম্বন করেছে শুধু তারাই কোরআন থেকে হেদায়েত লাভ করেছে, অন্যরা নয়। তাই কোরআন থেকে হেদায়েত পেতে হলে অবশ্যই খোদাভীতি বা তাকওয়ার গুণ অর্জন করতে হবে এবং এ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হবে।
তাকওয়ার বিশ্লেষণ : তাকওয়ার আভিধানিক অর্থÑ বেঁচে থাকা, রক্ষণাবেক্ষণ করা, ভয় করা, বিরত থাকা ইত্যাদি। পারিভাষিক অর্থে তাকওয়া হলোÑ আল্লাহর ভয় ও তাঁর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে যাবতীয় অপরাধ, অন্যায় ও আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ, কথা ও চিন্তা থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার নাম তাকওয়া।
আল্লামা জালাল উদ্দিন সুয়ুতি (রহ.) বলেন, তাকওয়া এমন সব বস্তু থেকে বেঁচে থাকাকে বোঝায়, যা আখেরাতের দৃষ্টিতে ক্ষতিকর, হোক সেটা আকাইদ ও আখলাকসংক্রান্ত কিংবা কথা ও কাজসংক্রান্ত। একবার উবাই ইবনে কাব (রা.) কে ওমর (রা.) তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। তিনি বললেন, হে আমিরুল মোমিনিন আপনি কি কখনও পাহাড়ের দুই ধারে কাঁটাযুক্ত মাঝখানের সরু পথ দিয়ে হেঁটেছেন? তিনি বললেন হ্যাঁ, আবার জিজ্ঞেস করলেন হে আমিরুল মোমিনিন, তখন আপনি কীভাবে হেঁটেছেন? তখন ওমর (রা.) বলেন, এ অবস্থায় আমার গায়ে যেন কাঁটা না লাগে সেজন্য জামা গুটিয়ে খুব সাবধানে সতর্কতার সঙ্গে পথ অতিক্রম করেছি। তখন উবাই ইবনে কাব (রা.) বললেন, হে আমিরুল মোমিনিন এটাই হলো তাকওয়া। এর থেকে বোঝা যায়, দুনিয়ার সব খারাপি থেকে খুব সতর্কতার সঙ্গে নিজেকে মুক্ত রেখে আল্লাহর ভয়ে জীবনযাপন করার নামই হলো তাকওয়া। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘(মুত্তাকি) তারা যারা আল্লাহপাকের কোনো আদেশ অমান্য করে না আর আল্লাহপাক তাদের যে আদেশ করেন, তা যথাযথভাবে পালন করে।’ (সূরা তাহরিম : ৬)।
তাকওয়া মূলত এক অদৃশ্য জিনিস, যা একান্ত আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক। যেমন নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা তোমাদের চেহারা, আকৃতি ও সম্পদ দেখেন না, বরং তিনি তোমাদের অন্তর ও কাজকর্ম দেখেন।’ (মুসলিম ও ইবনে মাজাহ)।

তাকওয়া অর্জনের দুটি পদ্ধতি
খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকা : বান্দা যখন দুনিয়ার এ কণ্টকময় চলার পথে শয়তানের কোনো ধোঁকা বা দুনিয়ার কোনো লোভ-লালসার খপ্পরে পড়ে খারাপ কাজে লিপ্ত হতে যায় ঠিক সেই মুহূর্তে যদি শুধু আল্লাহর ভয়ে নিজেকে সেই পাপ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে সেটাই হলো তাকওয়া। যখন দুনিয়ার কেউ থাকে না এ অবস্থায় কোনো অন্যায় বা খারাপ কাজ করলে বাধা দেওয়ার মতো কিংবা দেখার মতো কেউ থাকে না, ঠিক সেই মুহূর্তে শুধু আল্লাহর ভয়ে সব খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকাই হলো তাকওয়া।
যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তারা আল্লাহপাকের কোনো আদেশ অমান্য করে না। আর আল্লাহপাক তাদের যে আদেশ করেন, তা পালন করে।’ (সূরা তাহরিম : ৬)।
ভালো কাজ করা : একজন মুত্তাকি যত ছোট থেকে বড় আমলই করুক না কেন, তা শুধু আল্লাহর জন্যই করবে। ভালো কাজ করার পেছনে কোনো দুনিয়াবি চাওয়া-পাওয়া থাকে না, খ্যাতি বা প্রশংসার চাহিদাও থাকে না। অর্থাৎ একজন মুত্তাকির সব কর্মকা-, সব চাওয়া-পাওয়া হবে একমাত্র আল্লাহকে ঘিরেই।
যেমন একটি হাদিসে নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা কেয়ামতের দিন তোমাদের বংশ ও আভিজাত্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবেন না। বরং তোমাদের মধ্যে যে বেশি আল্লাহভীরু সে-ই আল্লাহর কাছে সর্বাধিক মর্যাদার অধিকারী হবে।’ (ইবনে জারির)।

দুটি গুণ থাকা জরুরি
১. একজন মুত্তাকির ভালো ও মন্দের মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা বা পার্থক্য বোঝার মতো মানসিকতা থাকতে হবে।
২. তার মধ্যে মন্দ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার ও ভালোকে গ্রহণ করার আকাক্সক্ষা এবং এ আকাক্সক্ষাকে বাস্তবায়িত করার ইচ্ছা থাকতে হবে।

মুত্তাকিদের তিনটি স্তর
প্রথম স্তর হলোÑ কুফর থেকে তওবা করে ইসলামে প্রবেশ করা এবং নিজেকে চিরস্থায়ী জাহান্নামের ক্ষতি থেকে রক্ষা করা।
দ্বিতীয় স্তর হলোÑ কবিরা গোনাহ থেকে নিজেকে বিরত রাখা এবং সগিরা গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা।
তৃতীয় স্তর হলোÑ নিজের নফসকে ওইসব বস্তু থেকে বিরত রাখা, যেগুলো আল্লাহ তায়ালার স্মরণ থেকে গাফেল করে দেয়। (পৃ-৭৪, প্রথম খ-)।
তাফসিরে মাজেদিতে বলা হয়েছে, মুত্তাকি তারাই, যাদের অন্তরে আল্লাহভীতি বিদ্যমান রয়েছে, আর রয়েছে সত্য গ্রহণ করার মানসিকতা। তা না হলে সে কখনও কোরআন থেকে হেদায়েত পাবে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘পক্ষান্তরে যে স্বীয় প্রতিপালকের সম্মুখে উপস্থিত হওয়ার ভয় করে এবং প্রবৃত্তির খারাপি থেকে নিজেকে বিরত রাখে, জান্নাতই হবে তার আবাসস্থল।’ (সূরা নাজিআত : ৩৯, ৪০)।

কেন তাকওয়া প্রয়োজন?
১. শুধু আল্লাহর ভয়ে সব ধরনের প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্যের গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাকওয়া প্রয়োজন।
২. নির্জনে একাকিত্বের খারাপি থেকে বেঁচে থাকার জন্য তাকওয়া প্রয়োজন।
৩. সব ধরনের আমানত রক্ষার জন্য তাকওয়া প্রয়োজন।
৪. নিজ পারিবারিক ও সাংগাঠনিক দায়িত্ব পালন যথাযথভাবে হক আদায় করে করার জন্য তাকওয়া প্রয়োজন।
৫. রাষ্ট্রের আমানত ও দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার জন্য তাকওয়া প্রয়োজন।
এককথায় তাকওয়া ছাড়া কোনোভাবেই নিজেকে গোনাহের কাজ থেকে এবং খারাপির হাত থেকে বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।
তবে যারা দুনিয়ায় পশুর মতো জীবনযাপন করে, নিজেদের কৃতকর্ম সঠিক কি না, সে ব্যাপারে কখনও চিন্তা করে না, যেদিকে সবাই চলছে বা যেদিকে প্রবৃত্তি তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে, যে দিকে তার মন চায়, সে দিকে চলতে যারা অভ্যস্ত, তাদের জন্য কোরআনে কোনো পথনির্দেশনা বা হেদায়েত নেই। কোরআন থেকে তারা কখনও হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে না। তাই তো আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘এটা মুত্তাকিদের জন্য হেদায়েত গ্রন্থ।’ আরও বলেন, ‘তারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে অথবা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে সঙ্গে সঙ্গে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে। আল্লাহ ছাড়া কে তোমাদের পাপ ক্ষমা করবে? আর তারা জেনে-বুঝে ভুল করে ফেলে তাতে অটল থাকে না।’ (সূরা আলে ইমরান : ৩ : ১৩৫)।
আল্লাহপাক আমাদের সর্ববস্থায় মুত্তাকির জীবনযাপন করার তৌফিক দান করুন, আমিন।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT