১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

সাধু যোসেফের স্কুল

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২৭, ২০১৮, ১২:১৪ অপরাহ্ণ


এটি একেবারেই ভিন্ন রকম এক বিদ্যায়তন। প্রাচীর ঘেরা চত্বরে পা রাখলে ভেতরে আম, পেয়ারা, কলাসহ নানা ফলের গাছ। মাঝে খানিকটা মাঠ। মাঠ পেরোলেই স্বচ্ছ পানির পুকুর। এক পাশে পাঁচতলা স্কুল ও হোস্টেল ভবন। মাঝে অফিস। আরেক পাশে হাতে-কলমে কারিগরি শিক্ষার ক্লাসরুম। এটি সাধু যোসেফের কারিগরি বিদ্যালয়।
মাসে মাত্র ৫০০ টাকায় থাকা, খাওয়া আর পড়াশোনার খরচ। তিন বছরে শিক্ষার্থীরা শেখেন কারিগরি পেশা বেছে নেওয়ার জন্য জরুরি দক্ষতা। প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ জন শিক্ষার্থী এখান থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে বেরিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি নিচ্ছেন। কেউ আসবাব নির্মাণ কারখানায়, কেউ ফ্রিজ-টিভি সারাইয়ের ওয়ার্কশপে। অনেকেই পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে।

যেভাবে শুরু
বিগত শতকের পঞ্চাশের দশকে যাঁর হাত দিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে, তাঁর নাম ব্রাদার অ্যান্ড্রু স্টেফাস। তাঁর জন্ম যুক্তরাষ্ট্রে, ১৯০২ সালে। লেখাপড়া শেষ করে ব্রাদার হওয়ার পর ১৯২৬ সালে চলে আসেন বাংলাদেশে। এখানে এসে ঢাকার নবাবগঞ্জের বান্দুরায় হলিক্রস স্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
কারিগরি শিক্ষার প্রতি ছোটবেলা থেকে বিশেষ আগ্রহ ছিল অ্যান্ড্রু স্টেফাসের। তিনি যেখানেই থাকতেন, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি দিয়ে একটি কারখানা গড়ে তুলতেন। স্টেফাসের বাবাও ছিলেন একজন কাঠমিস্ত্রি।
১৯৫০-এর দশকের শুরুতে অ্যান্ড্রু স্টেফাস পুরান ঢাকার নারিন্দায় একটি স্কুলে বদলি হয়ে আসেন। তিনি দেখেন, ঢাকার অনেক যুবক কেবল দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া চালিয়ে যেতে পারছে না। অনেকে মেধার কারণেও ঝরে পড়ছে স্কুল থেকে। এই যুবকদের ভবিষ্যৎ কী হবে? তারা কি পরিবার ও সমাজের জন্য বোঝা হয়ে থাকবে? এই চিন্তা থেকেই অ্যান্ড্রু স্টেফাস নারিন্দায় এ কারিগরি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ১৯৫৪ সালের ১৯ মার্চ।
৬৩ বছর ধরে এই বিদ্যালয় পাঁচটি বিষয়ে (মেশিন, ফিটিং, কার্পেন্ট্রি, ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক) দক্ষ জনসম্পদ তৈরি করে চলেছে।
এই বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষদের মধ্যে ব্রাদার ডোনাল্ড বেকারের নাম বারবার আসে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য কারিগরি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তিনি, যেগুলো বর্তমানে একটি বেসরকারি সংস্থা দেখাশোনা করে। এ দেশে মোবাইল ট্রেড বা ভ্রাম্যমাণ কারিগরি বিদ্যালয়ের জনক বলা হয় তাঁকে।

একদিন বিদ্যালয়ে
২ জানুয়ারি দুপুরে নারিন্দার শাহ সাহেব লেনে এই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বেশ শান্ত একটা পরিবেশ। ওয়ার্কশপের কক্ষে ঠুসঠাস, টুংটাং শব্দ।
এর মধ্যে এক নারী এসে তাঁর ছেলেকে এখানে ভর্তি করানোর উপায় জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হলো, এ বছরের ভর্তি পরীক্ষা শেষ। ক্লাস শুরু হয়ে যাবে শিগগিরই। আগামী বছর আসুন।
অফিস কক্ষে বসে অধ্যক্ষ ব্রাদার লিনুস ডি রোজারিও বললেন, নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সত্যিকারের কারিগরি শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা তাঁরা করে যাচ্ছেন। এখান থেকে বেরিয়ে ছেলেরা ভালো ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছে। কেউ নিজেই প্রতিষ্ঠান দিচ্ছে।
এসএসসি বা অষ্টম শ্রেণি পাস করে নামমাত্র ফি দিয়ে এখানে ভর্তি হওয়া যায়। সব কোর্সই তিন বছর মেয়াদি। ব্যবহারিকের ওপর জোর দেওয়া হয়। বছরে ভর্তি করা হয় ৫০ থেকে ৬০ জন। এ পর্যন্ত পাস করে বেরিয়েছেন সাড়ে ৪ হাজারের মতো শিক্ষার্থী। বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবি; কাতার ও কুয়েতে কাজ করছেন এখানকার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী। ইউরোপের ফ্রান্সে আছেন অনেকেই।
এই স্কুল সরকারের কোনো সহায়তা নিয়ে চলে না। চলে ব্রাদারস অব হলিক্রসের পৃষ্ঠপোষকতায়। আর এই ব্রাদারস অব হলিক্রস ক্যাথলিক মিশনের একটি অংশ। তবে সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রতিষ্ঠানটি উন্মুক্ত। তবে হোস্টেলে শুধু খ্রিষ্টান ছাত্ররা থাকতে পারে।
এখানে থাকা, খাওয়া ও প্রশিক্ষণ খরচ মাসে ৫০০ টাকা। আর যাঁরা আবাসিক ছাত্র নন, তাঁদের দিতে হয় তিন শ। খাদ্য খাবারে কোনো বাড়াবাড়ি নেই। সকালে রুটির সঙ্গে চা, দুপুরে নিরামিষ, এক দিন পরপর মাছ, রাতে ভাতের সঙ্গে ডাল, তরকারি।
কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয় ক্যাম্পাসের ভেতরে। ধূমপান একেবারেই নিষেধ। আর ছাত্রদের মুঠোফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হয় না।
এখানে কিছু কিছু বাইরের কাজের অর্ডারও নেওয়া হয়। কর্তৃপক্ষের কথায়, এতে প্রশিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। সামান্য কিছু রোজগারও হয়।

সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের কথা
ডিসেম্বরে ইলেকট্রিক্যালে তিন বছরের কোর্স শেষ করেন বরিশালের গৌরনদীর তপন হালদার। এই জানুয়ারিতে তিনি এই বিদ্যালয়েই পেয়েছেন প্রশিক্ষকের চাকরি। ১৫ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের ওয়ার্কশপের ভেতরে দাঁড়িয়ে তিনি বলছিলেন, ‘এখানে কারিগরি শিক্ষা যেমন মেলে, নৈতিক শিক্ষাটাও পাওয়া যায়।’
বরিশালের বাকেরগঞ্জের মো. ইব্রাহিম সিকদার। এসএসসি পাস ইব্রাহিমের কথায়, ‘গরিব ঘরের সন্তান। কম টাকা খরচ করে পড়াশোনা করতে পেরেছি, এটাই বড় কথা। ৫০০ টাকায় ঢাকা শহরে কে পড়াবে, থাকতে দেবে?’ ইব্রাহিমও ইলেকট্রিক্যালে কোর্স শেষ করে সদ্য প্রশিক্ষক হয়েছেন।
কথা হলো মেশিনের ছাত্র বাগেরহাটের মোংলার রনক সরকার, কার্পেন্ট্রির ছাত্র রাজশাহীর গোদাগাড়ীর পৌল সরেন, মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার কেলভিন বিকাশ ইন্দোয়ারের সঙ্গে। তাঁদের কথায় ছিল উৎসাহ, আর বিদ্যালয়কে নিয়ে গর্ব।
এখানকার বেশ কয়েকজন সাবেক ছাত্রের সঙ্গে কথা হলো। যাঁদের অনেকে বিভিন্ন নামী প্রতিষ্ঠানে বহু বছর ধরে কাজ করছেন। অনেকেই ব্রাদার ডোনাল্ড বেকারের অবদানের কথা স্মরণ করলেন।
এখান থেকে পাস করে বেরিয়ে অনেকেই কাজ করছেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান অটবি লিমিটেডে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক অনিমেষ কুন্ডু প্রথম আলোকে বলেন, আজকাল কারিগরি শিক্ষার নামে অনেক প্রতিষ্ঠানই কোনোমতে কোর্স শেষ করে। এতে শিক্ষার্থীরা পরিপূর্ণভাবে শিখতে পারে না। কেবল সার্টিফিকেটটি পায়। সেদিক থেকে সাধু যোসেফের কারিগরি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট ব্যতিক্রম। তারা কাজ শিখে আসে বলা যায়।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT