১৯শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

মহানবী (সা.) হিন্দুস্থানকে জানতেন

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ১১, ২০১৮, ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ


একদিন দূর থেকে কিছু লোক মদিনায় আসে ইসলাম গ্রহণের জন্য। নবীজি তাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? এদের দেখতে তো হিন্দুস্থানি লোকদের মতো দেখা যাচ্ছে! হুবহু এমন শব্দ হাদিসে এসেছে। এমন কথা তিনিই বলতে পারেন, যিনি এর আগে হিন্দুস্থানিদের দেখেছেন, তাদের পোশাকও। ওইসব লোক মূলত ইয়েমেনের একটি গোত্রের ছিল। তারা ইসলাম গ্রহণের আশায় মদিনায় এসেছিল

সিন্ধুর সঙ্গে সম্পৃক্ত নবীজীবনের দু-একটি বিষয় মনে পড়ছে। একটি বিষয় হলো মুহাম্মদ (সা.) এর জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, নবীজীবনের সঙ্গে নয়। অর্থাৎ নবীজি (সা.) ওহি লাভের আগের কথা। ওই সময়কার ইতিহাস থেকে অনুমেয় যে, তিনি অন্তত সিন্ধু সম্পর্কে অবগত ছিলেন। সিন্ধি লোকদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল, চাই সরাসরি সিন্ধু আসা নাইবা হোক।
নবীজীবনী পাঠ করেন এমন সবারই জানা কথা, নবীজি (সা.) দু-বার শাম বা সিরিয়ায় গিয়েছিলেন। তেমনিভাবে আমাদের ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেন, অন্ততপক্ষে দু-বার তিনি ইয়েমেনও গিয়েছিলেন। আর একথারও আমাদের কাছে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, পূর্ব আরবের বাহরাইন ও ওমান অঞ্চলেও তিনি একবার সফর করেছিলেন। এও সম্ভাবনা আছে, নবীজি (সা.) হাবশা বা ইথিওপিয়া সফরে গিয়েছিলেন। যদিও এ কথার পক্ষে দৃঢ় কোনো প্রমাণ নেই। এর কারণ, আমি অনুসন্ধানী দৃষ্টিকোণ থেকে আপনাদের বলছি, নবীজি (সা.) সময় সময় ইথিওপিয়ান ভাষার কিছু শব্দ ব্যবহার করতেন। লিখিত আছে, মক্কার মুহাজির সাহাবিরা যখন ইথিওপিয়া থেকে ফিরে এলেন, তখন একটা ছোট্ট মেয়ে তাদের সঙ্গে ছিল, ওর জন্ম ওখানেই হয়েছিল; ইথিওপিয়ান ভাষায় কথা বলত। নবীজি সে মেয়ের সঙ্গে কয়েকটি ইথিওপিয়ান শব্দ ব্যবহার করেছিলেন। আর তা তখনই সম্ভব, যখন কোনো ব্যক্তি ওই দেশে গিয়ে থাকেন এবং পর্যটক হয়েও সেখানকার কিছু শব্দ তিনি স্মরণ রাখেন। এর সমর্থনে আরেকটি প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। নবীজি (সা.) নাজাশিকে নির্বাচিত করেছিলেন, মক্কার বিপদগ্রস্ত মুসলমানরা জন্মস্থান ত্যাগ করে মদিনায় হিজরতের আগে তার দেশ ইথিওপিয়ায় গিয়ে আশ্রয় নেবেন। বস্তুত নবীজি নাজাশির কাছে চিঠি লিখলেন। সে চিঠিতে লেখা ছিল, ‘আমার চাচাতো ভাই জাফর ইবনে আবি তালিব আসছে। ওর সঙ্গে আরও কয়েকজন মুসলমান আছে। তারা যখন পৌঁছবে আপনি তাদের মেহমানদারি করবেন।’ এখানে কিন্তু একরকম ঘনিষ্ঠতাপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এটা তখনই সম্ভব, যদি ওই ব্যক্তির পূর্বপরিচিতি ও সাক্ষাৎ হয়ে থাকে। সুতরাং এসব থেকে উদ্ঘাটিত হয় যে, নবীজি (সা.) হয়তো ইথিওপিয়াও সফর করেছিলেন। তো যেখানে তিনি এতগুলো দেশ সফর করলেন, সেখানে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, ব্যবসার কাজে তিনি হিন্দুস্থান ও সিন্ধুতেও এসেছিলেন।
মুসনাদে আহমাদ হাদিসের একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.) ওই ব্যক্তি, যিনি ইমাম বোখারি (রহ.) এর ওস্তাদ। তিনি প্রায় দুই পৃষ্ঠাব্যাপী একটি দীর্ঘ হাদিস বর্ণনা করেছেন। এতে রয়েছে, একবার আবদুল কায়স গোত্রের কিছু লোক ইসলাম গ্রহণের লক্ষ্যে মদিনায় এলো। নবীজি (সা.) তাদের বিভিন্ন জিনিসের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলেন। যেমন, অমুক শহর কি এখনও বিদ্যমান আছে? অমুক সরদার? অমুক ব্যক্তি কি এখনও জীবিত আছেন? নবীজির এ ধরনের প্রশ্ন শুনে লোকেরা অবাক হয়ে গেল। তারা বলল, হে আল্লাহর নবী! আপনি তো দেখা যায় আমাদের দেশ ও দেশের লোক সম্পর্কে স্বয়ং আমাদের থেকেও বেশি জানেন! এটা কীভাবে সম্ভব হলো? তাদের এমন প্রশ্নের উত্তরে নবীজি বলেছিলেন, “আমি ওখানে গিয়েছিলাম। ওখানকার ভূমিতে বহুদিন আমার পদচারণ হয়েছিল। ‘মাশকার’ দুর্গের চাবিও আমার হাতে এসেছিল। ‘জারাহ’ ঝরনার পাশেও আমি দাঁড়িয়েছিলাম।’ এসব জায়গা আজও বহাল তবিয়তে আছে। মাশকার ও জারাহ আরবের পূর্বদিকে অবস্থিত। আজকাল সেখানে পেট্রলের ঝরনা প্রবহমান। এটা মূলত আরবের পূর্বাঞ্চলে নবীজির ভ্রমণের আলোচনা; যা মুসনাদে আহমাদের মতো হাদিসের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে বিবৃত হয়েছে।
এ বিষয়ে দ্বিতীয় আরেকটি বর্ণনা আমাদের অবগতিতে এসেছে। তবে সেটা হাদিসগ্রন্থ থেকে নয়। ইতিহাসবিষয়ক গ্রন্থ থেকে। ইবনে হাবিব একজন প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ছিলেন। ২৪৫ হিজরিতে তার মৃত্যু হয়। ‘আল মাহবার’ নামে তার একটি বই আছে। বইয়ে ‘আরবের মেলা’ শিরোনামে একটি অধ্যায় আছে। সে অধ্যায়ে প্রতি বছর আরবের যে মেলাগুলো বসত, সেগুলোর বিবরণ রয়েছে। ইবনে হাবিব লেখেন, আরবের পূর্বাঞ্চলে ‘বাদা’ নামক একটি জায়গা আছে। জায়গাটি এখনও আছে। ইউনাইটেড আরব এমিরেটসের ফুজায়রা এয়ারপোর্টের উত্তর দিকে তা অবস্থিত। ইবনে হাবিব বলেন, ওই জায়গায় প্রতি বছরের নির্দিষ্ট তারিখে মেলা বসত। রকমারি জিনিসপত্র বিক্রির জন্য নিয়ে আসা হতো। বিভিন্ন দেশের লোকজন সমবেত হতো। যেমন হিন্দুস্থান, সিন্ধু, চীন, ইরান, রোম তথা পূর্ব-পশ্চিমের বহু দেশ থেকে লোকজন আসত। কথাগুলো আমি ওই বই থেকে হুবহু অনুবাদ করে আপনাদের শোনাচ্ছি। সেখানে সিন্ধু শব্দটি স্পষ্টাক্ষরে লিখা আছে। এই তথ্যের আলোকে অনুমান করা যেতে পারে, নবীজি (সা.) স্বীয় স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) এর ব্যবসায়িক পণ্য নিয়ে ওখানে গিয়েছিলেন। ওখানে চীনের লোকদের সঙ্গে, সিন্ধি লোকদের সঙ্গে এবং অন্যান্য অঞ্চলের লোকদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়েছিল।
এখানে অবান্তরতাস্বরূপ আরেকটি কথা বলছি যে, লোকমুখে প্রসিদ্ধ হাদিস, ‘তোমরা জ্ঞান অর্জন করো, চীন দেশে গিয়ে হলেও।’ এর কারণ সম্ভবত এই যে, নবীজি (সা.) বাদার ওই মেলার বাজারে চীন দেশের ব্যবসায়ীদের কাছে তাদের পেশকৃত উন্নতমানের জিনিসপত্র দেখেছিলেন। যেমন, রেশম এবং আল্লাহ জানেন আরও কত কিছু! আর এখান থেকেই নবীজির মনে এসেছে যে, চীন দেশীয় শিল্প অনেক উন্নতমানের। ফলে তিনি সাধারণভাবে এটা বলে দিলেন যে, তোমরা জ্ঞান শেখ। এর জন্য প্রয়োজনে তোমরা চীন দেশ সফর করো। সম্ভবত নবীজি তাদের জিজ্ঞেস করেছিলেন, আপনারা কতদূর থেকে এসেছেন? তারা হয়তো বলেছিল, আমরা প্রায় দুই মাসের পথ অতিক্রম করে এখানে পৌঁছেছি।
তখনকার সময়ে তো রেলগাড়ি আর উড়োজাহাজ ছিল না। এই কাহিনী থেকে অনুমান হয় যে, নবীজি (সা.) সিন্ধি লোকদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। সম্ভাবনা আছে, হয়তো পরে ব্যবসার লক্ষ্যে তিনি সিন্ধুও গিয়েছিলেন। আমার এ দাবির সত্যতা ভিন্ন আরেক হাদিস থেকেও মেলে। একদিন দূর থেকে কিছু লোক মদিনায় আসে ইসলাম গ্রহণের জন্য। নবীজি তাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? এদের দেখতে তো হিন্দুস্থানি লোকদের মতো দেখা যাচ্ছে! হুবহু এমন শব্দ হাদিসে এসেছে। এমন কথা তিনিই বলতে পারেন, যিনি এর আগে হিন্দুস্থানিদের দেখেছেন, তাদের পোশাকও। ওইসব লোক মূলত ইয়েমেনের একটি গোত্রের ছিল। তারা ইসলাম গ্রহণের আশায় মদিনায় এসেছিল। এভাবে সিরাতে মুহাম্মদিতে সিরাতুন্নবীর আগে অর্থাৎ তিনি নবী হওয়ার আগেই সিন্ধুর আলোচনা চলে আসে।

১৯৮৪ সালে সিন্ধু ইউনিভার্সিটিতে ড. মুহাম্মাদ হামিদুল্লাহ (রহ.)
প্রদত্ত উর্দু ভাষণের সংক্ষেপিত ভাষান্তরÑ মাহফুয আহমদ

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT