২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৮ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

সরকার ও বিরোধী দলের মিলমিশের সংসদ

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২৯, ২০১৮, ৩:২৮ অপরাহ্ণ


দশম সংসদের শুরুতে ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সংসদে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ভূমিকা কী, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন একজন স্বতন্ত্র সাংসদ রুস্তম আলী ফরাজী। এ নিয়ে বিতর্ক শুরু হলে বিরোধী দলের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিল সরকারি দল। এখনো সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের এই মিলমিশ অটুট আছে।

সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে খুব একটা বিতর্ক নেই। সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে সমালোচনার বদলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বিরোধী দল। কখনো প্রশংসায় ভাসাচ্ছে সরকারকে, আবার কখনো সরকারের ভাবমূর্তি নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকারি দলও সময়-সময় বিরোধী দলের প্রশংসা করে যাচ্ছে। সরকারি দল সংসদে নিজেদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার পাশাপাশি বাইরে থাকা বিএনপির সমালোচনায় ব্যস্ত থাকছে।

ফলে অন্যান্য সংসদের তুলনায় চলতি দশম সংসদে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ বেশি হলেও সংসদ আসলে কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই অবস্থায় আজ ২৯ জানুয়ারি চার বছর পূর্ণ করছে দশম জাতীয় সংসদ।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারিতে একতরফা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত হয়েছিল দশম জাতীয় সংসদ। বিএনপিসহ অনেক দল ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল। ১৫৩ জন সাংসদ নির্বাচিত হন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ভোট বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিলেন এইচ এম এরশাদ। পরে তাঁর দল জাতীয় পার্টি (জাপা) সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে। একই সঙ্গে তারা সরকারেরও শরিক। এরশাদ নিজে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন। দলের আরও তিনজন নেতা মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন।

তবে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী বলেন, ‘গুণগত বিশ্লেষণে যাচ্ছি না। তবে দশম সংসদে সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ সংসদকে কার্যকর করেছে।’ তিনি বলেন, প্রশ্ন, ৭১ বিধিতে আলোচনা, প্রস্তাব সাধারণ, বেসরকারি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব, আইন প্রণয়নের কাজে তারা সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে, গঠনমূলক সমালোচনা করছে। এটা ইতিবাচক।

গত বছর সংসদের অধিবেশন বসেছে পাঁচটি। মোট কার্যদিবস ছিল ৭৬টি। গত বছরের ৫টি অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের দেওয়া সমাপনী ভাষণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, কোনো নীতিনির্ধারণী বিষয়ে তাঁর শক্ত সমালোচনা, বিতর্ক বা অবস্থান ছিল না। ঢাকাকে বাসযোগ্য করা, পরিবেশ, খাবারে ভেজাল, বেকারত্ব—এই কয়েকটি বিষয়কেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। সব বক্তব্যেই তিনি কমবেশি সরকার ও সরকারপ্রধানের প্রশংসা করেছেন। পাঁচটি ভাষণের তিনটিতেই তিনি নতুন সাংসদদের জন্য প্লট দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বাজেট অধিবেশনে সরকারি দলের অনেকে কিছু বিষয়ে কড়া সমালোচনা করেছিলেন, সেখানে বাজেটের প্রশংসা ছিল বিরোধীদলীয় নেতার মুখে। বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে রওশন এরশাদ বলেছিলেন, ‘অর্থমন্ত্রীকে এত ভালো একটি বাজেট দেওয়ার জন্য আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি।’

খাবারে ভেজাল প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীকে উদ্যোগী হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রওশন বলেছিলেন, ‘২০২১ ও ২০৪১ সালে কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন, এটা আপনাকে দেখতে হবে। এই কাজটি কিন্তু আপনি ছাড়া কেউ করতে পারবে না।’

বাজেট অধিবেশনে জাতীয় পার্টি থেকে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ খোরশেদ আরা হক ছিলেন আরেক ধাপ এগিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসার একপর্যায়ে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা কোনো ইলেকশন চাই না। প্রধানমন্ত্রী আছেন, থাকবেন। আরও পাঁচ-দশ বছর দেশ চালাবেন।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, আধুনিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংসদ নজরদারি করবে। সংসদ ও সংসদীয় কমিটি নির্বাহী বিভাগের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে। এখানে বিরোধী দলের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। কিন্তু সে কাঠামো ভেঙে গেছে। সরকার ও বিরোধী দল মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ফলে সংসদ তার ভূমিকা পালন করতে পারছে না।

জনগণ ক্ষুব্ধ হতে পারে, সরকারের এমন যেকোনো সিদ্ধান্ত বিরোধী দলের জন্য একটি মওকা। এ ধরনের সিদ্ধান্তে বিরোধী দল সরকারকে ঘায়েল করার চেষ্টা করে থাকে। কিন্তু বর্তমান সংসদের বিরোধী দল এ ধরনের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি নিয়েই চিন্তিত ছিল। আবগারি শুল্ক ও অর্থমন্ত্রীর বক্তব্য, নির্বাচনের এক বছর আগে গৃহকর বাড়ানোর সিদ্ধান্তে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, সেটা দেখার পরামর্শ দিয়েছিলেন জাপার অন্তত তিনজন সাংসদ।

অন্যদিকে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে বিরোধী দলের ইতিবাচক ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। গত বুধবারও প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতান্ত্রিক মনোভাব নিয়ে বিরোধী দল গঠনমূলক আলোচনা করছে এবং সবক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, এই সংসদ একেবারেই অকার্যকর। সংসদে কোনো বিরোধী দল নেই। যেটা আছে সেটা সাজানো। এটা মূলত একদলীয় সংসদ। যে কারণে কোনো মৌলিক সমস্যা নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়নি, মুলতবি প্রস্তাব গৃহীত হয়নি। বিরোধী দল একই সঙ্গে সরকারেও আছে, এটা হাস্যকর।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, দশম সংসদে এখন পর্যন্ত ১৩০টি বিল পাস হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর জাতীয় সংসদের পাঁচটি অধিবেশনে ২৪টি বিল পাস হয়। এসব বিল পাস নিয়ে সরকারকে বড় ধরনের বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়নি। তবে জাপার সাংসদ ফখরুল ইমাম নিয়মিতভাবে বিভিন্ন বিলের ওপর নোটিশ দিয়েছেন। এ ছাড়া রওশন আরা মান্নান, নুরুল ইসলাম, নুরুল ইসলাম, ফজলুর রহমান ও সেলিম উদ্দিন—এই কজনই ঘুরেফিরে বিলের ওপর নোটিশ দিয়েছেন। বাকিরা ছিলেন একপ্রকার নিষ্ক্রিয়। সরকারি দলের সদস্যরাও সচরাচর কোনো নোটিশ দেন না।

বিরোধী দলের সাংসদ ফখরুল ইমামও বিভিন্ন সময়ে সম্পূরক প্রশ্ন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, তাঁর ধারণা, দশম সংসদের মতো সংসদীয় চর্চা এর আগে কখনো হয়নি। অনেক সময় সরকারি দলের সঙ্গে বিরোধী দলের বক্তব্য মিলে যায়। কারণ দেশে কিছু উন্নয়ন অবশ্যই হয়েছে।

১৪৭ বিধিতে প্রস্তাব (সাধারণ) নিয়ে যেসব আলোচনা হয়েছে, সেখানেও খুব একটা বিতর্ক ছিল না। বিষয়গুলো এমন ছিল যে এগুলো নিয়ে অনেক ক্ষেত্রে বিতর্কেরও সুযোগ নেই। গত বছর বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণের স্বীকৃতি, রোহিঙ্গা সমস্যা, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী মামলার আপিলের রায় ও পর্যবেক্ষণ, গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতকারীদের শাস্তির জন্য আইন করা নিয়ে প্রস্তাব গৃহীত হয় সংসদে। এর মধ্যে ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে সংসদ উত্তপ্ত ছিল। সরকার, বিরোধী দল উভয়েই ছিল একই সুরে আদালতের সমালোচনামুখর। এ ছাড়া বেশির ভাগ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের একধরনের সমঝোতা দেখা গেছে।

এ বিষয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেন, দেশের উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের জন্য এই সমঝোতা। বিরোধী দলের কাজ শুধু বিরোধিতা করা নয়। সরকারের ভালো কাজে সহায়তা আর জাতীয় স্বার্থপরিপন্থী সিদ্ধান্তে সঠিক তথ্য তুলে ধরে সমালোচনা করা বিরোধী দলের কাজ। সেটি হচ্ছে।

ব্যতিক্রম বাজেট অধিবেশন

চলতি সংসদে ব্যতিক্রমধর্মী অধিবেশন ছিল গত বছরের বাজেট অধিবেশন। বাড়তি আবগারি শুল্ক, বাড়তি ভ্যাট এবং সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানো—এই তিন বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, শেখ ফজলুল করিম সেলিমসহ সরকারি দলের অনেক সদস্য কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

জাতীয় পার্টির সদস্যরাও বাজেটের সমালোচক ছিলেন। ব্যাংক খাতে লুটপাটের কারণে বিরোধী দলের সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ ও জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। বিরোধী দলের আরও কয়েকজন সদস্য বাজেটের সমালোচনা করলেও অর্থমন্ত্রীর পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদ। তিনি বলেছিলেন, ‘অনেকে বলেছেন, অর্থমন্ত্রীর বিচার হওয়া উচিত। আমি অর্থমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কারণ উনি বাজেট দিয়েছেন বলেই এই আলোচনা হয়েছে।’

সংসদ বিষয়ক গবেষক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিজামউদ্দিন আহমেদ বলেন, জাতীয় সংসদে বর্তমানে যে বিরোধী দল আছে সেটাকে বাস্তবে বিরোধী দল বলা যায় না। কারণ তারা তো সরকারেই আছে। সরকারে তাদের তিনজন মন্ত্রী। সংসদে প্রকৃত বিরোধী দল ছিল ১৯৯১ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত। সেই সময়ের মতো চর্চা চললে এখনকার মতো দুর্গতি হতো না।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT