২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

সৌদি-কানাডা বৈরিতার নেপথ্যে যুবরাজ সালমান?

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৯, ২০১৮, ১১:৪৬ পূর্বাহ্ণ


কানাডার সঙ্গে সৌদির কূটনৈতিক সম্পর্কে চিড় ধরেছে। সম্প্রতি রিয়াদে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করেছে সৌদি। একই সঙ্গে কানাডায় নিযুক্ত নিজেদের রাষ্ট্রদূতকে দেশে ফিরার নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

একটি টুইটের ওপর ভিত্তি করে কানাডার বিরুদ্ধে সৌদির এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত বুঝতে হলে দেশটির আক্রমণাত্মক এবং প্রায় বিপজ্জনক ভবিষ্যত নেতা সম্পর্কে বোঝাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

৩২ বছর বয়সী ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমানকে বর্তমানে দেশটির সবচেয়ে শক্তিশালী যুবরাজ বলে মনে করা হয়। তিনি সৌদিতে আধুনিক ধ্যান-ধারণার প্রতিফলন ঘটাচ্ছেন।

বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। তিনি সৌদির উপ-প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতে বাদশাহ সালমান বিন আব্দুল আজিজ আল সৌদের পর প্রিন্স সালমানই দেশটির পরবর্তী বাদশাহ হিসেবে সিংহাসন দখল করবেন।

গত জুনে নারীদের ওপর থেকে গাড়ি চালানোর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় সৌদি। দেশজুড়ে বহু সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়ন করছেন মোহম্মদ বিন সালমান। নারীদের গাড়ি চালানোর অনুমতি বিষয়টিও তার তরফ থেকেই এসেছে। তার এমন সিদ্ধান্তের পর পরই আন্তর্জাতিকভাবে তাকে নিয়ে আগ্রহ তৈরি হয়।

দেশটিতে ৩৫ বছর ধরে সিনেমা নিষিদ্ধ ছিল। কিন্তু বাদশাহ সালমান এই নিষেধাজ্ঞাও তুলে নেন, তিনি বাকিংহাম প্যালেসে রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথের সঙ্গে সাক্ষাত করেন এবং সৌদিকে দ্বিতীয় ইউরোপ হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন বর্ণনা করেন।

তরুণ সমাজের মন জয় করে নিয়েছে মোহাম্মদ বিন সালমানের এসব পদক্ষেপ। বিশেষ করে অনলাইনে তরুণ সৌদি সমর্থকদের কাছে তিনি এমবিএস নামেই বেশি পরিচিত। তবে বিচক্ষক চিন্তাশীল হিসেবে খ্যাতি অর্জন করলেও মোহাম্মদ বিন সালমানের বেশ কিছু পদক্ষেপ স্পষ্টতই এর বিপরীত বলে বার বার প্রমাণিত হয়েছে।

নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় বেশ কয়েকজন নারী অধিকার কর্মীকে আটক করে সৌদি। অথচ ওই কর্মীরাই নারীদের অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন ধরে লড়াই করে যাচ্ছেন।

ইয়েমেন যুদ্ধে সৌদির নেতৃত্বে রয়েছেন মোহম্মদ বিন সালমান। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেখানে দুই-তৃতীয়াংশ বেসামরিক নাগরিক নিহতের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী সৌদি জোট।

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে বেশ কিছু বই লিখেছেন স্টিভেন কুক। তিনি বলেন, মানবাধিকার কর্মীদের গ্রেফতারের বিষয়টি বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। কেন সেসব লোকদের আটক করা হলো যারা তারই নীতির পথেই হেঁটেছে? তারা দীর্ঘদিন ধরেই যে পথে লড়াই করে চলেছে সেই পদক্ষেপই বাস্তবায়ন করেছেন প্রিন্স সালমান।

স্টিভেন কুক বলেন, এই পদক্ষেপ একটি স্পষ্ট বার্তা দিতে চেয়েছে। সৌদি আরব আসলে সতর্ক করতে চাচ্ছে যে, ক্রাউন প্রিন্স সংস্কার বললেই সংস্কার। এটা বলা যায় যে, সেখানে ভিন্নমত পোষণের কোন সুযোগ নেই।

গত শুক্রবার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স কানাডার এক টুইটে সৌদি আরবে আটক হওয়া মানবাধিকার কর্মীদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানানো হয়। এতেই ক্ষেপে যায় রিয়াদ। তারা কানাডার এমন পদক্ষেপকে তাদের অভ্যন্তরীন বিষয়ে হস্তক্ষেপ বলে মনে করছে। সে কারণেই দ্রুত সিদ্ধান্তে কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা হয়।

একই সঙ্গে সৌদির সঙ্গে নতুন করে কোন বাণিজ্য বা লেনদেন করা হবে না বলেও উল্লেখ করা হয়। এছাড়া কয়েক হাজার শিক্ষার্থী এবং শিক্ষানবীস চিকিৎসকদের দেশে ফিরে আসার নির্দেশ দেয়া হয়। শুধু তাই নয় টরন্টোতে রাষ্ট্রীয় বিমানের ফ্লাইটও বাতিল করেছে সৌদি।

রিয়াদের এসব পদক্ষেপে এটাই স্পষ্ট হয়েছে যে, মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে সরকার কতটা আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। তিনি মেয়েদের গাড়ি চালানোর অনুমতির মতো এমন সব সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন; যা মিডিয়ায় বড় বড় হেডলাইন হয়েছে। কিন্তু মানবাধিকার কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযানের মাধ্যমে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন যে তিনি ভিন্নতম সহ্য করবেন না।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক পরিচালক সামাহ হাদিদ বলেন, সৌদি আরব মুখে সংস্কারের কথা বললেও এ ঘটনায় তাদের প্রকৃত চেহারা বেরিয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এই নারী অধিকার কর্মী; যাদের অনেকেই গাড়ি চালানোর অধিকার দাবি করেছিলেন। এভাবে গ্রেফতারের ঘটনাকে সৌদি আরব সংস্কার কর্মসূচির কথা বলছে, স্পষ্টতই তার বিপরীত এক ঘটনা। এ সব কর্মসূচি আসলে জনসংযোগের বেশি কিছু নয়।

কানাডার সঙ্গে সৌদির এমন বৈরিতা শুরুকে অনেকেই মনে করছেন যে, মোহাম্মদ বিন সালমান এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশকে বার্তা দিতে চান যে, সৌদির অভ্যন্তরীণ বিষয়ে প্রশ্ন করার বিষয়ে তাদের ভাবা উচিত।

যদি এমনটাই হয় তবে এটাকে অদ্ভূত কৌশল বলে ব্যাখ্যা করেছেন স্টিভেন কুক। বন্ধুত্বপূর্ণ কানাডার মতো কোন দেশকে এভাবে ভয় দেখানো বা হুমকি দেয়াটা একটা উদ্ভট উপায় ছাড়া কিছুই না।

তবে এ ধরনের পদক্ষেপের পেছনে সৌদির আতঙ্ককে উল্লেখ করেছেন স্টিভেন কুক। পররাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে তার প্রকাশিত এক প্রবন্ধে তিনি বলেন, সৌদির নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিরা বুঝতে পারছেন যে, দয়ালু নেতাদের অধীনে জীবন কত সুন্দর, এ বিষয়ে তারা তাদের নাগরিকদের যেসব গল্প বলছেন তার সঙ্গে সত্যিকার অর্থেই নাগরিকরা যেসব অভিজ্ঞতা অর্জন করছেন তার মধ্যে যথেষ্ট ফারাক রয়েছে।

সৌদি আরব মানবাধিকার কর্মীদের প্রতি ভীত এবং কানাডা এসব কর্মীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। সৌদির রাজকীয় আদালতের দুর্বলা রয়েছে। সে কারণেই তারা আতঙ্কিত এবং কেউ ভিন্ন মত পোষণ করলেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।

কানাডার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লইড এক্সওর্থি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও আন্তর্জাতিক নিয়ম-ভিত্তিক আদেশ মেনে চলতে কানাডাকে নেতৃত্ব দিতে দেখা গেছে। মানবাধিকার অপব্যবহারের কোন ঘটনা ঘটলেই তারা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়। এটা কানাডার জন্য নতুন কিছু নয়।

লইড এক্সওর্থি আরও বলেন, আমি মনে করি ক্রাউন প্রিন্স নতুন সংস্কারক, নতুন সময়ে, নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব দিতে এসেছেন। কিন্তু তিনি এবং তার বাবা বেশ কিছু অপব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কেউ ভিন্নমত পোষণ করলেই তাকে কারাবাস দেয়াটাও এর মধ্যে অন্তুর্ভূক্ত। অনেক পর্যবেক্ষক বলছেন সৌদি আরব হয়তো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুসরণ করছে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT