২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

সড়কে চিত্রশিল্প, পরতে পরতে ইতিহাস

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৪, ২০১৮, ১১:৩৩ পূর্বাহ্ণ


মি. চেন ডং ফ্যান নামের চীনের একজন তরুণ চিত্রকর তার শ্রেষ্ঠ শিল্পকর্মের জন্য বেছে নিলেন ম্যানহাটনের চায়না টাউনের ডয়ার্স স্ট্রিট নামের ছোট্ট একটি ব্যস্ত গলিপথ। উনিশ শতকে যে রাস্তার রং বদলে যেত অপরাধী চক্রের লড়াইয়ে ঝরে যাওয়া প্রাণের রক্তে রঞ্জিত হতো। আজ ২০১৮ সালে চেন ডং ফ্যান নামের একজন চিত্রশিল্পীর ব্যতিক্রমী সৃষ্টি ‘ড্রাগন এবং ফুলের সংগীত’ নামের একটি চিত্রকর্ম অভিনবভাবে চিত্রিত হচ্ছে। ব্যস্ত চায়না টাউনের পিল স্ট্রিট থেকে বাউরি পর্যন্ত সড়কে এত বেশি মারদাঙ্গার ঘটনা ঘটতো বলেই স্থানীয় জনগণ ওই স্থানটির নাম রেখেছিল রক্তাক্ত জনপদ।

বর্তমানে উইলিয়ামসবার্গে বসবাসকারী চিত্রকর চেন ডং ফ্যানের মাথায় প্রথম বিষয়টি আসে ২০১১ সালে, যখন তিনি প্রথমবারের মত্য নিউইয়র্কে বেড়াতে আসেন। মান্দারিন ভাষায় তিনি তাঁর ভাবনাকে ব্যাখ্যা করে বলেন, আমি যখন কোন ব্যক্তির পোর্ট্রেট আঁকি তখন আমি তার আত্মার সঠিক রূপকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। তেমনি এই ব্যস্ত রাস্তার পোর্ট্রেট করতে গিয়ে আমার তুলির আঁচড়ে বারবার জনপদের আত্মার ছবি ভেসে উঠতে থাকল।

টানা আট দিনের বিরামহীন কর্মযজ্ঞে শিল্পীর সঙ্গী ছিল অ্যাক্রিলিক পেইন্ট আর লম্বা লম্বা ক্যালিওগ্রাফি তুলি; সঙ্গে জ্যাজ, বিটোভ্যান আর চমকে ওঠা ড্যান্স মিউজিকের প্রেরণাদায়ক সুর। এক শ ভাগ উদ্যম নিয়ে শুরু করে শিল্পী চেন ডং ফ্যান তার অভিনব চিত্রকর্ম শেষ করেন গত ২৭ জুলাই।

চায়না টাউনের বাসিন্দাদের মধ্যে প্রথমে এ নিয়ে কিছুটা দ্বিধা থাকলেও সদ্য শেষ হওয়া বিশাল এই চিত্রকর্ম দেখে তাদের মধ্যে আনন্দ আর উচ্ছ্বাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। মিড টাউন থেকে আসা অ্যাডমন্ড ল্যু বলেন, খুবই সুন্দর হয়েছে। আমি মনে করি এটি একটি বিরাট কাজ।

বর্তমানে রাস্তাটি সম্পূর্ণ যানমুক্ত রাখা হয়েছে। পথচারীদের জন্য খোলা এই গলিপথটির যান চলাচল বন্ধ রাখা হবে আগামী ১ নভেম্বর পর্যন্ত। শুরুতে এই প্রকল্পটি কিছুটা সমালোচনার মুখে পড়েছিল। কারণ ডয়ার্স স্ট্রিটে সেলুন, গিফট শপসহ অনেক রেস্তোরাঁ থাকায় নগর কর্তৃপক্ষের আবর্জনাবাহী ট্রাক চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। তবে নগরের পরিবহন বিভাগ এবং স্থানীয় চায়না নেইভারহুড অ্যাসোসিয়েশনের সর্বোচ্চ সহযোগিতায় এই সমস্যার সমাধান হয়ে যায়।

এই অভিনব চিত্রকর্ম সৃষ্টির অনুপ্রেরণার ইতিহাস জানাতে গিয়ে মি. চেন বলেন, এ ধরনের পথচারী পারাপারের স্থানে অনেক শিল্পকর্ম ইউরোপের অনেক শহরে বেশ জনপ্রিয় ও জনগণের কাছে সাদরে গৃহীত। তাই তিনি যখন চায়না টাউনের এই গলিপথে এসে দাঁড়ালেন তখনই তার সামনে ভেসে উঠল বিগত শতকে ঘটে যাওয়া নানা কাহিনি যার শেষ চিত্র ছিল তাজা রক্তপাতে হেঁটে চলা পথটি লাল রঙে রঞ্জিত। স্থানীয় বাসিন্দারা লাল রক্তে ভেজানো গলিপথ সর্বদা পানি ঢেলে পরিষ্কার করেই দিন শুরু করতেন।

তবে নম ওয়াহ টি পারলারের স্বত্বাধিকারী উইলসন ট্যাং এই শিল্পকর্মের বিরোধিতা করে বলছেন, তরুণেরা এসবের চেয়ে আরও ভালো কাজ করতে পারত। রাস্তা বন্ধ থাকায় আমার ও অন্যান্যের ব্যবসার অসুবিধা যেমন হচ্ছে তেমনি বাসাবাড়িতে জমে থাকা আবর্জনা সংগ্রহে সমস্যা হচ্ছে। তা জেনেও নগর কর্তৃপক্ষ এমনতর সত্তরটি উন্মুক্ত স্থান পথচারীদের জন্য নির্মাণ করতে চলছে। তা হয়তো চিত্রশিল্পের সঙ্গে নগর কর্তৃপক্ষের দায়বদ্ধতা থেকে এসেছে।

চায়না টাউনের ডয়ার্স স্ট্রিটের অনুরূপ শিল্পকর্মের জন্য নাগরিকদের অংশ নিতে শিগগিরই আহ্বান জানানো হবে বলে নগর কর্তৃপক্ষের ট্রান্সপোর্ট ডিপার্টমেন্টের সহকারী প্রেস সেক্রেটারি এলানা মোরালেস জানান। তিনি আরও বলেন, ডয়ার্স স্ট্রিট এই মুহূর্তে এ ধরনের শিল্পকর্মের জন্য উপযুক্ত স্থান বটে। পরবর্তী নির্ধারিত স্থান হতে চলছে ম্যানহাটনের গার্মেন্টস ডিস্ট্রিক্ট। ডয়ার্স স্ট্রিটের দেয়াল আগে যেখানে চায়না থেকে প্রকাশিত নানা ভাষায় পত্রিকা সাঁটা থাকত, আজ সেখানে সাঁটা আছে আধুনিক শিল্পকর্মের নানা খণ্ডচিত্র। পাশাপাশি দেখা যায়, পেশাদার আলোকচিত্রশিল্পীদের তোলা নয়নাভিরাম আলোকচিত্রের সারি।
চিত্রশিল্পী বারবার বলতে থাকেন, আমি খুবই সুখী। নিজ দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য এই শহরে উল্লেখযোগ্য কিছু একটা করতে পারলাম। চায়না টাউনের এই ঐতিহাসিক স্থান নির্বাচনে আন্তর্জাতিক একটি শিল্প সংস্থার জোরালো ভূমিকা ছিল। সংস্থাটি সারা পৃথিবীজুড়ে শিল্প প্রদর্শনীর জন্য এমন দশটি স্থান নির্বাচন করতে সক্ষম হয়েছে।

চিত্রকর চেন ডং ফ্যানের পথচিত্র সৃষ্টির প্রতি মুহূর্ত ছিল উত্তেজনায় ভরপুর। চলতি মাসে শুরু হওয়া এই ঐতিহাসিক শিল্পকর্মের শুরুতেই নির্দিষ্ট স্থানে দেওয়া হলো চার স্তরের সাদা রঙের প্রলেপ। চেন প্রথমেই শুরু করল ক্যালিডোস্কোপ (kaleidoscope) নামের বহুমাত্রিক ডিজাইনের সফল প্রয়োগ। চলমান যানে রাখা রং নিয়ে শুরু করা চেনের অপূর্ব কাজ স্বল্প সময়ে সবার কাছে হয়ে উঠল অনেক জনপ্রিয় একটি ভালোলাগার বিষয়। আর কে থামায় চেনকে? সীমাহীন স্পৃহা আর শিল্পের প্রতি আজন্ম অনুরাগে চলতে থাকল নানা রঙের প্রলেপ। পুরো আট দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে সপ্তাহান্তে ডয়ার্স স্ট্রিটের অধিবাসীরা দেখল চায়না টাউনের ইতিহাসে এই প্রথম এক অনন্য সৃষ্টি, যা এই প্রিয় নিউইয়র্ক নগরে যেমন প্রথম, তেমনি প্রথম চায়না টাউনের ২০০ শত বছরের ইতিহাসে।

বাইশি বিউটি সেলুনের কর্ণধার বাই ইউঙ্গ বললেন, “আমার মনে হচ্ছে ব্যতিক্রমী এ কাজটি আমার ব্যবসায় সাহায্য করবে। নগরীতে রঙিন হাঁটাপথ এটাই বুঝি প্রথম। তাই আমি বলি, যা হয়েছে তা ‘ম্যাজিক’।”

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT