১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

মানুষখেকো সড়ক

প্রকাশিতঃ আগস্ট ৩০, ২০১৮, ১২:২৬ অপরাহ্ণ


দিন দিন মানুষখেকো হয়ে উঠছে বাংলাদেশের সড়ক-মহাসড়কগুলো। প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে সড়কপথে মৃত্যুর মিছিল। এ মিছিল ঠেকানোর দায়িত্ব নিচ্ছে না কেউই। প্রতিদিনকার মৃত্যু যেন সওয়া হয়ে গেছে সবার। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি)-এর জরিপ মতে বছরে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন ২৩ হাজার ১৬৬ জন। সে হিসাবে গড়ে প্রতিদিন এ সংখ্যা দাঁড়ায় ৬৪ জনে। গত বছর ১৫ ফেব্রুয়ারি ডয়েচে ভেলেতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানা যায়।

বেসরকারি সংস্থা সিআইপিআরবি ২০১৬ সালে ওই জরিপ পরিচালনা করে। তারা জানায়, দেশে বিভিন্ন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যার মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হারই সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রকাশিত তথ্য মতে, গত বছর সারা দেশে ৪ হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৭ হাজার ৩৯৭ জনের। আহত হন ১৬ হাজার ১৯৩ জন। আহতদের মধ্যে পঙ্গু হয়েছেন এক হাজার ৭২২ জন। চলতি বছরের ১২ জানুয়ারি সংগঠনটি এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা জানিয়েছে, এ আগের বছর ২০১৬ সালের তুলনায় ২০১৭ সালে হতাহতের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার পরিমাণ বেড়েছে ১৫.৫ শতাংশ।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট তাদের গবেষণায় বলছে, প্রতিবছর এ দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন গড়ে ৮ হাজার। আর আহত হচ্ছেন অন্তত ৫০ হাজার মানুষ। এর মধ্যে পঙ্গুত্ববরণ করছেন অধিকাংশই। তাদের হিসাবে প্রতিদিন সড়কে প্রাণ ঝরছে ২১ জনের বেশি মানুষের।

সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে দেশে বর্তমানে নিবন্ধিত যানবাহন রয়েছে প্রায় ২১ লাখ। এর মধ্যে মোটরসাইকেল ১১ লাখ, বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ অন্যান্য পরিবহন রয়েছে ১০ লাখ। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএ থেকে দেওয়া লাইসেন্সের সংখ্যা ১৪ লাখ ৩১ হাজার। সে হিসাবে ফিটনেসবিহীন গাড়ির সংখ্যা তিন লাখের মতো। এক তথ্যে জানা যায়, ২০১৭-এর মার্চ থেকে ২০১৮-এর মার্চ পর্যন্ত এক বছরে সারা দেশে সিলিন্ডার বিস্ফোরণে মারা গেছেন ৩২ জন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজিসহ পরিবহন খাতের চরম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনার কারণেই সড়ক দিন দিন মৃত্যু উপত্যকা হয়ে উঠছে। এ দেশে সড়কে মানুষ হত্যার কোনো বিচার হয় না বলেই খুনি চালক, হেলপার এবং এর সঙ্গে জড়িত মালিক, ব্যবসায়ী, শ্রমিক নেতাদের কোনো কঠোর সাজার বিধান নেই।

সম্প্রতি নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশের কিশোর শিক্ষার্থীদের অভূতপূর্ব বিক্ষোভের পর সরকার বাধ্য হয়েছে বিদ্যমান পরিবহন আইন সংস্কার করতে। দুই বছর বাড়িয়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে সড়ক পরিবহন আইনের খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সংসদের আগামী অধিবেশনে এ আইনটি তোলা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সরকার। কিন্তু আইনের এ সংস্কার সন্তুষ্ট করতে পারেনি সাধারণ মানুষকে। অনেকের দাবি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল চালক বা হেলপারই ঘটায় না। উপর্যুপরি দুর্ঘটনার সঙ্গে পুরো পরিবহন ব্যবস্থাই দায়ী। এর সঙ্গে পরিবহন মালিক, শ্রমিক নেতা, সরকারি-বেসরকারি আমলারাও দায়ী। তাই পরিবহন আইনে সব ধরনের দুষ্কৃতকারীর শাস্তির বিধান রাখা দরকার ছিল। অনেকেই পরিবহন আইনকে সড়ক নিরাপত্তা আইনে পরিণত করারও দাবি জানিয়েছেন।

আবার সংশ্লিষ্ট অনেকের প্রশ্ন আইন করে কি সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাবে? আইন বাস্তবায়নের জন্য যে মানসিকতা, রাজনৈতিক ও সামাজিক সততার প্রয়োজন তা কারোরই নেই। এ খাতে দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এমনকি রাজনৈতিক দলগুলোও জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। অধিক মুনাফার লোভে পরিবহন মালিকরা ফিটনেসবিহীন পরিবহন রাস্তায় নামাচ্ছেন। সে পরিবহন চালানোর জন্য নিয়োগ দিচ্ছেন অযোগ্য অদক্ষ চালক-হেলপারদের। অদক্ষ চালক-হেলপাররা আবার কোনো না কোনো শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। সেসব শ্রমিক সংগঠন প্রতিদিনই চাঁদা তুলছে মালিক ও শ্রমিকদের কাছ থেকে। একইভাবে চাঁদার ভাগ চলে যাচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের পকেটেও। ফলে মালি- শ্রমিকের অনিয়ম-দুর্নীতি বৈধ হয়ে যাচ্ছে সর্বত্র। শুধু তাই নয়, সব সময় বেপরোয়া গাড়ির চালক-হেলপার, মালিককে রক্ষা করার জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকে পুরো ব্যবস্থা। এমনকি বিদ্যমান আইনও তাদের অনুকূলে রয়েছে বলে অভিযোগ অনেকের। কারণ আইনে গাড়ি চাপায় মৃত্যুর সর্বোচ্চ শাস্তি রাখা হয়েছে মাত্র পাঁচ বছর।

বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট বলছে, সড়কে দুর্ঘটনার কোনোটিতেই ঘাতক গাড়িচালক ও মালিকদের শাস্তি পেতে হয়েছে এমন নজির নেই। এমনকি দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি কয়েক ঘণ্টার বেশি আটকও রাখা যায়নি কখনো। আইন ও ব্যবস্থার এত সব সুবিধার কারণে সড়কে চালকরা হয়ে পড়ে বেপরোয়া। পল্লী পাঠশালা গবেষণা কেন্দ্র (পিপিআরসি) ও ব্যাকের একটি যৌথ গবেষণায় সড়ক দুর্ঘটনার জন্য ৯টি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে চালকের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, গাড়ি চালনায় প্রশিক্ষণের অভাব, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ট্রাফিক আইনের দুর্বল প্রয়োগ, একই সড়কে বিভিন্ন গতির যান চলাচলের অনুমোদন, সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা, সড়কের পাশে ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকা-, সড়ক নিরাপত্তার বিষয়ে চালক ও যাত্রীর সচেতনতার অভাব ও পথচারীর ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ। এছাড়া দুর্ঘটনা ঘটিয়ে চালকদের অবলীলায় পার পেয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি এবং লঘু শাস্তির বিধানই দুর্ঘটনায় চালকদের প্ররোচিত করছে বলে বলা হয়েছে ওই গবেষণায়।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চালক-হেলপারদের মধ্যে বদ্ধমূল ধারণাই জন্মেছে রাস্তায় মানুষ মারলে ২০ হাজার টাকা আর পঙ্গু হলে ৫ হাজার টাকা জরিমানা দিয়ে পার পাওয়া যায়। এছাড়া ফিটনেসবিহীন বা লাইসেন্সবিহীন গাড়ি ধরলে ট্রাফিক সার্জনের হাতে ঘুষ গুঁজে দিলেই পার পাওয়া যায় সড়কে। কোনো কারণে চালকের সাজা হলে তাদের রক্ষার জন্য প্রতাপশালী শ্রমিক সংগঠন বা নেতারা সাধারণ মানুষকে জিম্মি করেন কথায় কথায়। এত সব নৈরাজ্যের কারণে সড়কে মৃত্যুর মিছিল থামছে না বলেই মত বিশ্লেষকদের।

খোলা কাগজের এক হিসাবে চলতি আগস্টের ১ তারিখ থেকে গতকাল ২৯ আগস্ট পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন অন্তত ২২০ জন। তার মধ্যে মাসের প্রথমার্ধে মারা গেছেন ৮৪ জন। দ্বিতীয়ার্ধে গতকাল পর্যন্ত আরও ১৩৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কোরবানির ঈদের ছুটিতে (২১ থেকে ২৪ আগস্ট) দেশের বিভিন্ন জেলায় মারা গেছেন অন্তত ২৮ জন। তার আগে ১৫ আগস্ট ৫ জন, ১৬ আগস্ট ৬, ১৭ আগস্ট ৬, ১৮ আগস্ট ৭, ১৯ আগস্ট ৫, ২০ আগস্ট ২২ জন মারা গেছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। ঈদের পর ২৫ আগস্ট নাটোরে নিয়ন্ত্রণহীন বাসের চাপায় একসঙ্গে মারা গেছেন ১৫ লেগুনাযাত্রী। ২৬ আগস্ট মারা গেছেন ৭, ২৭ আগস্ট ১১, ২৮ আগস্ট ১৩ এবং গতকাল ২৯ আগস্ট ১২ জন।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT