২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

যুব গেমসে উন্মোচিত সত্য

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৩, ২০১৮, ৭:২৭ অপরাহ্ণ


রানিং শু নেই। অ্যাথলেটরা খালি পায়ে দৌড়াচ্ছে ঘাসে ঢাকা এবড়োখেবড়ো ট্র্যাকে। সাঁতারপুল নেই। সাঁতারুরা সাঁতরাচ্ছে পুকুরে। কাবাডি বা তায়কোয়ান্দোর জন্য ম্যাট নেই? সমস্যা নেই, খোলা মাঠ তো আছে। বক্সিং রিং নেই, মাঠে প্রতিযোগিতা চলছে দড়িঘেরা বর্গক্ষেত্রে।

জানা ছিল অনেক জেলায় এমনটাই হবে। আন্ত-উপজেলা প্রতিযোগিতার জন্য উন্নত অবকাঠামো তো আর সব জেলায় পাওয়া যাবে না! প্রতিযোগিতা মাঠে নামানোই এখানে বড় সাফল্য। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর সহযোগিতায় সেই কাজটা করেছে যুব গেমসের প্রথম পর্বে। তিন পর্বে অনুষ্ঠেয় যুব গেমসের প্রথম পর্ব অর্থাৎ জেলা সদরে সপ্তাহব্যাপী আন্তজেলা প্রতিযোগিতা শেষ হলো গত ২৪ ডিসেম্বর। বাংলাদেশের ইতিহাসে তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রথমবারের মতো আয়োজিত বহু খেলা সমন্বিত গেমস। এই ‘প্রথমের’ আয়োজক বিওএকে এ কারণে প্রথমেই জানাতে হয় অজস্র অভিবাদন। নানাভাবেই সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক সাহায্য আছে যুব গেমসে। কিন্তু সরকার তো আগে এমন আয়োজনের কথা ভাবেনি! আর অনূর্ধ্ব-১৭ বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের এই জাতীয় প্রতিযোগিতা একটি নগ্ন সত্যকেও তুলে আনল বলে আরেকবার অভিবাদন বিওএকে। কী সেই সত্য?
তৃণমূলে খেলাধুলার চর্চা হারিয়ে যেতে বসেছে। সত্তর-আশির দশকে ক্রীড়া বিপ্লবের আকারে ছড়িয়ে পড়া আন্তস্কুল-আন্তকলেজ প্রতিযোগিতার মধুর স্মৃতিগুলো এখন জাদুঘরে বন্দী। যুব গেমস সারা দেশে আবার ক্রীড়া উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে দিল। ছড়িয়ে না দিলেও অন্তত ছড়িয়ে দিতে তো চাইছে! সরকারি তরফে অনেক আগেই হওয়া উচিত ছিল এই কাজটা। দেশে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় আছে। পূর্ণ মন্ত্রণালয় নয়, তবু মন্ত্রী আছেন দুজন। একজন প্রতিমন্ত্রী, একজন উপমন্ত্রী। আছে ৮টি করে বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থা ও বিভাগীয় মহিলা ক্রীড়া সংস্থা, ৬৪টি করে জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থা এবং আপাতত ৪৯০টি উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা। আশা করা যায় দ্রুতই নবগঠিত উপজেলাগুলোর ক্রীড়া সংস্থাও গঠিত হবে। সরকার স্বীকৃত ক্রীড়া ফেডারেশন ও অ্যাসোসিয়েশন আছে ৪৮টি। ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ফেডারেশন এবং স্থানীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোর ওপর সমন্বয় ও নিয়ন্ত্রণের ছাতা ধরে আছে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। আছে সরকারি আরও দুটি প্রতিষ্ঠান-বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) ও ক্রীড়া পরিদপ্তর। বিকেএসপি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে খেলা শেখায় ছাত্রদের, ক্রীড়া পরিদপ্তর উপজেলায় উপজেলায় গিয়ে খেলা শেখায়।
খেলাধুলায় আগ্রহী প্রজন্ম তুলে এনে তাদের পরিচর্যার জন্য বাংলাদেশ বিছিয়েছে ক্রীড়া প্রশাসনের বিস্তৃত জাল। পৃথিবীর আর কোনো দেশে বোধ করি এমনটি নেই। কিন্তু খেলোয়াড় উঠে আসছে না কেন? বাংলাদেশ এখনো কেন অলিম্পিক পদকবিহীন সবচেয়ে জনবহুল দেশ হিসেবে লজ্জার মালা গলায় পরে আছে? খেলাধুলার বন্যায় ভেসে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া-ব্রিটেনের মতো ক্রীড়া জাতি হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার কথা বাংলাদেশের! কিন্তু বাস্তবতা হলো তৃণমূলে ক্রিকেট ছাড়া অন্য খেলাধুলায় কিশোর-কিশোরীদের আগ্রহ একবারেই তলানিতে। জাতীয় যুব গেমস করতে গিয়ে এটিই সবাইকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিওএ।
সর্বজনীন খেলা ফুটবলে ৪৯০টি উপজেলার মধ্যে দল গড়তে পেরেছে মাত্র ৩৬০টি উপজেলা। ১৩০ উপজেলা ফুটবলে দল দিতে পারেনি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৮৮টি করে উপজেলা তালিকাভুক্ত হয়েছে অ্যাথলেটিকস ও সাঁতারে। ক্রিকেট বাদে ২১ খেলার এই ক্রীড়াযজ্ঞে বাদ বাকি খেলাগুলোর অবস্থা আরও করুণ। অনূর্ধ্ব-১৭ বছর বয়সীদের খেলা মানে স্কুল-কলেজগুলোই মূল কেন্দ্র। তাহলে ধরে নিতে হবে স্কুল-কলেজে খেলার চর্চা বাড়াতে উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলো কিছু করছে না। জেলা ও বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলোই বা করছে কী? এই যে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা নামে একগুচ্ছ কর্মকর্তা আছেন, তাঁদের কাজেরই বা জবাবদিহি কোথায়? প্রশ্নের পাহাড় জমে, উত্তর নেই।
ভবিষ্যতের বড় স্বপ্ন এঁকে খেলায় (ক্রিকেট বাদে) আসতে আগ্রহী হয় না তরুণ প্রজন্ম। খেলাকে বৃত্তি হিসেবে বেছে নেওয়ার সাহস তাদের নেই। খেলোয়াড়দের পুরস্কার দেওয়ার জন্য বসে থাকে সরকার, ক্রীড়া সাংবাদিকদের সংগঠন এবং সংবাদমাধ্যম। কৃতী খেলোয়াড় পাওয়া যায় না। অনেক সময় পুরস্কার দেওয়ার জন্যই পুরস্কার দেওয়া হয়। আসলে খেলোয়াড় উঠে আসার স্বতঃস্ফূর্ত ধারাটিই তো শুকিয়ে গেছে। আর শয়ে শয়ে হাজারে হাজারে খেলোয়াড়ই যদি উঠে না আসে, খেলার মান বাড়বে কোত্থেকে?
যুব গেমসের উপজেলা পর্যায়ের মান যে ভালো হবে না এটা সবারই জানা ছিল। কারণ অনেকেই খেলাধুলার অ-আ-ক-খ শিখে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা নয়, অংশগ্রহণই বড় কথা’-অলিম্পিকের এই মর্মবাণীর রূপায়ণ হয়েছে এখানে। কিছু কিছু উপজেলায় অবশ্য বিকেএসপির প্রশিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরা অংশ নেওয়ায় অসম প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে। বিওএ এই বিষয়টি খেয়াল করলে আন্ত-উপজেলা প্রতিযোগিতায় অন্তত সমতা ধরে রাখা যেত। ৬ জানুয়ারি থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেএসপির ছেলেমেয়েদের অংশগ্রহণের অনুমতি দিলেই ভালো হতো। এই পর্যায় থেকেই হয়তো প্রতিযোগিতার মান একটু ভালো হবে। পাতে দেওয়ার মতো মানটা পাওয়া যেতে পারে ৯-১৭ মার্চ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় জাতীয় প্রতিযোগিতায়।
আদতে মান কোনো বিষয় নয়। মূল কথা হলো বিওএ সারা দেশে তরুণদের জন্য এই গেমস শুরু তো করতে পারল। যেকোনো কিছুর শুরুতে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকে। এখানেও নিশ্চিত করেই থাকবে। তবে উদ্দেশ্য সৎ থাকলে ভবিষ্যতে এসব শুধরে নেওয়া যাবে। বিওএকে এই গেমসের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে অটল থাকতে হবে। এটি যেন প্রথম ও শেষ আয়োজন হিসেবে স্মৃতিবন্দী না হয়ে পড়ে। বিওএ কর্মকর্তারা অবশ্য বলেছেন, এটিকে চতুর্বার্ষিক আয়োজন হিসেবে বার্ষিক ক্রীড়াপঞ্জিতে জায়গা দেওয়া হবে। তবে ক্রীড়াপ্রেমী জনতার দাবি, আয়োজনটা হোক দ্বিবার্ষিক। কেননা দুটি গেমসের মাঝে চার বছর বেশ বড় ব্যবধান। ব্যবধান দুই বছর হলে তৃণমূলের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা সজীব থাকবে। তাদের মনের মধ্যে একটা উৎসবের আবহ তৈরি হবে। তাতে স্মার্টফোনের পর্দায় তাদের চোখ আটকে থাকবে না। মাদকের নিষিদ্ধ হাতছানিও হয়তো তারা উপেক্ষা করতে পারবে।
জেলায় জেলায় খোঁজ নিয়ে আয়োজকদের মাধ্যমে জানা গেছে, যুব গেমস প্রথম আয়োজনেই গ্রামীণ জনপদে উৎসবময়তা এনেছে। খেলা নিয়ে সারা দেশে এই উৎসবের আবহ তৈরি হওয়াটা খুবই কাঙ্ক্ষিত। একসময় উৎসব থেকে খাঁটি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। প্রতিদ্বন্দ্বিতা বের করে আনবে প্রতিভাধর খেলোয়াড়। রাশি রাশি, সার বেঁধে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT