২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

শহুরে বৃষ্টি গেঁয়ো বৃষ্টি

প্রকাশিতঃ জুলাই ২৭, ২০১৮, ৮:৫১ অপরাহ্ণ


শহুরে বৃষ্টি বেশি ভালো, নাকি গেঁয়ো বৃষ্টি? কাদা-পানির মাঠে গড়াগড়ি খেয়ে ফুটবল খেলতে বেশি মজা লাগে, নাকি উঁচুতলা দালানের ছাদে বৃষ্টিতে ভেজার আনন্দটা বেশি? এই নিয়ে তোমাদের তর্ক হতেই পারে। কিন্তু ব্যাঙেরা কী বলছে? ওরাও তো বৃষ্টি ভালোবাসে। শহর আর গ্রামের মাঝামাঝি কোনো এক জায়গায়, একবার দেখা হয়েছিল এক শহুরে ব্যাঙ আর গেঁয়ো ব্যাঙের। শহুরে বৃষ্টি আর গ্রামের বৃষ্টি নিয়ে কথা বলছিল ওরা। আড়ি পেতে সেসব কথা শুনে ফেলেছে এম এ হান্নান। ‘ঘ্যাঙর ঘ্যাং’ ভাষাটা সে অনুবাদ করে শুনিয়েছে।

শহুরে ব্যাঙ ভোলা: দোস্ত কোলা, খবর কী তোর? বৃষ্টি বাদল হচ্ছে কেমন? বাড়ির সবাই ভালো তো?

গ্রামের ব্যাঙ কোলা: আর বলিস নারে ভোলা। এই এক বর্ষার জন্যই তো আমরা সারা বছর অপেক্ষায় থাকি। মানুষের উৎসব হয় বছরের দু-চারটা দিন, আমাদের বর্ষাজুড়েই উৎসব! বর্ষা এলেই তো ধুপুর-ধাপুর করে পুকুরের নতুন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ি আর গান গাই, ‘ঘ্যাঙর ঘ্যাঙর ঘ্যাং, আমরা কোলা ব্যাঙ…’।

ভোলা: আহ্‌হা, এখনো তোরা সেই পুরোনো গানেই আছিস? একটুও আধুনিক হতে পারলি না। আমরা তো গিটার বাজিয়ে গাই, ‘ঝ্যাং, ঝ্যাং ঝ্যাং, কাক আর বকের ঠ্যাং, আমরা ভোলা ব্যাঙ, আরে ঝ্যাং ঝ্যাং ঝ্যাং…’।

কোলা: বাপরে। তোদের এসব ঝ্যাং ঝ্যাং শুনলে আমার মাথা ধরে যায়।

ভোলা: বৃষ্টির দিনের কথা অবশ্য আলাদা। এই সময় শহরের রাস্তাগুলোতে পানি উঠে যায়। গাড়ি, বাস, ট্রাকের সঙ্গে আমরাও মহা আনন্দে রাস্তায় দাপাদাপি করি। কান পেতে শুনেছি, গাড়ির ভেতর এফএম রেডিওতে বৃষ্টির সময় সুন্দর সুন্দর গান বাজে। বৃষ্টির গান।

কোলা: আহা, এফএম রেডিওর গান শুনে কি আর মজা আছে? এবার বর্ষা এলই একটু দেরি করে। তার ওপর কী গরম! গ্রামের চাষিরা দল বেঁধে বৃষ্টির গান না গাইলে তো বর্ষা আসার মর্জিই হতো না। চাষিরা গায়, ‘আসমান হইল টুডা টুডা, জমিন হইল ফাডা। মেঘ রাজা ঘুমায়া রইছে মেঘ দিব কন ক্যাডা…’ ঢোল, তবলা, বোল-বাটি যে যা পারে তা নিয়েই বাদ্য বাজায়। পুকুর থেকে কলসি ভরে পানি এনে ঢকঢক করে ঢালে মাঝ উঠোনে সবার গায়ে! তারপর নামে বৃষ্টি।

ভোলা: আমাদের অবশ্য অত ঝক্কি নাই। আমরা জানালা দিয়ে মেঘ দেখি, ছোট বাচ্চারা গ্রিলের ফাঁক দিয়ে হাত বের করে বৃষ্টির পানিতে হাত ভিজায়। দেখতে খুব মজা লাগে।

কোলা: এদিকে গ্রামে কী হয় জানিস? যে দিন বছরের প্রথম বৃষ্টি নামে, শুরুর গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে উদোম গায়ে ভিজি আমরা। মুরব্বিরা বলে, এতে নাকি গায়ে ঘামাচি হয় না! মজার না?

ভোলা: বাহ্‌, বেশ মজা তো!

কোলা: বৃষ্টিরও নানান রকমফের আছে। ঝুম বৃষ্টি নামলে বলি ‘কাডা ঝরি’। এই বৃষ্টি নামল তো এই নাই, একে বলি ‘ছাগল দৌড়ানো মেঘ!’ যাকে তোরা বলিস ‘হঠাৎ বৃষ্টি’। আকাশে সূর্যি মামার হাসি, এর মধ্যেই নামল বৃষ্টি। আমরা তখন গান ধরি, ‘রইদও মেঘও, শিয়ালের বিয়া। শিয়ালনি চাইয়া রইছে, ভাঙা বেড়া দিয়া…’

ভোলা: হা হা হা, মজার গান।

কোলা: আরও কী হয় জানিস? নতুন পানিতে মাছেরা ডিম পেড়ে বাচ্চা ফোটায়, তরতাজা দেশি মাছ ধরার মৌসুমই এখন। নানান জাতের—পুঁটি, ট্যাংরা, শোল, বোয়াল, টাকি, কই, খলসে, পাবদা, শিং, মাগুর, বাইম, রানি মাছ, মেনি মাছসহ চিংড়ি, মলা-ঢেলার মতো কত ছোট ছোট মাছ! মাছ ধরার ফাঁদ হিসেবে গ্রামে বাঁশের অতি চিকন শলা দিয়ে তৈরি হয় চাঁই। জমির আইল কেটে এমন চাঁই পাততে হয়। এতে থাকে বিভিন্ন আকৃতির খোপ—মাছ ফাঁদে ফেলার বিশেষ কৌশল। স্রোতের বিপরীত দিক থেকে উজিয়ে মাছ সেই খোপে ঢুকতে পারবে, কিন্তু বের হওয়ার কোনো উপায় পাবে না। শুধু মাছই নয়, কখনো কখনো সাপও আটকা পড়ে তাতে!

ভোলা: (সাপের কথা শুনে ঢোক গেলে) ইয়ে মানে…সাপ! এহেম, আমি অবশ্য সাপ ভয়টয় পাই না।

কোলা: মাছ ধরতে আরও কী কী ফাঁদ আছে শোনো। ডুবা ফাঁদ, দাড়কি, বেগা, উন্টা, তেপাই, ধিল, চেং, চাঁই, চান্দি বাইর, বানা, পলো, রাবনি, চারো এমন আরও অদ্ভুত অদ্ভুত উপকরণ আছে মাছ ধরার। জালের মধ্যে আছে টানাজাল, ঠেলাজাল, ঝাঁকিজাল, ধর্মজাল, বিটে, আন্টা, খড়াজাল—মাছের ঝাঁক এলে, কালো জাল পুরো সাদা হয়ে যায়! আবার মাঝেমধ্যে কোনো কিছু ছাড়াও মাছ ধরা যায়; বিশেষ করে শোল মাছ আর কই মাছ লাফিয়ে লাফিয়ে ডাঙায় উঠে আসে। একেই বলে, ধরি মাছ না ছুঁই পানি! একসময় বৃষ্টির পানি বাড়তে বাড়তে জলাশয়, পুকুর, ডোবা, ফসলের মাঠ, সব মিলে এক বিশাল সাগরে রূপ নেয়। ফুটবল খেলার মাঠও তখন তলিয়ে যায়। তখন আবার আরেক মজা—ছেলেপুলেরা দল বেঁধে পানিতে ভেলা কিংবা নৌকা ভাসায়! কলাগাছ কেটে বানানো সেই ভেলা ভেসে বেড়ায় অনেক দূর। ভেলায় চড়া শেষে আবার টুপটাপ করে ছেলেগুলো পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বাড়িতে মায়েরা চাল ভাজে, গম ভাজে…মুঠো মুঠো চাল ভাজা, গম ভাজা খেতে খেতে লুডু খেলা হয়।

ভোলা: শহরেও কিন্তু বৃষ্টির আনন্দ আছে। খোলা মাঠ না থাকলে কী হয়েছে, ছেলেপুলে ছাদে উঠে বৃষ্টিতে ভেজে। বাড়িতে বাড়িতে খিচুড়ি রান্না হয়। কিন্তু তোদের গ্রামে যে আনন্দ, তা অবশ্য আমরা পাই না। ঠিক আছে, এই বর্ষায় একবার যাব তোদের বাড়ি। ঘুরে আসব।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT