২৬শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ১১ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

রোগীর দুয়ারে মনপুরার ডাক্তার

প্রকাশিতঃ ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০১৮, ১২:৫৮ অপরাহ্ণ


‘ও ভাই, ডায়াবেটিস আর প্রেশার আছে কি আপনার? হাসপাতালে গিয়ে তা জানা যে দরকার’—এই ধুয়ো দিয়ে ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় কবিগানের আসর বসেছিল রামনেওয়াজ বাজারে। গোটা বিশেক দোকান নিয়ে ভোলা জেলার মনপুরা দ্বীপের একটি ছোট বাজার রামনেওয়াজ। এলাকার মানুষকে অসংক্রামক ব্যাধি সম্পর্কে সচেতন করতেই এই আসরের আয়োজন ছিল। গেরুয়া পাগড়ি ও পোশাক পরা যে গায়ক পুরো দলটিকে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি ডা. মো. মাহমুদুর রশিদ। মাহমুদুর রশিদ মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা।

গানের আসর শেষ করার আগে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতার উদ্দেশে মাহমুদুর রশিদ বললেন, ‘২৪ ঘণ্টা আমাদের হাসপাতাল খোলা থাকে। পরিবারের কারও সমস্যা হলেই হাসপাতালে আসবেন।’

পরদিন মনপুরা উপজেলা হাসপাতালে কথা হ‍য় গোপাল চন্দ্র দাসের সঙ্গে। হাসপাতালে ভর্তি গোপালের স্ত্রী। গোপাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগের চেয়ে হাসপাতালের পরিবেশ ভালো। তা ছাড়া সব সময় ডাক্তার পাওয়া যায়।’ হাসপাতালে ভর্তি থাকা অন্য রোগী ও তাদের আত্মীয়রা বলেছেন, মাহমুদুর রশিদ এখানে আসার পর প্রায় দুই বছরে হাসপাতালে অনেক পরিবর্তন এনেছেন।

মাহমুদুর রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ফজরের নামাজের পর মুসল্লিদের সঙ্গে, এলাকার বয়স্ক ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলতাম। জিজ্ঞেস করতাম, আপনারা হাসপাতালে যান না কেন। তাঁরা বলতেন, কেন যাব, ডাক্তার থাকে না। আমি বলতাম, আমি হাসপাতালের নতুন বড় ডাক্তার। রোগী নিয়ে আসবেন। আমি সারাক্ষণ হাসপাতালে থাকি।’

২০১৬ সালের মার্চে মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদে যোগ দেন মাহমুদুর রশিদ। এর আগে তিনি ভোলারই আরেক উপজেলা লালমোহনের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ছিলেন। সেখানে কাজ করার সময় তিনি নিজে হাসপাতাল পরিষ্কার করতেন। তাঁর বুকে-পিঠে ঝোলানো থাকত: ‘এই হাসপাতালে আপনার আমার। আসুন, হাসপাতাল পরিষ্কার রাখি’।

দেশের দক্ষিণের এই দ্বীপ মনপুরায় এক লাখ মানুষের বাস। প্রতিদিন সকালে দুটি লঞ্চ ঢাকা থেকে মনপুরায় আসে ভোলা হয়ে। বেলা তিনটার মধ্যে সেগুলো চলে যায়। বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপে চিকিৎসকেরা কাজ করতে চান না। ২০০৮ সাল স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার পদে পাঁচজনকে পদায়ন করা হয়েছিল। ২০১৫ সালে চারজনকে।

‘আমি কর্মকেই ধর্ম মনে করি। এই দ্বীপ, এখানকার মানুষ ছেড়ে আমি যাব না। সরকার যদি আমাকে অন্য জায়গায় পাঠায়, সেটা সরকারের ব্যাপার।’ পরিষ্কার বক্তব্য মাহমুদুর রশিদের।

এলাকার মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দ্বীপের বিভিন্ন হাটবাজারে মাঝেমধ্যেই জারি গানের আসর বসান এই চিকিৎসক। গান লেখা, পরিচালনা তাঁর। গানের আসরে বিভিন্ন স্বাস্থ্যবার্তা থাকে, আমন্ত্রণ থাকে হাসপাতালে যাওয়ার।

‘রোগীর খবর দিন’
উপজেলায় কমিউনিটি ক্লিনিক আছে ৯টি। এসব ক্লিনিকে হঠাৎ হাজির হন মাহমুদুর রশিদ। আশপাশের লোক নিয়ে জমায়েত করেন। পুষ্টি, শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য নিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। নিজের পকেট থেকে প্রতি মাসে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের ৫০ টাকা করে মুঠোফোনের বিল দেন। শর্ত এই যে নিজ নিজ এলাকার খারাপ রোগীর খবর জানাতে হবে।

উপজেলায় গত বছর ছয়টি মাতৃমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। প্রত্যেক মা, ঘটনার তারিখ ও স্থান বড় করে উপজেলা হাসপাতালের দেয়ালে লিখে রেখেছেন। লিখেছেন, অদক্ষ ধাইয়ের হাতে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে।

ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থেকে সহায়তা নিয়ে মনপুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজস্ব তহবিল গঠন করতে পারবে এমন অনুমতি দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। সাংসদ, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সেই তহবিলে অর্থ দিচ্ছেন। উপজেলা চেয়ারম্যান তহবিল কমিটির প্রধান। তহবিলের টাকায় একজন নৌ কর্মকর্তার পরামর্শে একটি নৌ অ্যাম্বুলেন্স তৈরি করেছেন মাহমুদুর রশিদ। নাম রেখেছেন ‘মেঘনা সাহস’।

কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (কমিউনিটি ক্লিনিক পরিচালনাকারী) ফয়সাল হাওলাদার প্রথম আলোকে বলেন, হাসপাতালে প্রসব হওয়ার পর মা ও নবজাতক বাড়ি ফিরে গেলে তাদেরও খবর নেন মাহমুদুর রশিদ। কখনো কখনো দুর্গম চরে রোগীর বাড়িতে গিয়ে হাজির হন।

রোগীরা হাসপাতালমুখী
উপজেলায় চিকিৎসকের পদ আছে ১০টি। এখন কাজ করছেন চারজন। তাঁদের একজন ডা. মো. মইদুল ইসলাম। ১৩ মাস আগে এখানে এসেছেন। প্রথম আলোকে এই চিকিৎসা কর্মকর্তা বলেন, ‘স্যার (মাহমুদুর রশিদ) আছেন বলেই এখন এখানে চারজন চিকিৎসক। আগে এক-দুজনের বেশি থাকত না।’ তরুণ এই চিকিৎসক বলেন, ‘স্যার নিজ হাতে রোগীদের বিছানা ঠিক করে দেন। পাশাপাশি নিয়মিত গ্রামে গ্রামে যান।’

এসবের কারণে হাসপাতালে রোগী বাড়ছে। সেবার পরিমাণও বাড়ছে। ২০১৬ সালে প্রসব সেবা নিতে এসেছিলেন ৮০ জন মা, ২০১৭ সালে তা বেড়ে হয় ২৮২। বহির্বিভাগেও রোগী বাড়ছে। গড়ে ২০০ রোগী আসছে। আগে আসত পঞ্চাশের কম।

মনপুরা উপজেলা চেয়ারম্যান সেলিনা আক্তার চৌধুরী বলেন, মাহমুদুর রশিদকে আগামীতে হয়তো মনপুরায় ধরে রাখা যাবে না। তিনি চলে গেলে কী হবে, সেটা চিন্তার বিষয়।

তবে মাহমুদুর রশিদ আশাবাদী। ‘জনগণের অংশগ্রহণে দুর্গম অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা: মনপুরা মডেল’ শিরোনামে সৃজনশীল কাজের স্বীকৃতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এটুআই প্রকল্পের কর্মকর্তারা। এর আওতায় কী করে স্বাস্থ্যসেবায় কমিউনিটির সমর্থন বা সহায়তা বাড়ানো ও টেকসই করা যায়, তা পরীক্ষা করে দেখবেন চিকিৎসক মো. মাহমুদুর রশিদ।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT