২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১০ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

শৈশবে যুদ্ধ বিমান দর্শন

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৪, ২০১৮, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ণ


১৯৬৫ সাল, ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের দামামা চরমে, আমি তখন ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। পূর্ব পাকিস্তানে আইন জারি হলো, দেশের সব স্কুল-কলেজে বাধ্যতামূলক রাইফেল প্রশিক্ষণ নিতে হবে। আমাদের স্কুলও এই আইনের আওতায় পড়ল। প্রতি ক্লাস থেকে ছাত্র নিয়োগের নোটিশ টানানো হলো। বেশ কয়েকজন ছাত্রের সঙ্গে আমিও প্রশিক্ষণে যোগ দিতে স্বাক্ষর করলাম। কিছুদিন শারীরিক কসরত শেখানোর পর রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণের সুযোগ এল।

একজন পশ্চিমা আর্মি সুবেদার আমাদের প্রশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেলেন। দশটা-পাঁচটা স্কুল শেষে প্রশিক্ষণে যোগ দিতে হতো। স্থানীয় খেলার মাঠের এক পাশে প্রশিক্ষণের জায়গা নির্ধারিত হলো। প্রথমে শুরু হলো ডান-বাম করে মাঠ প্রদক্ষিণ, তারপর শারীরিক কসরত। এভাবে চলে গেল কয়েক দিন। তারপর আসে রাইফেল নিয়ে প্রশিক্ষণের পালা। থ্রি নট থ্রি রাইফেল হাতে শুরু হলো এটিকে চিনে নেওয়া; অর্থাৎ অস্ত্রটির কটি অংশ, কোন অংশের কী নাম, কী কার্যকারিতা ইত্যাদি। একটি থ্রি নট থ্রি রাইফেলকে ছয় ভাগে ভাগ করা হয়, যেমন নিল, ফিল, শর্ট, ম্যাগজিন, রাইফেল নম্বর ওয়ান, মার্ক নম্বর ফোর।

প্রশিক্ষণের একপর্যায়ে শেখানো হলো শত্রুকে ধরে এনে নিজেকে নিরাপদ রেখে তার সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হবে। সবকিছুই নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্রমান্বয়ে পালন করা হতো, নিয়ম থেকে একটু ব্যতিক্রম হয়েছে তো তার জন্য গুনতে হতো দম আদানপ্রদানের কঠিনতম প্রতিযোগিতা অর্থাৎ রাইফেল হাতে নিয়ে শাস্তি! প্রথমে রাইফেলটি বহন করা আমার পক্ষে বেশ কষ্টসাধ্য ছিল। তারপর যখন কোন আদেশ রক্ষা করতে ভুল হতো তখন শান্তি স্বরূপ ডাবল মার্চ করতে হতো। আর রাইফেলটি দুহাতে থাকত মাথার ওপরে। এভাবে মাঠের কিছু অংশ প্রদক্ষিণ শেষে শাস্তি কার্যকর হতো। প্রতিদিন প্রশিক্ষণ শেষে রাইফেল জমা দিতে হতো অস্ত্রাগারে। পুরোনো কোর্ট ভবনের এক পাশেই সরকারি অস্ত্রাগার। সারি সারি রাইফেলের তাক দেখে একেবারে গা ছমছম করা ভাব। মহকুমা শহরে এক সঙ্গে এত অস্ত্র জীবনে এই প্রথম দেখা।

অস্ত্র দেখতে দেখতে প্রশিক্ষণের হাতেখড়ি। একপর্যায়ে নির্দিষ্ট সময়ে প্রশিক্ষণ শেষ হলো, এখন কৃতিত্ব যাচাইয়ের পালা। একদিন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সবাইকে জড়ো করে আদেশ করা হলো, চানমারিতে (বিশেষ চিহ্নিত গোলাকার লক্ষ্য বস্তু) গুলি ছুড়ে প্রতিযোগীকে উত্তীর্ণ হতে হবে। এক এক করে সবাইকে ডাকা হচ্ছে। হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে টুটু বোর রাইফেল। এক সময় আমাকে ডাকা হলো লক্ষ্যবস্তুতে গুলি ছুড়তে, পাঁচ গুলির ম্যাগজিনের টুটু বোর হাতে নিয়ে খুবই বিব্রত হলাম। কারণ ইতিপূর্বে গুলির শব্দ শুনে শুনে হাত-পায়ে মৃদু কাঁপন শুরু হয়েছিল। তারপরও দারুণ উত্তেজনার মধ্যে ম্যাগাজিনের গুলি মুহূর্তেই শেষ করে ফেললাম। পরিবর্তে ফলাফল যা হওয়ার তা-ই হলো।

‘এখন যৌবন যার, যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়’—কবির এই লাইন দুটোর অর্থ যখন বুঝলাম তখন মনে সান্ত্বনা এল এই ভেবে যে, সে সময় আমাদের যুদ্ধে যাওয়ার যৌবন ছিল না। যদিও আমরা তখন কামান দাগার অপেক্ষায় ছিলাম। কিন্তু যুদ্ধের মোড় নিল পশ্চিম পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে। পূর্ব পাকিস্তানে যুদ্ধ তেমন জোরালো ভাব ধারণ করেনি। হঠাৎ একদিন শুনলাম আমাদের দক্ষিণ সুনামগঞ্জের কোন এক গ্রামের পাশে একটি যুদ্ধ বিমান ভূপাতিত হয়েছে। কিন্তু ছত্রীবাহী পাইলট নাকি অক্ষত অবস্থায় অবতরণে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু ভারতীয় না পাকিস্তানের বিমান, কেউ তার হদিস দিতে পারেনি। অগত্যা হৃদয়ে দারুণ প্রত্যাশা ধারণ করে ভাবতে হলো এই যুদ্ধ বিমান কীভাবে দেখা যায়। বেশ কদিন গত হলো, হঠাৎ একদিন আমার এক মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে দেখা। কথায় কথায় সে জানাল, তাদের বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দূরেই বিমান পতিত হয়েছে, তবে এখনো বর্ষার পানির নিচে তলিয়ে আছে। মাসখানেক পরেই পানি কমতে শুরু করবে তখন হয়তো যুদ্ধ বিমানটি দেখা যাবে। ঠিকই মাস খানিক পরেই মামার বাড়িতে হাজির হলাম। মামাতো ভাই, খালাতো ভাই সবাই আমাকে পেয়ে ভীষণ খুশি। আমি তাদের সবাইকে আমার আসার উপলক্ষ জানালাম।

সবাই বিমান দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করল। একজন বলল, আমরা এতদিন তোমার অপেক্ষায় থেকে বিমান দেখতে যাইনি। এখন যেতে কোন বাধা নেই। দিনক্ষণ ঠিক হলো আগামী পরশু রওনা দেব এবং সেখানে সারা দিন কাটিয়ে তারপর চলে আসব। এখন প্রশ্ন হলো, যাওয়া যায় কীভাবে? ওইখানে যেতে হলে একমাত্র বাহন নৌকা, সুতরাং নৌকার প্রস্তুতি মাথায় রেখে সব ব্যবস্থা পাকাপোক্ত হলো। আমরা ছয়জন মিলে নিজেরাই দাঁড়বৈঠার সহযোগে পাড়ি জমালাম।

আমি ছাড়া বাকি সবাই নৌকা চালাতে অভ্যস্ত। কারণ তারা ভাটি এলাকার মানুষ বলে কথা, বছরের ৪-৫ মাস নৌকার সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। আনন্দ আর গল্পের মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম গন্তব্যে। আমরা এক একজন যুদ্ধবিমান বিশেষজ্ঞের মতো এদিক-ওদিক জরিপ করতে লেগে গেলাম, যদিও বিমানটি তখনো অর্ধেক পানির নিচে তলিয়ে ছিল। ধারণা করা গেল, বিমানটি ভূপাতিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ২০/২৫ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি করেছে। যতটুকু পানির ওপরে ছিল তার মধ্যে বিমানের একটি ডানার পরিচয় পাওয়া গেল। আমাদের সবার চেয়ে বয়সে বড় আমার এক খালাতো ভাই (প্রয়াত) বিমানের ভাঙা অংশে হাত দিয়ে বের করতে লাগলেন এক এক করে অনেকগুলো বুলেট। তারপর কেউ পতিত বিমানের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ নৌকায় থেকে ভাঙা টুকরা সংগ্রহ করে, ছোট ছোট পার্টগুলো খুলে খুলে একপর্যায়ে ভাঙা ডানার এক অংশ আমরা খুলে ফেলতে সক্ষম হলাম। এরপর আমরা যখন সংবিৎ ফিরে পেলাম, তখন বুঝলাম আমরা সবাই ভীষণ ক্ষুধার্ত। এমনকি পানির পিপাসা মিটানোর কোন সুযোগ নেই। যদিও বর্ষার অথই জল এখনো হাওরে বাওরে সয়লাব।

আশপাশে কোন বাড়িঘর চোখে পড়ছে না, অগত্যা বাড়ি ফেরা ছাড়া কোনো উপায় নেই। ক্ষুধার্ত শরীরে বিমানের ভাঙা ডানা টেনেটুনে নৌকায় তোলা হলো, কারও মুখে কোন কথা ফুটছে না। সবাই যে যার মতো দাঁড় টেনে কিংবা বইঠা বেয়ে এক সময় বাড়ি ফেরা হলো। পরদিন বড়দের ভর্ৎসনা শুনতে হলো, সবাই বলতে লাগলেন ‘দুঃসাহসী’ বোকামি কাজের জন্য। তাঁরা বললেন, ‘আমরা যা করেছি তা যেকোনো সময় একটা দুর্ঘটনা ঘটতে পারত। আমরা সবাই চিন্তাভাবনায় পড়ে গেলাম এত কষ্টের সংগ্রহ অ্যালুমিনিয়ামের দ্রব্যসামগ্রী বোধ হয় কোনো কাজে আসবে না।’

বয়স্ক একজন বললেন, চিন্তার কোনো কারণ নেই। ভাঙা থালাবাসন সংগ্রহকারী আসুক দেখবা বিনিময়ে নতুন অনেক জিনিস পাওয়া যাবে, কিন্তু আমরাতো জিনিসের কথা ভাবছি না, আমরা ভাবছিলাম বিমানের ধ্বংসাবশেষের নমুনাগুলো যদি সংগ্রহ করা যেত তবে খুবই কাজের কাজ হতো। কয়েক দিন পরই আমি চলে এলাম। পরে শুনেছি, এক টিন চানা ভাজির বিনিময়ে ভাঙাচোরা সংগ্রাহকের কাছে তুলে দেওয়া হয়েছে যুদ্ধবিমানের মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও ধ্বংসাবশেষ।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT