১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

রোজই কিছু না কিছু শিখছি

প্রকাশিতঃ জুন ২৮, ২০১৮, ১:০০ অপরাহ্ণ


এই মুহূর্তে বলিউডের সবচেয়ে চর্চিত মানুষটি হলেন রণবীর কাপুর। একদিকে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত ছবি সঞ্জু মুক্তি পাচ্ছে, অন্যদিকে বলিউড অভিনেত্রী আলিয়া ভাটের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন। সাক্ষাৎকার শুরুর আগেই শর্ত ছিল ‘নো আলিয়া’। তবু ঘুরেফিরে চলে এল আলিয়ার প্রসঙ্গ। আর উঠে এল রণবীরের ছবি সঞ্জু ছাড়া তাঁর যৌবনের সেই ভুলসহ আরও নানা কথা। চিত্রপরিচালক রাজকুমার হিরানীর অফিসে বসেছিল এই আড্ডা। মিতভাষী, সুদর্শন এই নায়কের সঙ্গে আড্ডায় ছিলেন প্রথম আলোর মুম্বাই প্রতিনিধি দেবারতি ভট্টাচার্যপ্রশ্ন: ‘সঞ্জু’ ছবির ট্রেলার মুক্তির পর আপনার জয়জয়কার। কেমন লাগছে?
রণবীর: ধন্যবাদ। বড় কথা হলো, এত ভালো প্রতিক্রিয়া আমি আগে কোনো ছবি থেকে পাইনি। এটা সঞ্জয় দত্তের ওপর ছবি। তার ওপর রাজকুমার হিরানী পরিচালক। সবার ভালোবাসা আমার সঙ্গে আছে। এই ছবিটা আমার কাছে অনেক বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে আমি সঞ্জয় দত্তের চরিত্রে অভিনয় করেছি। অনেকের মনে হয়তো প্রশ্ন ছিল, আমাকে সঞ্জয়ের চরিত্রে কেমন লাগবে। এখন সেই সংশয়টা দূর হয়েছে। দর্শক সেটা ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন, এটা আমার কাছে সবচেয়ে স্বস্তির বিষয়।

প্রশ্ন: আপনার বড় সমালোচক আপনার বাবা। এবার ওনার মুখেও আপনার প্রশংসা শোনা গেছে। বাবা-ছেলের সম্পর্কের রসায়নটা কি একটু বদলেছে?
রণবীর: হ্যাঁ, বাবা ছবির ট্রেলার দেখে আমার প্রশংসা করেছেন। তবে আমাদের সম্পর্কটা এখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি বাবাকে একই রকম ভয় পাই। জানেন, কয়েক বছর আগে বাবা আমার ম্যানেজার ছিলেন। আমার ভ্যালু এক টাকার হলে বাবা আমাকে ১০০ টাকা পাইয়ে দিতেন। শুধু আমি নই, ইন্ডাস্ট্রিতেও সবাই তাঁকে ভয় পান। তাই ইন্ডাস্ট্রিতে কেউ তাঁকে না বলতে পারতেন না। তার ওপর বাবা অনেক সিনিয়র অভিনেতা।

প্রশ্ন: শুনেছি, আপনার মা আপনার সবচেয়ে বড় ভক্ত…।
রণবীর: একদম ঠিক শুনেছেন। উনি আমার সবচেয়ে বড় ফ্যান (সশব্দে হেসে)। আমাকে অ্যাড ফিল্মে বা টিভিতে কোনো সাক্ষাৎকারে দেখলেই সুন্দর একটা মেসেজ লিখবেন আমায়।

প্রশ্ন: রাজকুমার হিরানীর মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিপ্রায় প্রায় সব অভিনেতার। আপনারও সে রকম কোনো বাসনা ছিল কি?
রণবীর: রাজু স্যারের সঙ্গে আমি অনেক আগে থেকেই যোগাযোগ রেখেছিলাম। থ্রি ইডিয়েটস ছবির জন্য উনি আমাকে প্রথমে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রথমে উনি বুঝতে পারেননি যে এমন একজন অভিনেতা লাগবে যাকে তরুণ লাগবে, আবার ৪০ বছর বয়সী লাগবে। তাই এই চরিত্রের জন্য আমি খুবই ইয়াং ছিলাম। ওনার সঙ্গে তখন কাজ করা হয়নি। কিন্তু আমি সব সময় চেয়েছিলাম তাঁর মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে। একদিন রাজু স্যার আমাকে মেসেজ করে জানান যে সঞ্জয় দত্তের ওপর ছবি হচ্ছে। আর আমি সঞ্জয় স্যারের চরিত্রে অভিনয় করব। তখন আমি একটু অবাক হই। আমি কী করে তাঁর চরিত্রে ফিট হব? কিন্তু ছবির চিত্রনাট্য শুনে আমার দারুণ লাগে। রাজু স্যারের মতো পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পেলাম।

প্রশ্ন: সঞ্জয় দত্ত মাদকাসক্ত ছিলেন। আপনি কি কখনো এর স্বাদ নিয়েছেন?
রণবীর: আমিও ড্রাগ নিতাম। তখন আমি কলেজে পড়তাম। কুসঙ্গে পড়ে ড্রাগ নিয়েছি। তবে সেটা সাময়িক ছিল। খুব তাড়াতাড়ি এর থেকে বেরিয়ে এসেছি। কিন্তু সঞ্জয় দত্তের ড্রাগের প্রতি গভীর আসক্তি ছিল। তবে তিনি নিজের সঙ্গে লড়াই করে এর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন। ড্রাগের সাময়িক আনন্দ নিতে গিয়ে একটা মানুষ নিজের জীবন বরবাদ করে দেয়। সঞ্জু ছবির এই পর্যায়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা এর মাধ্যমে যুবসম্প্রদায়ের কাছে খুব সুন্দর বার্তা পৌঁছে দিয়েছি। আমি এই বিষয়ের ওপর অনেক গবেষণা করেছিলাম। যারা নেশাগ্রস্ত, তাদের আমি বলতে চাই, তারা যেন তাদের সমস্যার কথা নিজের পরিবার এবং বন্ধুদের খোলামনে জানায়।প্রশ্ন: আর কিসের প্রতি আপনার আসক্তি আছে?

রণবীর: আমার একসময়ে নিকোটিনের প্রতি ভীষণ আসক্তি ছিল। আমি মনে করি, এটা সবচেয়ে খারাপ আসক্তি। এমনকি এটা ড্রাগের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়। এখন এর থেকে বেরিয়ে এসেছি। তবে এই নেশা ছাড়তে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে। আর হ্যাঁ, একটা ভালো জিনিসের প্রতি আমার আসক্তি আছে, সেটা হলো মিষ্টি।

প্রশ্ন: শুনেছি, ছাত্রজীবনে আপনি মানসিক অবসাদে ভুগেছিলেন। এর থেকে বাইরে এলেন কী করে?

রণবীর: সত্যি বলতে আমি কখনো ডিপ্রেশনে যাইনি। আমি সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠেছি। আমার ছোটবেলা খুব সুন্দর ছিল। আমি যা চেয়েছি আমার মা-বাবা আমাকে তাই দিয়েছেন। তার মানে এই নয় যে তাঁরা আমাকে বিগড়ে দিয়েছেন। মা-বাবার থেকে আমি শিক্ষা, সংস্কার, প্রেরণা, ভালোবাসা—সবকিছু পেয়েছি। তাই মানসিক অবসাদে ভোগার কোনো কারণ ছিল না আমার।

প্রশ্ন: সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে আপনার জীবনের মিল কোথায়?

রণবীর: আসলে আমাদের পরিবারের সঙ্গে তাঁদের অনেক পুরোনো সম্পর্ক। তাঁদের বাবা-ছেলের সম্পর্কের সঙ্গে আমাদের বাবা-ছেলের সম্পর্কের অনেকটাই মিল আছে। প্রথমত, তাঁরা দুজনেই অভিনেতা, আমরাও তা-ই। আর আমাদের মতো সঞ্জয় এবং সুনীল স্যারের মধ্যেও কোনো বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল না। সঞ্জয় স্যার আমার মতো তাঁর বাবাকে ভয় পেতেন, শ্রদ্ধা করতেন, আবার ভালোবাসতেন। আমি ছোটবেলায় সুনীল দত্তকে দেখেছি। তাই তাঁর বিষয়ে সে রকম কিছু মনে নেই। তবে এটুকু বলতে পারি তিনি যখনই আমায় দেখতেন খুব আদর করতেন। সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে আমার বহুবার দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে। আর আমি ছোট থেকে তাঁর ভক্ত ছিলাম। আমার ঘরের দেয়ালে সঞ্জয় স্যারের পোস্টার লাগানো থাকত। সঞ্জয় দত্তের মুখ থেকে তাঁর বাবার অনেক গল্প শুনেছি।

প্রশ্ন: ‘সঞ্জু’ ছবিতে সঞ্জয় দত্ত বলেছেন যে তাঁর ৩০৮ প্রেমিকা ছিল। আপনি কখনো এতটা খোলা হতে পারবেন?

রণবীর: এটা একটা বায়োপিক। আর এই ছবিতে সঞ্জয় স্যার নিজের জীবনের সব সত্য জানিয়েছেন। নিজেকে কখনোই ভগবান হিসেবে দেখাননি। তিনি খুব সাহসের সঙ্গে সব সত্য স্বীকার করেছেন। আর সত্যি বলতে, সঞ্জয় দত্তের মতো আমার সেই সাহস নেই। আমি কখনোই এত খোলা হতে পারব না। তবে বলতে পারি, আমার গার্লফ্রেন্ডের সংখ্যা দশের কম।

প্রশ্ন: বায়োপিকে কাজ করা মানে পুরোপুরি সেই চরিত্রের মতো হয়ে ওঠা। তাই সঞ্জয় দত্ত থেকে আবার রণবীর হয়ে ওঠা কতটা কষ্টকর ছিল?

রণবীর: আমি খুব ডিটাচড অভিনেতা। আমি কখনোই আমার ছবির সঙ্গে সেভাবে জুড়ে থাকি না। আমি খুব তাড়াতাড়ি আমার চরিত্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারি। সঞ্জুর পরপরই ব্রহ্মাস্ত্র ছবির শুটিং শুরু হয়। তাই খুব তাড়াতাড়ি সঞ্জয় দত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছিলাম।

প্রশ্ন: আপনার দাদু রাজ কাপুরের ওপর বায়োপিক হওয়া উচিত বলে কি আপনি মনে করেন?

রণবীর: দাদাজির ওপর বায়োপিক হওয়া উচিত। তবে তাঁর জীবনে অনেক কিছু আছে, যা আমার পরিবার চাইবে না তা প্রকাশ্যে আসুক। আর আমি মনে করি, বায়োপিক সততার সঙ্গে বানানো উচিত। যে রকমভাবে সঞ্জু নির্মাণ করা হয়েছে। একজন মানুষের ওপর যখন বায়োপিক বানানো হয়, তখন তাঁকে যেন ভগবানে পরিণত না করা হয়। তাঁর দোষগুণ যেন সবকিছুই দেখানো হয়। তবে আমার পরিবার যদি মত দেয় যে দাদাজির জীবনের সবকিছু দেখানো যাবে, তাহলে খুবই ভালো একটা বায়োপিক হবে।

প্রশ্ন: ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

রণবীর: অমিতাভ বচ্চনের মতো অভিনেতার চোখে চোখ রেখে সংলাপ বলা খুবই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা। চার দিন টানা তাঁর সঙ্গে শুটিং করেছি। তবে আমি একটা সংকল্প নিয়েছি যে ব্রহ্মাস্ত্র শেষ হওয়ার আগে তাঁকে আমার সেরা বন্ধু বানাব। অমিতাভের মতো মানুষ এই দুনিয়াতে নেই। আজও তিনি যে একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করেন, তা ভাবা যায় না। অমিতাভ স্যার সেটে কখনোই বুঝতে দেন না যে তিনি অত বড় অভিনেতা। আজও তিনি অভিনয়ের প্রতি কত সৎ এবং শৃঙ্খলাপরায়ণ। তাঁর দৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর পুরো তিন ঘণ্টা তিনি আমার এবং আলিয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন।

প্রশ্ন: বলিউডে এমন কোনো অভিনেতা আছেন, যাঁর দ্বারা আপনি প্রভাবিত?

রণবীর: এক নয়, বলিউডের একাধিক অভিনেতা দ্বারা আমি প্রভাবিত। দিলীপ কুমার, রাজ কাপুর, দেবানন্দ, অমিতাভ বচ্চন, ঋষি কাপুর, বিনোদ খান্না, ধর্মেন্দ্র থেকে বরুণ ধাওয়ান, রণবীর সিং, ভিকি কৌশল, কার্তিক আরিয়ান, আদিত্য রায় কাপুর, দীপিকা, আলিয়া, ক্যাটরিনা, প্রিয়াঙ্কা—এঁদের সবার দ্বারা আমি প্রভাবিত। আমি সবার থেকে কিছু না কিছু শিখি। আর রোজই কিছু না কিছু শিখছি।

প্রশ্ন: আলিয়ার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নিয়ে বলিউডে এখন নানান কথা শোনা যাচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনি কী বলবেন?

রণবীর: আমার এবং আলিয়ার সম্পর্ক নিয়ে আমি কথা বলতে ‘রাজি’ নই (সশব্দে হেসে)। তবে অভিনেত্রী আলিয়ার কথা বলতে চাই। ব্রহ্মাস্ত্র ছবির শুটিং সূত্রে আলিয়ার কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ওর মধ্যে অদ্ভুত একটা এনার্জি আছে। আমার এই ইন্ডাস্ট্রিতে ১০ বছর হলো। আলিয়ার ৬ বছর। এত কম বয়সে ও অভিনয়ের প্রতি পুরোপুরি নিবেদিত, ভীষণ সৎ, যা সচরাচর দেখা যায় না। অসম্ভব ভালো অভিনেত্রী। আর ভীষণ হেল্পফুল। আর সত্যি বলতে আলিয়ার মধ্যে যে প্রতিভা আছে, তা খুব কম দেখা যায়।

প্রশ্ন: আপনি কি মনে করেন, ‘সঞ্জু’ ছবিটা আপনার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে?

রণবীর: সঞ্জয় দত্তের পরিচিতি দেশজুড়ে। এই ছবির মাধ্যমে আমি হয়তো আরও পরিচিতি পাব। আগামী দু-তিন বছর আমার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমি অনেক ভালো ভালো ছবি করছি। বলা যায়, আমি এখন জিরো থেকে শুরু করলাম। আগে যা যা করেছি, তা ভুলে যেতে চাই।

প্রশ্ন: ১০ বছরের ক্যারিয়ারে আপনি এই ইন্ডাস্ট্রি থেকে কী শিক্ষা নিলেন?

রণবীর: রাজকুমার হিরানীর থেকে একটা জিনিস শিখেছি যে দর্শককে আগে খুশি করো। দর্শককে খুশি করলেই আমি খুশি হব। শুরুর দিকে আমি শুধু আমার পছন্দের ছবিতে কাজ করতাম। ১০ বছর পর বুঝেছি আরও গভীর ছবি আমায় করতে হবে। আগে আমি ছবি নির্বাচন করতাম এই ভেবে যে, এই ছবিতে আমি অনেক স্টার পাব। চিত্র সমালোচকেরা আমার প্রশংসা করবেন। এখন এই সব থেকে বেরিয়ে এসেছি। এখন শুধু দর্শককে খুশি করতে চাই।

প্রশ্ন: সফলতা এবং অসফলতা কীভাবে দেখেন?

রণবীর: অসফলতাকে মেনে নিতে একটু কষ্ট হয়। তবে কখনোই সফলতা এবং অসফলতাকে খুব একটা গুরুত্ব দিই না। যখন অসফলতা আসে আমি নিজেকে আরও প্রেরণা জোগাই। আমি শাহরুখ, আমির, সালমান নই যে আমার নামে ছবি চলবে। আমার মতো অভিনেতাকে অনেক অসফলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। শুধু সততা এবং একাগ্রতার সঙ্গে কাজ করতে চাই।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT