২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

মসজিদে আকসার প্রতি মুসলিম উম্মাহর দায়িত্ব

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৩, ২০১৮, ৭:২৮ পূর্বাহ্ণ


মসজিদে আকসা তার ইতিহাস, ঐতিহ্য আর গৌরবগাথা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের অনুভূতি জ্বালিয়ে দেয়। শিরক ও ভ্রান্তি থেকে একে পবিত্র করতে ও তার পাশে দাঁড়াতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে জোরদার করে। আল কুদসের বিষয়টি ইসলাম ধর্মের সবার মনে জীবন্ত হয়ে থাকবে। শত্রুদের মিথ্যাচার ও বিরোধীদের অস্বীকৃতি আমাদের এ বিশ্বাসকে টলাতে পারবে না

আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রজনিতে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত। যার পরিবেশ আমি বরকতময় করেছি, তাঁকে আমার নিদর্শন দেখাতে।’ (সূরা ইসরা : ১)। আল্লাহ নিজেকে এমন ক্ষমতা ও শক্তি দিয়ে মহিমান্বিত করেন, নিজের মর্যাদাকে সমুন্নত করেন, যা আর কারও পক্ষেই সম্ভব নয়। তাঁর কুদরত প্রকাশিত হয়েছে সেই বিস্ময়কর ভ্রমণে ও অলৌকিক মোজেজার ঘটনায়, যা বিবেক-বুদ্ধিকে হতবাক ও অভিভূত করে দিয়েছে। কারণ তা ছিল মানুষের পরিচিত চিন্তার ঊর্ধ্বে। সেই ভ্রমণ হলো আল্লাহর রাসুল (সা.) এর মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্ত বিশাল দূরত্বের ভ্রমণ। সেখানে তিনি আল্লাহর বিরাট নিদর্শন ও প্রতিপালকের অসীম ক্ষমতার প্রতাপ প্রত্যক্ষ করেন। তারপর একই রাতে ফিরে আসেন।
মেরাজ নবুয়তের অন্যতম বৃহৎ নিদর্শন ও অনেক বড় মুজেজা। এতে নিহিত আছে প্রজ্ঞা, বিধান ও মহান তাৎপর্যম-িত বিভিন্ন শিক্ষা। মসজিদে হারাম থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস পর্যন্ত এ ভ্রমণকে আল্লাহ তাঁর প্রিয় বন্ধু মুহাম্মদ (সা.) এর জন্য বিশেষভাবে নির্ধারণ করেছেন। বাইতুল মুকাদ্দাস নবীদের নবুয়তের ভূমি, প্রথম কেবলা। এটি আমাদের নবীর জন্য সম্মান, মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়। তাঁর অবিচলতা ও সংকল্পের নবায়ন। এ ভ্রমণ আল্লাহর একটি জীবন্ত মোজেজা, যা মহামানবকে ঊর্ধ্বজগতে বহন করে আবার পৃথিবীতে ফিরিয়ে এনেছে। গোটা মহাবিশ্ব মহান আল্লাহর নিয়ন্ত্রণে। তিনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। তিনি ছাড়া আমাদের কোনো পালনকর্তা নেই।
মেরাজের ঘটনায় ইসলামের মহত্ত্ব উদ্ভাসিত হয়। ইসলাম ধর্মে আল্লাহ পূর্ববর্তী সব শরিয়তের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। ইসলাম সব শরিয়তের উপসংহার। মেরাজের সফর নবীদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সুদৃঢ় করে দিয়েছে। তাদের সবার পয়গাম একটিই। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখনই কোনো আসমানে অবতরণ করেছেন তাঁকে এ কথা বলে স্বাগত জানানো হয়েছে যে, ‘স্বাগতম হে নিষ্ঠাবান ভ্রাতা ও মহানুভব নবী!’ নবীদের সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘নবীরা পরস্পর আপন ভাই, তাদের মা ভিন্ন ভিন্ন এবং ধর্ম এক। ঈসা ইবনে মরিয়মের ব্যাপারে সব মানুষের চেয়ে আমি বেশি হকদার।’ মসজিদে আকসায় নামাজে নবী করিম (সা.) এর পেছনে সব নবী সমবেত হয়েছিলেন। কেননা তিনি সব নবীর নেতা ও শ্রেষ্ঠ নবীর মর্যাদায় ভূষিত।
আল্লাহর রাসুলকে ঊর্ধ্বাকাশে পরিভ্রমণ করানো হয়। তাঁর ব্যক্তিত্বে প্রতিফলিত আল্লাহর দাসত্ব, বন্দেগি ও ইবাদতের উচ্চ অবস্থানের জন্য তিনি এ পরম সম্মান লাভ করেন। ‘তিনি তাঁর বান্দাকে পরিভ্রমণ করিয়েছেন।’ সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠতম অবস্থান প্রদান করে আল্লাহ তাঁর নবীকে নিজের বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেন। মেরাজ তথা ঊর্ধ্বলোকে গমনের এ ঘটনায় মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি ও মসজিদে আকসার মধ্যে গভীর মজবুত সম্পর্কের পাঠ নিহিত আছে। এতে উম্মাহর প্রতি ইঙ্গিত আছে, যেন মসজিদে আকসার পবিত্রতা, বরকত, সম্মান ও গৌরবের পরিপ্রেক্ষিতে কোনোক্রমেই একে অবহেলা না করা হয়।
আবু জর (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, পৃথিবীতে কোন মসজিদটি প্রথম নির্মিত হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, তারপর কোনটি? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। আমি বললাম, দুটির মাঝে কত বছরের ব্যবধান ছিল? তিনি বললেন, ৪০ বছর। আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মসজিদে হারাম, মসজিদে নববি, মসজিদে আকসাÑ এ তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো মসজিদের জন্য সফরের আনুষ্ঠানিক আয়োজন করা যাবে না।’
মসজিদে আকসা তার ইতিহাস-ঐতিহ্য আর গৌরবগাথা নিয়ে মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের অনুভূতি জ্বালিয়ে দেয়। শিরক ও ভ্রান্তি থেকে একে পবিত্র করতে ও তার পাশে দাঁড়াতে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে জোরদার করে। আল কুদসের বিষয়টি ইসলাম ধর্মের সবার মনে জীবন্ত হয়ে থাকবে। শত্রুদের মিথ্যাচার ও বিরোধীদের অস্বীকৃতি আমাদের এ বিশ্বাসকে টলাতে পারবে না।
মেরাজের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, অসত্যের সেøাগান, প্রচারণা ও দাবি যতই অধিক ও উচ্চকিত হোক, সত্য বিজয়ী ও প্রকাশিত হবেই। মিথ্যার খুঁটি নড়বড়ে, তার অস্তিত্ব দুর্বল, ধ্বংস ত্বরান্বিত, তার ভিত ধ্বংসশীল। আল্লাহ বলেন, ‘বরং আমি সত্য দ্বারা আঘাত হানি মিথ্যার ওপর; ফলে তা মিথ্যাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেয় এবং তৎক্ষণাৎ তা নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।’ (সূরা আম্বিয়া : ১৮)। নবী করিম (সা.) মক্কা বিজয়ের সময় বাইতুল্লাহর ৩৬০টি মূর্তিকে নিজের হাতের লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে বলেন, ‘সত্য এসেছে, মিথ্যা অপসৃত হয়েছে। মিথ্যা তো অপসৃতই হয়ে থাকে।’
মেরাজের অলৌকিক ঘটনা থেকে আমরা এমন উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে পারি, যা প্রতিফলিত হয় বান্দার প্রতি আল্লাহর সাহায্য, তত্ত্বাবধান ও তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে লাভ করে ধন্য হওয়ার মাঝে। এটি তার জন্য, যে আল্লাহর রজ্জু ও পথ নির্দেশ আঁকড়ে ধরে। আল্লাহর এ সান্নিধ্য হলো বান্দাকে হেফাজত করা, সাহায্য করা, সক্ষমতা প্রদান, পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রতিষ্ঠা লাভের সান্নিধ্য। এ সান্নিধ্য মুসলমানদের অঙ্গন রক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ সদাজাগ্রত অতন্দ্রপ্রহরী নিষ্ঠাবান লোকদের ক্ষতের নিরাময় করে। ওত পেতে থাকা কুচক্রী দল জানতে পারে আল্লাহর হুকুম ও বিধান উপায়-উপকরণের ঊর্ধ্বে। ফলে সংখ্যায় অল্প হলেও মোমিনরা বিজয় লাভ করে। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর নির্দেশে অনেক ক্ষুদ্র দল বৃহৎ বাহিনীকে পরাজিত করেছে। আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।’ (সূরা বাকারা : ২৪৯)।
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) সাদ ইবনে আবু ওয়াক্কাস (রা.) কে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা শত্রুর বিপক্ষে অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জামের শক্তি দিয়ে বিজয় লাভ করতে পারবে না। তোমরা বিজয়ী হতে পারবে তোমাদের রবের আনুগত্যের মাধ্যমে আর শত্রুদের পাপের ফলে। যদি পাপের ক্ষেত্রে তোমরা সমান সমান হও তবে অস্ত্রশস্ত্র ও সাজসরঞ্জামের শক্তি বলে তোমাদের ওপর বিজয় লাভ করবে।’
আল কুদস ও মসজিদে আকসা যেহেতু মুসলমানের হৃদয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে, তাই তাদের কর্তব্য হলো, সবধরনের অবমাননা থেকে আল্লাহ যেন একে রক্ষা করেন, সেজন্য কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে মিনতি করা, ফিলিস্তিনবাসীর জন্য বিজয় ও অবিচলতার প্রার্থনা করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কোনো প্রার্থনা করলে তিনি তাকে তা দিয়ে দেন, কিংবা তার তদ্রƒপ কোনো বিপদ দূর করে দেন, যদি সে অন্যায় ও আত্মীয়তা ছিন্ন করার প্রার্থনা না করে থাকে। তখন এক লোক বলল, আমরা যদি বেশি বেশি দোয়া করি? তিনি বললেন, আল্লাহ আরও বেশি দেবেন।’

১১ রবিউস সানি ১৪৩৯ হিজরি মসজিদে
নববির জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত ভাষান্তর
করেছেন মাহমুদুল হাসান জুনাইদ

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT