১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

লেগুনা বন্ধে বিকল্প কী

প্রকাশিতঃ সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৮, ১:২৪ অপরাহ্ণ


রাজধানী ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার শৃঙ্খলা ফেরাতে গত বুধবার থেকে বন্ধ হয়ে গেছে লেগুনা নামে পরিচিত হিউম্যান হলারগুলো। বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটির (বিআরটিএ) অনুমোদন নিয়ে ১৫৯টি রুটে এ সব ছোট আকারের যান চলাচল করত। বিআরটিএ প্রায় চার হাজার ৪৬৪টি লেগুনার নিবন্ধন দিলেও, ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী লেগুনার সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

গত কয়েক বছরে কম খরচ আর স্বল্প দূরত্বে যাওয়ার সুবিধা থাকায় রাজধানীবাসীর একটা বড় অংশই লেগুনার ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন। বিশেষ করে স্বল্প আয়ের মানুষ, নারী ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের একটি প্রধান অবলম্বন হয়ে উঠেছে লেগুনা।

নিরাপদ সড়ক চেয়ে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের পর গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা ঠেকাতে সরকারের তরফ থেকে নানামুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া গত সপ্তাহে ঘোষণা দেন, রাজধানীর প্রধান সড়কে লেগুনা চলতে পারবে না, নগরের বাইরে বা উপকণ্ঠে শুধু চলবে এগুলো।

বিকল্প পরিবহন ব্যবস্থা না করে হঠাৎ করেই রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো লেগুনামুক্ত করায় গত কয়েক দিনে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ যাত্রীরা। যাতায়াতের ক্ষেত্রে তাদের সময় যেমন বেশি লাগছে, খরচও বেড়েছে দুই-চারগুণ। হুট করে যাতায়াতে সময় ও অপ্রত্যাশিত খরচ বাড়ায় ক্ষোভ বিরাজ করছে তাদের মনে। তাদের দাবি, ঢাকার রাস্তায় সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় পর্যাপ্ত গণপরিবহন নামাতে হবে।

রাজধানীতে চলাচলকারী বেশিরভাগ বাস ও মিনিবাস বর্তমানে সিটিং সার্ভিস বা গেটলক সার্ভিস নামে চলাচল করে। এ সব বাসে যে দূরত্বেই যাওয়া হোক ন্যূনতম ভাড়া নির্ধারিত। ফলে কম দূরত্বে যে সব যাত্রী চলাচল করেন এ সব সিটিং সার্ভিস বাসে চড়লে তাদের কয়েকগুণ বেশি ভাড়া গুনতে হয়। এ ছাড়া অফিস শুরু ও অফিস শেষের সময়ে এ সব সিটিং সার্ভিস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যেখান থেকে ছেড়ে আসে সেখান থেকেই ভরে আসে। ফলে অন্যান্য স্টপেজ থেকে যাত্রী ওঠানোর সুযোগ নেই। এ অবস্থায় ঢাকার একটা বড় অংশের যাত্রী নির্ভরশীল হয়ে উঠেছেন লেগুনার ওপর। এ ছাড়া রাত ১০টার পর ঢাকার অনেক রুটে সিটিং সার্ভিস নামের বাসগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রেও চলাচলের বড় অবলম্বন লেগুনা।

রাজধানীর ফার্মগেট থেকে মিরপুর ১০, ফার্মগেট থেকে মহাখালী, ফার্মগেট থেকে জিগাতলা, ফার্মগেট থেকে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ হয়ে নিউমার্কেট, ট্যানারি মোড় থেকে নিউমার্কেট, গাবতলী থেকে বাড্ডা ভায়া মহাখালী-গুলশান, মিরপুর-২-আগারগাঁও-মহাখালী-বাড্ডা, গুলিস্তান থেকে মালিবাগ রেলগেট-সিপাহীবাগ-গোড়ান, ডিএসসিসি নগর ভবন থেকে পুরান ঢাকার প্রধান সড়কগুলোতে লেগুনা চলাচল করে। কিন্তু গত সপ্তাহে ডিএমপি থেকে লেগুনা বন্ধের সিদ্ধান্ত হওয়ার পর এ সব রাস্তায় লেগুনা চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। এমনকি প্রধান সড়ক না এমন রুটে চলাচল করা লেগুনাও বন্ধ হয়ে গেছে কোথাও কোথাও।

শাহীন মাঞ্জুরুলুর হক নামে একজন সংবাদকর্মী থাকেন মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়ায়। কাকলীতে তার অফিস। শ্যাওড়াপাড়া থেকে ইব্রাহিমপুর পর্যন্ত গলির ভেতরকার রাস্তাটুকু আসতেন লেগুনাতে। গত শনিবার থেকে ওই রুটে লেগুনা বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে তিনি ১০ টাকায় ওইটুকু পথ আসতে পারতেন সেখানে এখন রিকশায় আসতে তার লাগছে ৪০ টাকা। আসা-যাওয়ার পথেই তার খরচ ৬০ টাকা বেড়েছে। শাহীন বলেন, ‘লেগুনা বন্ধ হওয়ায় হঠাৎ করেই যাতায়াতে খরচ বেড়েছে চারগুণ। এর মানে মাস শেষে কম করে হলেও খরচ বাড়বে দেড় হাজার টাকা। মাস মাইনের ওপর চাপ তো পড়বেই। অন্যান্য খরচ কমিয়ে আয়ের সঙ্গে ব্যালেন্স করতে হবে।’

মহাখালীর তিতুমীর কলেজে অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী নাজনীন আক্তার। আগারগাঁওয়ের বাসা থেকে কলেজ পর্যন্ত রাস্তা নিয়মিত যাতায়াত করতেন লেগুনাতে। ১০ টাকা ভাড়াতেই তিনি চলে যেতে পারতেন গন্তব্যে। এখন লেগুনা বন্ধ হওয়ায় পড়েছেন মহাদুর্ভোগে। তিনি বলেন, ‘সকালে কলেজে যাওয়াটাই এখন মুশকিল হয়ে গেছে। দুই-তিন ঘণ্টা রাস্তায় দাঁড়িয়েও কোনো বাসে ওঠা যায় না। আর উঠতে পারলেও এটুকু রাস্তার জন্য ২০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। তিনি আরও বলেন, লেগুনার বিকল্প ব্যবস্থা না করে লেগুনা উঠিয়ে দেওয়া অন্যায়। এতে আমাদের মতো সাধারণ মানুষকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। নেতারা তো এসি গাড়িতে চলাচল করেন। তারা কি করে বুঝবেন সাধারণ মানুষের কষ্ট?

প্রতিটি রুটে পর্যাপ্ত বিআরটিসি বাস নামানোর দাবি

ঢাকা মহানগরীর যানজট নিরসনে বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন ও কোম্পানির মাধ্যমে বাস পরিচালনা পদ্ধতি প্রবর্তনের বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের নেওয়া পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দক্ষিণ সিটির মেয়র সাঈদ খোকনের নেতৃত্বে গতকাল সোমবার একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটি জানিয়েছে, ঢাকার রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে কমপক্ষে দুই বছর লাগবে।

এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে একটি আইটি ফার্মের চাকুরে অজিত দাশ বলেন, বিকল্প ব্যবস্থা না করে লেগুনা বন্ধ করাটা কোনো যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত নয়। বছরের পর বছর ধরে অনিয়মই ঢাকার রাস্তায় নিয়ম হয়ে উঠেছে। তাই এখানে শৃঙ্খলা আনা স্বল্প সময়ের কোনো ব্যাপার নয়। মেয়র খোকনই বলছেন, এটা কমপক্ষে দুই বছর লাগবে। তাহলে এই দুই বছরে আমাদের বিকল্প যোগাযোগ কী হবে?’

তিনি মনে করেন, সরকার চাইলেই খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। ঢাকার সব রুটে দ্বিতল বিআরটিসি বাস নামালে অনেকটাই জনদুর্ভোগ কমানো যাবে। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, একটি বিআরটিসি দোতলা বাসে কমপক্ষে ১০০ মানুষ যাতায়াত করতে পারে। আর সরকার নির্ধারিত মূল্যের কাছাকাছি ভাড়া নেয় এ বাস।

ঢাকার রাস্তায় শৃঙ্খলা আনতে গেলে প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথাও বলছেন অনেকে। পুষ্পিতা চৌধুরী অঙ্কিতা বিশ্ববিদ্যালয় কোচিং করেন ফার্মগেটে। লেগুনা বন্ধ হওয়ায় এখন তাকে চলাচল করতে হচ্ছে রিকশায়। এতে দিনে কমপক্ষে তার ১০০ টাকা খরচ বেড়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একটা লেগুনা যেখানে ১৪-১৫ জন যাত্রী নিতে পারে ঠিক ওই পরিমাণ জায়গা দখল করে প্রাইভেট কার চলছে। প্রাইভেট কারের জন্যই রাস্তায় যানজট হচ্ছে। সরকারের উচিত প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ করা। আর সরকারি ব্যবস্থাপনায় পাবলিক বাস রাস্তায় নামানো।

কর্ম হারানোর শঙ্কা কয়েক হাজার শ্রমিকের

হঠাৎ করে লেগুনা বন্ধ হওয়ায় একবারে কয়েক হাজার পরিবহন শ্রমিক কাজ হারাচ্ছেন। ঢাকার লেগুনাগুলোতে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই চালক ও হেলপার হিসেবে কাজ করেন শিশু ও কিশোর বয়সীরা। ঝুঁকিপূর্ণ এ শিশুশ্রম নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। আবার বয়সের কারণেই শৃঙ্খলা না মানার প্রবণতাও তাদের মধ্যে বেশি। কিন্তু সড়কে লেগুনা বন্ধ হওয়ায় এদের বেশিরভাগ কাজ হারাচ্ছেন। বিকল্প ব্যবস্থা না করে তাদের রুটি-রুজির ওপর এ আঘাতকে সমালোচনাও করছেন অনেকে। জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সমাজ বিশ্লেষক আফসান চৌধুরী তার ফেসবুকে লিখেছেন, ঢাকায় লেগুনা উঠে গেলে কত মানুষের রুজিতে আঘাত লাগবে সেটা নিয়ে আমরা কম চিন্তিত ও গরিব মানুষ রাজনীতির বাইরে থাকে?’

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT