১০ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

রুটিন কাজ আর আমার দ্বারা সম্ভব নয়

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৪, ২০১৮, ২:৪০ অপরাহ্ণ


ডেক্স নিউজ: অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত টানা দুই মেয়াদে ১০ বছর (২০০৯-২০১৮) জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করার রেকর্ড গড়েছেন। ৮৫ বছরের বর্ণাঢ্য জীবন পার করে এবার তিনি অবসরে যেতে মনস্থির করেছেন। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়নপত্র কিনেছেন এই ভেবে, শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী যদি চূড়ান্ত নির্দেশ দেন কিংবা কোনো পরিস্থিতি যদি মোকাবেলা করতে হয় তা বিবেচনায় রেখে। তিনি আর রুটিন কাজ করতে চান না। সংগ্রহে থাকা অসংখ্য বই এবার পড়তে চান। লিখতে চান, ভ্রমণে যেতে চান। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠনসহ সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের পর তাঁর পর্যবেক্ষণ হলো‘অদ্ভুত রাজনীতি’ থেকে দেশ বের হচ্ছে। গত ৭ নভেম্বর দুপুরে অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে এই বিশেষ সাক্ষাত্কারটি দেন। একান্ত আলাপে তিনি রাজনীতি, নির্বাচন, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন প্রসঙ্গে কথা বলেন।

আলাপের শুরুতে একটু ভেবে তিনি বলেন, ‘রুটিন কাজ আর আমার দ্বারা সম্ভব হবে না। প্রধানমন্ত্রী আমার অবসরে যাওয়ার প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, অন্য কোনো কাজ দেবেন আমাকে। এমনকি আমাকে নির্বাচনের কাজ করতে হতে পারে। আমি নির্বাচনী প্রচারণায় থাকছি। আমি পরবর্তী সরকারে কোনো দায়িত্বে থাকছি না। আমি রিটায়ারমেন্টে যাব, তবে এটা একেবারে রিটায়ারমেন্ট নয়।’

অবসরে যাওয়ার ঘোষণা এর আগেও মুহিত দিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে বাংলাদেশ সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) থেকে বিও অ্যাকাউন্ট মেইনটেন্যান্স ফি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে মুহিত বলেন, ‘আমি নমিনেশন পেপার পার্টিতে সাবমিট করেছি অ্যাজ এ ডামি ক্যানডিডেট, কারণ আমি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব না।’ তিনি বলেন, ‘এখনো আমার চেয়ে সিনিয়র লোকরা পলিটিক্সে আছেন এবং পলিটিক্সে থাকতে চান। এরশাদ আমার চেয়ে সিনিয়র, বদরুদ্দোজা সাহেব আমার সিনিয়র, এবার তাঁরা লাস্ট চান্স নিতে চান। আমার আর উইশ-টুইশ নাই, ৮৫ বছর বয়স হয়েছে, যথেষ্ট। আমার মনে হয়, ৮৫ বছরে রিটায়ারমেন্টে যাওয়া উচিত।’

আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে অর্থমন্ত্রী কে হবেন, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘এর উত্তর দেওয়াটা কঠিন, বোঝা যাচ্ছে না। তবে বর্তমান অর্থ প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নানের সুযোগ রয়েছে। কারণ তাঁর বাড়িও সিলেটের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে।’

অবসরে গেলে পেনশন তহবিলের সঞ্চয় থেকে জীবন চলবে এমন পরিকল্পনা তুলে ধরে মুহিত বলেন, ‘২০০৪ সালে আমি আমার জন্য একটি পেনশন ফান্ড করি। কোটি টাকার একটি পেনশন ফান্ড করি, যা থেকে প্রতি মাসে আমি পাঁচ লাখ টাকার মতো আদায় করতে পারব। এটাতে আরো কিছু যোগটোগ করলে আরো বড় হবে। কাজেই আর্থিকভাবে আমি খুব ভালো অবস্থায় আছি। কারণ আমাদের আমলে মন্ত্রীটন্ত্রীদের বেতন অনেক বাড়ার ফলে আই হেভ বিন লিভিং উইদিন মাই মিনস। পাঁচ-ছয় বছর ধরে, ১০ বছর না হোক ছয়-সাত বছর লিভিং উইদিন মাই মিনস। সঞ্চিত অর্থ থেকে ব্যয় করতে হচ্ছে না। এটা সঞ্চিত হয়ে আছে। কাজেই অবসরে গেলে আমার আর্থিক বিষয় নিয়ে ভাবনা থাকবে না। এই যে সরকারের চাকরি যা করেছি—আমার নেট অ্যাসেট এক কোটি থেকে বেড়ে দুই কোটি টাকা হয়ে গেছে। এবং এবার দুই কোটির বেশি হবে। আগামী ৩০ তারিখের মধ্যে আমি রিটার্ন দাখিল করব—তখন দেখা যাবে অ্যাসেট কত হয়েছে। আমার ধারণা, এটি দুই কোটি টাকার বেশি হবে।’

আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন যে রিটায়ার করার চিন্তা করছি—আই শেল ডু ইট। সুন আফটার দ্য নির্বাচনকালীন সরকার। ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে রিটায়ার করব। তখন ইচ্ছা হচ্ছে শেখ হাসিনা আমাকে দিয়ে যা করাতে চান, করব। এ ছাড়া আমার সংরক্ষণে অসংখ্য বই আছে। এটা পড়া হবে। লেখালেখি করব। আর একটু বেড়াবটেড়াব।’

এলাকার নির্বাচনী রাজনীতি থেকেও সরে যাচ্ছেন কি না, জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘নির্বাচন যখন করব না, তখন নির্বাচনী রাজনীতি থেকে তো সরে যেতেই হবে। সিলেটে আমার নামে প্রচুর পোস্টার লাগানো হয়েছে। হু ইজ ডুয়িং দিস? হু ইজ পেয়িং ফর ইট, আই ডোন্ট নো। কেউ জানে না—আমি মোমেনকে (ছোট ভাই ড. আবদুল মোমেন) জিজ্ঞেস করেছিলাম—সে বলতে পারল না, আমি বললাম খুঁজে বের করো। ওটার খরচ কে দিচ্ছে, সামবডি ইজ পেয়িং ফর ইট।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশ দলের সবাই মানে, এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে মুহিত বলেন, ‘এটা সত্য আওয়ামী লীগের সবাই একমত হয় না—এটা ট্রু। কিন্তু আরেকটা বিষয় হচ্ছে, নেত্রী যে সিদ্ধান্ত নেন, তা সবাই মানে। নেত্রী বললে তো আমি করব—দেয়ার ইজ নো কোয়েশ্চেন। কিন্তু আমার ধারণা, নেত্রী আমাকে বলবেন না। উনি আমাকে যে ইন্ডিকেশন দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, আপনার বয়সটয়স হয়েছে, তবে আপনাকে নির্বাচনে কাজ করতে হবে। কাজেই নির্বাচনী প্রচারণায় আমি পুরোপুরি আছি।’

টানা ১০ বার বাজেট পেশের বিষয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে মুহিত বলেন, ‘১০টা বাজেট টানা দিয়েছি। একটানা বাজেট পেশের একটা অ্যাডভানটেজ আছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে এটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত।’

রাষ্ট্রপতি হওয়ার প্রস্তাব পেলে কী করবেন, জানতে চাইলে বিষয়টি প্রথমে এড়িয়ে পরে বললেন, ‘ইট নট মাই সাবজেক্ট। বঙ্গবন্ধু, মাহমুদ উল্লাহ, আবদুর রহমানও রাষ্ট্রপতি ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীও অনেকে হয়েছেন। আমি সব সময়ই শেখ হাসিনার অধীনেই আছি।’

সিলেট থেকে বেশির ভাগ অর্থমন্ত্রী হয়েছেন, সামনের দিনের অর্থমন্ত্রী কে হচ্ছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, সিলেট থেকেই বেশির ভাগ অর্থমন্ত্রী হয়েছেন। বেশির ভাগই এক ক্লাসের ছাত্র। এ এস এম কিবরিয়াসহ কয়েকজন সিনিয়র ছিলেন।’

রাজনীতির ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ কী? জানতে চাইলে মুহিত বলেন, ‘গত কয়েক দিনের ঘটনা যদি দেখি, বলব—তা ভালো। তবে তার আগ পর্যন্ত এটা অদ্ভুত ধরনের রাজনীতি ছিল। কারণ এটা পরিষ্কার যে বিএনপি যদি এবার রাজনীতিতে থেকে নির্বাচন না করে, এটা আর পার্টি থাকবে না। কাজেই আমার নিজস্ব অভিমত হলো—বিএনপিকে এবার নির্বাচন করতেই হবে। কাজেই ফখরুল ইসলাম-রিজভী সাহেব যা-ই বলুন না কেন, এটা বোগাস কথাবার্তা—নির্বাচনে অংশ নিতে বিএনপি প্রস্তুত। সবাই নির্বাচনে অংশ নেবে—এটা সত্য হতে যাচ্ছে। সবাই নির্বাচনে যাবে, এটা শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে সব সময় তাঁর বদ্ধমূল চিন্তা, তিনি সব সময় কোয়ালিশনের পক্ষে যাবেন—তিনি সব সময় চেষ্টা করেন সবাইকে নিয়ে কাজ করতে। আমাদের কোয়ালিশন নির্ধারিত। মোর অর লেস যাঁরা ছিলেন, আগে তাঁরা থাকবেন। নতুন এলেও আসতে পারে। আমার ধারণা, আগামী নির্বাচনটা খুব ভালো নির্বাচন হবে। একটি বিষয়ে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে এ নির্বাচনে জালিয়াতি হবে না। এই যে আইডি কার্ডের ব্যবস্থা করা হয়েছে, তারপর যেসব সৈন্যসামন্ত, নিরাপত্তার ব্যবস্থা আছে এগুলো ভালো।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে ড. কামাল হোসেনের ভূমিকাকে কিভাবে দেখছেন—প্রশ্ন করলে কিছুক্ষণ নীরব থেকে মুহিত বলেন, ‘ড. কামাল হোসেন সম্পর্কে আমার বক্তব্য হলো, উনি বিএনপির নেতৃত্ব দিচ্ছেন—এটা ওনার করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি।’

ভোটের আগে সবাই জোটে আসে। এটা নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি। সেটা কি লুটপাটের রাজনীতি নয়? এ প্রসঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মোস্ট জুনিয়র পার্টিও অ্যালায়েন্সে আসে। নেতারা রাজনীতিবিদ হয়ে রাজনীতিকে ব্যবহার করেন লুটপাটে। আমাদের দেশে লুটপাটের বিষয়টি বড়। তার একটা কারণ আমি রিমুভ করেছি। একটা কারণ ছিল দারিদ্রতা। এর অ্যাফেক্টটা ইমিডিয়েটলি হচ্ছে না—হবেও না। আমি মনে করি, লুটপাটের রাজনীতি চলে যাবে, তবে সময় লাগবে। কিন্তু রাজনীতিতে কিছু লুটপাট সব সময় থাকবে। মিসইউজ অব পাওয়ার—সেটা থাকবেই। তরুণরা আশাবাদী হতে পারো—রাজনীতিতে লুটপাটকারীর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হয়ে যাবে।’

কত দিন লাগবে—প্রশ্ন করলে মুহিত বলেন, ‘১০ বছর সময় লাগবে।’

বর্তমান সরকারের অর্জন বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আই অ্যাম ভেরি হ্যাপি। আমি মনে করি, এই সরকারের ধারাবাহিকতা থাকা উচিত। শেখ হাসিনা সরকারের আরেক টার্ম আসা উচিত। ২০২৪ সাল পর্যন্ত যদি আমরা এভাবে চলতে পারি, তাহলে লক্ষ্যের দিকে এগিয়েই যাব।’

নিজের পরিকল্পনা থেকে করা জেলায় জেলায় সরকার একসময় হবে বলে মনে করেন মুহিত। বললেন, ‘জনসংখ্যা তো বাড়বে। আমি আগে চেয়েছি—এটা পরে হবে। জেলা বাজেট আই হ্যাভ ডান ইট। জেলা বাজেট বিষয়ে নির্দেশনা তৈরি করা আছে। আমার উদ্দেশ্য সফল।’

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT