২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

সম্পর্কে যখন হাঁসফাঁস

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১০, ২০১৮, ১:২৭ অপরাহ্ণ


সম্পর্কের মধ্যে এমন ধারা অনুভূতি তৈরি হতে পারে। কেবল যে মেয়েটির মধ্যে এই বোধ তৈরি হতে পারে তা নয়, কখনো ছেলেটির মধ্যেও এই দমবন্ধ ভাব দেখা দিতে পারে। আবার কখনো দুজনের মধ্যে একসঙ্গে এই দমবন্ধ ভাব তৈরি হয়। আবার কেবল নারী-পুরুষের প্রেমের সম্পর্কের মধ্যেই নয়, স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা আর সন্তানে অথবা দুই বন্ধুর সম্পর্কের মধ্যেও কখনো কখনো এই দমবন্ধ অনুভূতি হতে পারে।

মনোবিদ ক্রিস্টোফার নিপার্স তাঁর কালটিভেটিংকনফিডেন্স বইতে বিষয়টি ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে, ‘দুজন মানুষ যখন মনে করে তাদের সব চাওয়া-পাওয়া কেবল একে অপরের মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব, তখন তাদের সম্পর্কের মধ্যে তৈরি হয় হতাশা, যা সম্পর্কটিকে ব্যর্থ করে ফেলতে পারে।’ অর্থাৎ বিষয়টি হচ্ছে, দুজনের মধ্যে কোনো ইমোশনাল স্পেসের ঘাটতি থাকে, আশপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা পরস্পরের প্রতি বিভোর হয়ে থাকে, যা তাদের সম্পর্কটিকে ক্লিশে করে তোলে। দেখা যায়, দুজনের সম্পর্কের মূল্য দিতে গিয়ে তারা অন্য বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেও সম্পর্ক রাখছে না, সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছে না।

নিজের সময় বা ‘মি-টাইম’ বলে কোনো কিছু তাদের নেই। তখন কোনো জটিলতা না থাকা সত্ত্বেও তাদের মধুর সম্পর্কটি দমবন্ধ করা সম্পর্কে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

সম্পর্কে এত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় যে ‘আমি’ বিলীন হয়ে যায় আমরায়। তখন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের অভাবে একজন মানুষ নিজের সঙ্গেই নিজের লড়াই শুরু করে দেয়, যার প্রভাব পড়ে তার চিন্তায় আর আচরণে। ফলে ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হতে থাকে। তখন তার খারাপ লাগা শুরু হয় আর এই খারাপ লাগার জন্য দায়ী করতে থাকে সম্পর্কটিকে। মনে করে যে এই সম্পর্কের জালে বন্দী হয়ে পড়েছে।

আবার সম্পর্কটিকে মজবুত করতে গিয়ে একজন হুবহু আরেকজনের মতো হওয়ার চেষ্টা করে। এই বিষয়কে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মনোবিদ রাইডেল বলেছেন, ‘একজন সঙ্গী বা সঙ্গিনী তার সঙ্গী বা সঙ্গিনীর ক্লোন নয়, তাই একজন আরেকজনের মতো হতে গিয়ে নিজের মনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে।’

কখনো দেখা যায়, দুজনের একজন আরেকজনের ওপর খুব বেশি আধিপত্য প্রকাশের চেষ্টা করছে। প্রবলভাবে আরেকজনের চিন্তা, আচরণ আর ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর প্রভাব বিস্তার করছে। তখনো কিন্তু এই দমবন্ধ ভাব দেখা দিতে পারে।

সম্পর্কের মধ্যে এই হাঁসফাঁস ভাব দেখা দিলে নানা ধরনের লক্ষণ দেখা যায়—কোনো কোনো লক্ষণ আবার বিপরীতমুখী হতে পারে। যেমন কখনো দেখা যায় একজনের দমবন্ধ হয়ে আসছে এই মনে করে যে তার সঙ্গীকে হারিয়ে ফেলছে, আবার কখনো কারও মনে হতে পারে যে সঙ্গী তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছে, ফলে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন অসম্ভব হয়ে পড়েছে। একজন আরেকজনকে মোটেই স্বাধীনতা দিচ্ছে না, এমনটা বন্ধুরা বা পরিবারের সদস্যরা অনুভব করতে পারছে।

নিজের থেকে কোনো কিছু ভাবার বা করার স্বাধীনতা যদি কমে যায়, তখনো এই হাঁসফাঁস ভাব দেখা দিতে পারে। এই দমবন্ধ ভাব থেকে রেহাই পেতে অনেক সময় মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়, তাতে করে কখনো সম্পর্কের মধ্যে চিড় ধরতে পারে। একটি সম্পর্ককে তখনই আদর্শ বলা যাবে, যখন পারস্পরিক বোঝাপড়া থাকবে, অপরের প্রতি ভালোবাসা আর সম্মান থাকবে কিন্তু কোনো দমবন্ধ ভাব থাকবে না। ভালোবাসার সম্পর্কটি যেন হাঁসফাঁসে পরিণত না হয়। মুক্ত, স্বাধীনভাবে ভালোবাসুন, সম্পর্কগুলো হোক খোলা প্রান্তরের মতো উদার আর বহমান নদীর মতো স্বচ্ছ।

ভালোবাসার সম্পর্কে দমবন্ধ ভাবনা আনতে কী করবেন?

নিজেকে সময় দিন। দিনের ২৪ ঘণ্টা সঙ্গীকে নিয়ে বিভোর থাকবেন না। অনেক সময় দেখা যায়, অনেকটা সময় তাঁরা আলাদা থাকছেন কিন্তু দেখা হওয়ামাত্রই আলাদা হওয়ার সময়টুকুর প্রতি সেকেন্ডে কী হয়েছে না হয়েছে তার ধারাবিবরণী দিচ্ছেন। এটা দমবন্ধ ভাব দূর করার অন্তরায়।

সঙ্গী যাতে নিজের কিছু সময় পান, সে সুযোগ দিন। প্রতিনিয়ত তাঁর অবস্থান আর কী করছেন, কী ভাবছেন, তা জানার চেষ্টা করবেন না।

নিজের সব চাওয়া-পাওয়া মেটাতে গিয়ে সঙ্গীর নিজস্বতাকে কেড়ে নেবেন না। তাঁর মতামতের মূল্য দিন, তিনি কী চাচ্ছেন, সেটা বোঝার চেষ্টা করুন।

নিজের শখ বা অবসর কাটানোর মাধ্যমগুলোর চর্চা অব্যাহত রাখুন। সম্পর্কের দোহাই দিয়ে নিজের কোনো ইতিবাচক শখ বা অভ্যাসকে পরিত্যাগ করবেন না।

সঙ্গী ছাড়াও অন্য বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান। পারিবারিক আর সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত অংশগ্রহণ করুন। এমনটা নয় যে সব সময় দুজনের একসঙ্গে সব অনুষ্ঠানে যেতে হবে।

নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করুন। নিজের দর্শন আর নৈতিকতাকে সম্পর্কের দোহাই দিয়ে কখনো দমন করবেন না।

কথোপকথনে সব সময় ‘আমরা’ পরিহার করে বেশির ভাগ সময় ‘আমি’ ব্যবহার করতে শিখুন।

নিজে নিজে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন, ছোট ছোট সমস্যার সমাধান নিজে নিজে করুন। সব সময় সঙ্গীর কাছ থেকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করবেন না বা সব সমস্যার সমাধান তাঁর কাছে চাইবেন না।

সম্পর্কের ভিত্তিকে মজবুত মনে করুন। এমনটা ভাবার কারণ নেই, আপনার স্বকীয়তা এই সম্পর্ককে দুর্বল করে ফেলতে পারে। প্রকৃত সম্পর্ক সব সময় স্বকীয়তাকে প্রাধান্য দেয়। আর যে সম্পর্ক আপনার স্বকীয়তাকে গ্রাস করতে চায়, সেটি কোনোভাবেই আদর্শ সম্পর্ক হতে পারে না।

আপনি যাঁকে ভালোবাসছেন, তিনি যেন কোনো অবস্থাতেই নিজেকে আপনার অধীন মনে না করেন। তিনি যেন সর্বদা নিজেকে মুক্ত, স্বাধীন মনে করেন, সেভাবে আপনি নিজের আচরণকে সংযত করুন।

কখনো যদি মনে হয়, সম্পর্কটি আপনাকে দমবন্ধ করে ফেলছে, তখন বিষয়টি আড়াল না করে সঙ্গীর সঙ্গে শেয়ার করুন। নিজেরা আলোচনা করে নির্ণয় করুন, সম্পর্কের কোন জায়গাটি এই হাঁসফাঁসভাব তৈরি করছে। নিজেরা যদি আলোচনা করে সমস্যার কেন্দ্রকে বের করে ফেলতে পারেন, তবে দ্রুতই এই দমবন্ধ ভাব থেকে বের হয়ে আসতে পারবেন। প্রয়োজনে পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে পারেন।