২১শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৬ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

রোজার ফাজায়েল ও মাসায়েল

প্রকাশিতঃ মে ২০, ২০১৮, ৪:০০ পূর্বাহ্ণ


ইসলামের মৌলিক পঞ্চস্তম্ভের মধ্যে রোজা অন্যতম রোকন ও ফরজ। মহান আল্লাহ এরশাদ করেন, ‘হে মোমিনরা! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো, যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পার।’ (সূরা বাকারা : ১৮৩)।
ফজিলত : হাদিসে আছে, ‘কেয়ামতের দিন অন্যান্য লোকজন যখন হিসাব-নিকাশের কঠোরতায় জড়িয়ে পড়বে, তখন রোজাদারদের জন্য আরশের ছায়ায় দস্তরখানা বিছানো হবে। রোজা পালনকারীরা সানন্দে পানাহার করতে থাকবে। তখন অন্যান্য লোক অবাক হয়ে বলবে, এ কী ব্যাপার! এরা সানন্দে পানাহার করছে! অথচ আমরা এখনও হিসাবের দায়ে আবদ্ধ! উত্তরে বলা হবে, দুনিয়ায় তোমরা যখন সানন্দে পানাহার করছিলে, তখন এরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ক্ষুৎপিপাসার যন্ত্রণা সহ্য করে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে পানাহার ও জৈবিক সম্ভোগ থেকে বিরত থেকে রোজা পালন করেছিল।
সংজ্ঞা : ‘সুবহে সাদিক’ থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার নিয়তে পানাহার ও জৈবিক সম্ভোগ থেকে বিরত থাকার নাম রোজা।
মাসায়েল : মাহে রমজানের রোজা পাগল, নাবালক, মুসাফির ও অসুস্থ ব্যতীত নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, অন্ধ, বধির ও শ্রমিক সবার জন্য ফরজ। শরিয়তে বর্ণিত ওজর-অপারগতা ব্যতীত রমজানের রোজা না রাখা কারও জন্যই জায়েজ নেই।
রোজার জন্য যেমন পানাহার পরিত্যাগ ফরজ, তেমনি নিয়ত করাও ফরজ। অবশ্য নিয়ত মুখে উচ্চারণ জরুরি নয়; শুধু অন্তরে সংকল্প থাকাই যথেষ্ট। তবে কেউ যদি মনের সংকল্পের পাশাপাশি বাংলায় বা আরবিতে মুখেও বলে যে, ‘আমি আল্লাহর জন্য রোজা রাখার নিয়ত করছি বা করলাম’Ñ তা আরও উত্তম।
শরিয়তের বিধান মতে, সুবহে সাদিক থেকে রোজা শুরু হয়। কাজেই সুবহে সাদিক না হওয়া পর্যন্ত পানাহার, স্ত্রী-সম্ভোগ ইত্যাদি সবই জায়েজ। এর আগে নিয়ত করুক বা না করুক।
রমজানের রোজার বেলায় রাতের অনুরূপ পরদিন দ্বিপ্রহরের এক ঘণ্টা আগ পর্যন্ত নিয়ত করলেও রোজা শুদ্ধ হয়ে যাবে। তবে নফল ও অন্যান্য রোজার ক্ষেত্রে রাতের মধ্যেই নিয়ত করে নেওয়া জরুরি।
মাহে রমজানের মধ্যে নফল রোজা, কাজা রোজা, মান্নত ইত্যাদি যে-কোনোটির নিয়ত করলেও তা রমজানের ফরজ হিসেবেই আদায় হবে; অন্য নিয়ত বাতিল বলে গণ্য হবে।
যদি কেউ পুরো রমজান অসুস্থ বা বেহুঁশ থাকে, তাহলে সুস্থ ও হুঁশ ফিরে আসার পর সব রোজ কাজা করতে হবে। তবে কেউ পুরো মাস পাগল থাকলে তার কাজা করতে হবে না।
মাহে রমজানে রোজা পালনের উদ্দেশ্যে ‘সাহরি’ খাওয়া সুন্নত। এতে পৃথক সওয়াব ও বরকত আছে; কিন্তু আগে আলোচিত নির্দিষ্ট সময়ে রোজা পালন ফরজ। তাই কেউ যদি নিদ্রার কারণে বা অন্য কোনো কারণে সাহরি খেতে না পারে, তবু তাকে ফরজ রোজা রাখতে হবে। একইভাবে রমজানে তারাবি নামাজ পড়া এবং তাতে ন্যূনতম এক খতম কোরআন পাঠ করা পৃথক পৃথক সুন্নতে মুয়াক্কাদা। সুতরাং কেউ যদি কোনো কারণে তারাবি বা খতমে শরিক হতে না পারে, তবু তাকে ফরজ রোজা পালন করে যেতে হবে।
যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় : রোজাদার ব্যক্তিকে জোরপূর্বক কিছু পানাহার করানো হলে, কুলি করা বা নাকে পানি দেওয়ার সময় পেটে পানি প্রবেশ করলে রোজা ভেঙে যাবে।
আগরবাতি, ধূপ, সুগন্ধি কাঠ ইত্যাদি জ্বালিয়ে ইচ্ছাকৃত এর ধোঁয়া গ্রহণ করলে, হুঁকা, সিগারেট ইত্যাদি পান করলে, রোজা ভেঙে যাবে। সাহরির সময় শেষ হওয়ার পরও সময় আছে মনে করে পানাহার করলে রোজা ভেঙে যাবে অর্থাৎ ওই রোজাও পূর্ণ করতে হবে এবং তার পরিবর্তে কাজাও করতে হবে।
চাল, বাজরা, মসুর, মাষকলাই ইত্যাদি ভক্ষণ করলে এবং দাঁতের ফাঁকে আটকে থাকা খাদ্যদ্রব্য চানা, বুট বা এর চেয়ে বড় হলে এবং তা খেয়ে ফেললে রোজা ভেঙে যাবে। এসব ক্ষেত্রে শুধু কাজা ওয়াজিব হবে। কিন্তু ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে বা জৈবিক সম্ভোগ করলে রোজার কাজা ও কাফফারা উভয়টি ফরজ হবে।
যেসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না : রোজা রাখা অবস্থায় ভুলে কিছু পানাহার করলে বা ভুলে জৈবিক সম্ভোগ করলে রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে স্মরণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা পরিহার করতে হবে।
রোজা অবস্থায় দিনে স্বপ্নদোষ হলে, সুরমা, তেল বা সুগদ্ধি ব্যবহার করলে, অনিচ্ছাকৃত গলার ভেতর মাছি-মশা, ধোঁয়া, ধুলা ঢুকে পড়লে, মুখের থুথু কম-বেশি গিলে ফেললে, রাতে গোসল ফরজ হওয়ার পরও গোসল না করে সেই গোসল দিনের বেলায় করলে, নাকের শ্লেষ্মা, মুখের নালা টেনে গিলে ফেললে, আপনা থেকেই কম-বেশি বমি হলেÑ এসব কারণে রোজা ভঙ্গ হয় না।
যেসব কারণে রোজা রেখেও ভাঙা যায় : রোজা রাখার পর হঠাৎ যদি এমন রোগে আক্রান্ত হয় যে, পানাহার না করলে জীবনের আশঙ্কা হয় বা রোগ বেড়ে যেতে পারে; অথবা ভীষণ পিপাসায় অস্থির হয় এবং প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়। উদাহরণতÑ সাপে দংশন করে বা দুর্ঘটনায় পড়ে আহত হয় বা মারাত্মক বেদনায় প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়, তা হলে এসব ক্ষেত্রে রোজা রেখেও তা ভাঙা যায়। গর্ভবতী নারীর নিজের বা সন্তানের প্রাণনাশের আশঙ্কা হলেও রোজা ভাঙা যায় এবং রোজা রাখায় দুধ-খাওয়া শিশুর মায়ের বুকের দুধ শুকিয়ে গেলে এবং শিশুর মারাত্মক সমস্যা হলে মায়ের তখন রোজা না রেখে ভেঙে ফেলা জায়েজ। অবশ্য তা পরে কাজা করতে হবে।
যেসব কারণে রোজা না রাখা জায়েজ : কেউ যদি এমন রোরাক্রান্ত হয় যে, রোজা রাখলেÑ ১. রোগ বেড়ে যাবে। ২. রোগ দুরারোগ্য হয়ে যাবে। ৩. প্রাণনাশের আশঙ্কা হয়, তা হলে রোজা না রেখে তা পরবর্তী সময়ে সুস্থ হওয়ার পর কাজা রাখা যাবে এবং অতিশয় বৃদ্ধ হলে এবং সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা না থাকলে, রোজার পরিবর্তে ফিদিয়া প্রদানও জায়েজ হবে। উল্লেখ্য, একটি রোজার ফিদিয়া একটি ফেতরার সমান। তবে অসুস্থ বা অপারগ হওয়া বিষয়টি নিজের মনমতো হলে চলবে না, তা প্রমাণের জন্য জরুরি হলো একজন ধার্মিক, অভিজ্ঞ চিকিৎসকের সাক্ষ্য বা সত্যায়ন।
রোজার মাসায়েল (আধুনিক)
১. মুখ, নাক, প্রস্রাব ও গুহ্যদ্বার দিয়ে মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীতে কোনো কিছু প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এসব অঙ্গ ব্যতীত অন্যস্থান দিয়ে দেহাভ্যন্তরে কিছু প্রবেশ করালে রোজা ভঙ্গ হয় না। ওইসব অঙ্গ ব্যতীত মস্তিষ্কে ও পাকস্থলীতে সরাসরি কিছু পৌঁছানো দ্বারাও রোজা ভঙ্গ হবে। কিন্তু এ দুই স্থান ব্যতীত দেহের অন্য কোথাও কিছু পৌঁছানো হলে তাতে রোজা ভঙ্গ হবে না। স্যালাইন, গ্লুকোজ, ইনজেকশন বা ইনজেকশনের মাধ্যমে শরীরে রক্ত প্রবেশ করানো দ্বারা রোজা ভঙ্গ হবে না। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
২. ডুস ব্যবহার বা হাঁপানির প্রকোপ নিরসনের জন্য গ্যাস জাতীয় (ইনহেলার) ওষুধ মুখের ভেতরে পৌঁছানোর কারণেও রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। এ জন্য কাজা রোজা আদায় করতে হবে। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
৩. রোজা অবস্থায় দিনের বেলায় কয়লা, গুলের মাজন, টুথপেস্ট, পাউডার ইত্যাদি দ্বারা দাঁত মাজা মাকরুহ। এগুলোর সামান্য অংশও গলার ভেতর চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হয়ে যাবে। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
৪. রোজা অবস্থায় অধিক দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা না হলে শিঙ্গা লাগানো, রক্তদান ও গ্রহণ জায়েজ। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
৫. মুখগহ্বর, নাক ও কানের অভ্যন্তর ভাগ, প্রস্রাব ও বাহ্য ইন্দ্রিয়ের অভ্যন্তরে, মস্তিষ্ক ও পাকস্থলীর যে-কোনো স্থানে অপারেশন করে কোনো অংশ কেটে ফেলাতে রোজা ভঙ্গ হয় না। কিন্তু অপারেশনের পর তাতে ওষুধ বা অন্য কিছু প্রবেশ করানো হলে রোজা ভঙ্গ হবে। ওই অঙ্গগুলো ছাড়া শরীরের অন্য যে-কোনো স্থানে অপারেশন করায় এবং ওষুধ প্রবেশ করানো দ্বারা রোজা ভঙ্গ হবে না। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
৬. দুই প্রকারের ক্ষতস্থান (আম্মা ও জায়িফা) যাতে ওষুধ ব্যবহারে রোজা ভঙ্গ হয়। তা হচ্ছেÑ মাথার উপরিভাগের গভীর ক্ষত যা মস্তিষ্কে পৌঁছে গেছে এবং পেটের ওই গভীর ক্ষত, যা পাকস্থলীতে পৌঁছে গেছে। এ দুই জখমে ওষুধ ব্যবহারে তা সরাসরি মস্তিষ্কে ও পাকস্থলীতে পৌঁছে যায় বিধায়, রোজা ভঙ্গ হয়ে যায়। তা ছাড়া শরীরের অন্য কোনো স্থানে ওষুধ ব্যবহারে রোজা ভঙ্গ হয় না। (শামী, আলমগীরি, জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
৭. অর্শ্ব রোগের যে বটি বাইরে থাকে তাতে ওষুধ ব্যবহারে রোজা ভঙ্গ হয় না; কিন্তু যে বটি ভেতরে থাকে, তাতে ওষুধ ব্যবহারে ভেতরে চলে যায় বিধায় রোজা ভঙ্গ হবে। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া)।
৮. চোখের ক্ষতস্থানে ওষুধ ব্যবহার করলে এবং তার স্বাদ গলায় অনুভূত হলেও রোজা ভঙ্গ হবে না। (শামি : ২, আহসান : ৪)।
৯. রোজা অবস্থায় দাঁত সংযোজন বা উত্তোলনে এবং তাতে ওষুধ ব্যবহারে রোজা ভঙ্গ হয় না। তবে রক্ত বা ওষুধ গলার ভেতরে চলে গেলে রোজা ভঙ্গ হবে। (জাদিদ ফিকহি মাসায়েল ও আহসানুল ফাতাওয়া-৪)।
(তথ্যসূত্র : ফাতাওয়া আলমগীরি : খ-১, রাদ্দুল মুহতার-শামি : খ-৩, বাহরুর রায়িক : খ-২, বাদায়ে : খ-২ ইত্যাদি)

লেখক : মুফতি, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT