১৭ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৩রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

ভুয়া জমিতে ঋণ জালিয়াতি

প্রকাশিতঃ মে ২৭, ২০১৮, ৪:০১ পূর্বাহ্ণ


ভুয়া দলিলের ঋণ জালিয়াতি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি আর ঋণ বিতরণকারী ব্যাংকের তদারকি কাজে আসছে না। ব্যাংক ঋণের বিপরীতে গ্রাহকদের জমা দেওয়া মর্টগেজের সিংহভাগ দলিলপত্রই ভুয়া বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। এসব জাল-জালিয়াতির সাথে ব্যাংক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে পরিচালকরা পর্যন্ত জড়িত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তারা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এসব করছেন বলেও সূত্রটি জানিয়েছে।গাজীপুর ও ময়মনসিংহে জমি নিয়ে জাল-জালিয়াতির উৎসব চলছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে একদাগে কয়েক একর জমি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে ভয়ঙ্কর প্রতারণায় নেমেছে একটি চক্র। কখনো ভুয়াদাতায়, কখনো আবার জমির মালিককে না জানিয়েই জাল দলিল করছে তারা। পরবর্তী সময়ে ওই দলিল জামানত রেখেই সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক থেকে বিপুল অংকের ঋণ নেওয়া হচ্ছে। এসব জমি জামানত নিয়ে বিপাকে পড়ছে ব্যাংক। মামলায় জড়িয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন জমির মূল মালিক। আর মোটা অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে জালিয়াত চক্র। তাই কয়েক বছর ধরে এই এলাকার বন্ধক রেখে ঋণ দিতে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করতে নির্দেশ রয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের।বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, নদী, কবরস্থান ও শিকস্তিসহ ৩২৩ বিঘা জমি জামানত রেখে রাজ হাউজিং নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে আড়াইশ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বেসরকারি আইএফআইসি ব্যাংক। একইভাবে জাল দলিল দেখিয়ে ঋণ নেওয়া হচ্ছে অন্যান্য ব্যাংক থেকেও।সম্পূর্ণ ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে ঋণ নিয়ে ইয়াসির গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাহের হোসেন বিদেশে পালিয়ে গেছেন। কয়েকটি ব্যাংক থেকে তিনি ৪৮১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছেন। একইভাবে আরেক ব্যবসায়ী গিয়াসউদ্দিন কুসুম জাহাজভাঙা শিল্পের নাম ভাঙিয়ে ঋণ নিয়ে বিদেশে পালিয়েছেন। সরকারি-বেসরকারি চারটি ব্যাংকের ওই ব্যবসায়ীর কাছে ৩০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এ বিষয়ে ব্যাংকগুলো অর্থ ঋণ আদালতে মামলাও করেছে। তবে ঋণ নিয়ে বিদেশ পাড়ি জমানোয় তাদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে পারছে না ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। সানশাইন এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ ভুয়া দলিল মর্টগেজ রেখে ২০৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে একটি রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের বিশেষায়িত ব্যাংক থেকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন বিভাগের তদন্তে বিষয়টি ধরা পড়ে যে, এই দুষ্কর্মের সঙ্গে ওই ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা জড়িত। এজন্য শীর্ষ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বরখাস্তও করা হয়। কিন্তু রাজনৈতিক পরিচয়ধারী পরিচালকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। নিরুপায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ পুরো টাকাকে ‘অনাদায়ী’ দেখিয়ে চলেছে।রিম্যাক্স লিবার্টি সিটি লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে ১৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকার ঋণ মঞ্জুর করে দ্বিতীয় সারির একটি বেসরকারি ব্যাংক। সাভার এলাকার ছয় দাগে ২১৪ শতাংশ জমির বিপরীতে ওই ঋণ নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক তদন্ত করলে বিষয়টি ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের মালিক মহিউদ্দিন নামে এক ব্যাক্তি আগেই বিক্রি করা একটি জমি ‘বন্ধক’ রেখে এ ঋণ নেওয়ার পাঁয়তারা করেছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে এই ঋণের নগদায়ন আর হয়নি। এদিকে তৃতীয় প্রজন্মের আরেকটি বেসরকারি ইসলামি ব্যাংক থেকে একই জমির ভুয়া দলিল দিয়ে ব্যাংক থেকে ১৭ কোটি টাকা আত্মসাত অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই তদন্ত দেখা যায়, একটি নামিদামি বেসরকারি ব্যাংকের মহাখালী ও দিলকুশা শাখা থেকে জমির দলিলের (সাফ কবালা নং- ২৬২২) বিপরীতে প্রায় ১৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে একটি প্রতারক চক্র। ঋণের বন্ধকী সম্পত্তি ৩৭৪৩ নং দাগের ১ দশমিক ৪৯ একর জমি ‘বন্ধক’ রাখা হয়। কিন্তু জমির কথিত মালিক ঋণের গ্রাহক সানোয়ার কাদেরের অনুকূলে ওই জমির নামজারি হয়নি। যা সম্পূর্ণ ভূয়া বলে মনে করে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই পদ্ধতি অবলম্বন করে নামিদামি কয়েকটি ব্যাংক ও আর্থিকপ্রতিষ্ঠান থেকে শত শত কোটি টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর পরিশোধ করছে না নামসর্বস্ব কিছু শিল্প গ্রুপ। এরা কয়েক বছর ব্যাংকের সঙ্গে স্বাভাবিক লেনদেন করে ভুয়া জমির ও স্থায়ী সম্পদ মর্টগেজ দেখিয়ে কয়েকশ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে এখন আর পরিশোধ করছে না। রাষ্ট্রায়ত্তসহ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংক এসব গ্রুপের পাওনাদার। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে, সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে ভুয়া দলিলের ফাঁদ পেতে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করছে। তাদের জমা দেওয়া দলিলাদি যে ভুয়া তা একপর্যায়ে প্রমাণিত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও দেখা গেছে, যেসব জমাকৃত দলিলপত্রে যেই জমির আকার ও বিবরণ রয়েছে বাস্তবে সেই জমি অস্তিত্বহীন এবং যেই কোম্পানিকে ঋণ দেওয়া হলো, ঠিকানায় গিয়ে কোম্পানি তো দূরের কথা, কোম্পানি বা ব্যক্তির নামে কোনো সাইনবোর্ড পর্যন্ত পাওয়া যায় না। এমনকি মর্টগেজ হিসেবে নেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ব্যাংকও ওইসব জমিতে দায়বদ্ধতার সানইবোর্ড দিচ্ছে না। ফলে একই জমি দেখিয়ে বারবার ঋণ জালিয়াতি করার সুযোগ পায় প্রতারকরা।এ ধরনের ঘটনা যেন বারবার না ঘটে এজন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি বিধি অনুযায়ী শাস্তির ব্যবস্থা করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এদিকে ব্যাংক কর্মকর্তারা এসব বিষয় ভালোভাবে যাচাই-বাছাই না করেই ঋণ অনুমোদন করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যাংকগুলো বলছে, তাদের প্রয়োজনীয়সংখ্যক লোকবল না থাকায় অনেক সময় সরেজমিন পরিদর্শন করতে পারছে না। ফলে প্রতারক চক্রের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না নামিদামি ব্যাংকও। সরকারি-বেসরকারি নতুন-পুরান সব ধরনের ব্যাংকেই এমন ঘটনা ঘটছে বলে জানা গেছে। তবে কয়েক বছর ধরে সরেজমিন পরিদর্শনের হার বাড়ানো হয়েছে। এমন কি কোনো কোনো এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শন না করে ঋণও দেওয়া হচ্ছে না। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, এ ধরনের প্রতারণার ঘটনা অনেক। তবে অতিসম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি কঠোর হওয়ায় কিছুটা কমে এসেছে। কিন্তু প্রতারকরাও ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করছে। তাই ব্যাংকগুলোর নিজেদের পরিদর্শন ও সুপারভিশন বিভাগগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সর্বোপরি, ব্যাংক কর্মকর্তাদের সততার সঙ্গে কাজ করতে হবে। জানা গেছে, ভুয়া জাল দলিল দেখিয়ে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বন্ধ করতে এবার আঁটঘাট বেঁধে মাঠে নামছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে ঋণগ্রহীতার জামানত হিসেবে যে জমি দেখানো হবে তার দলিল, দাগ নম্বর, খতিয়ান, জমির পরিমাণÑ সব তথ্য খতিয়ে দেখতে হবে ঋণদাতা ব্যাংকগুলোকে। খেলাপি না হলেই ঋণ দাওÑ এ নীতিতে এখন থেকে আর ঢালাওভাবে ঋণ দেওয়া যাবে না কাউকে। এ বিষয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে বছর দুই আগেই নির্দেশনা দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিষয়টি নিশ্চিত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি (বিআরপিডি) শাখার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, আগে ব্যাংকগুলো ঋণ দেওয়ার সময় শুধু দেখত ঋণগ্রহীতা খেলাপি কিনা। এতে জাল বা ভুয়া দলিল দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে ঋণ নেওয়া ঠেকানো যাচ্ছিল না। এমনকি দলিল ঠিক হলেও একই দলিল দিয়ে একাধিক ব্যাংক থেকে অসত্য তথ্য দিয়ে ঋণ নেওয়ার ঘটনা অহরহ ঘটছে। এখন আমরা ব্যাংকগুলোকে বলে দিয়েছি, তারা যাতে খেলাপি ঋণের তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ঋণগ্রহীতা যে সম্পদ জামানত হিসেবে দেবে তার দাগ নম্বর ও খতিয়ানসংক্রান্ত তথ্যও যেন সংগ্রহ করা হয়। এর ফলে ভুয়া জামানত বা একই দলিল দেখিয়ে একাধিক ব্যাংক থেকে জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেওয়া বন্ধ হবে বলে মনে করছেন এই কর্মকর্তা। হলমার্ক-বিসমিল্লাহ গ্রুপের মতো একাধিক প্রতিষ্ঠান জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে তুলে নেওয়ার পরও এ ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারি কমছে না। ফলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের বোঝা বেড়েই যাচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পাশাপাশি বেসরকারি ব্যাংকেও ঘটছে এ ধরনের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা। অভিযোগ রয়েছে, অসত্য তথ্য দিয়ে ব্যাংকের পরিচালকরাই এখন নিজ ব্যাংকের পাশাপাশি অন্য ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন। ফলে প্রকৃত উদ্যোক্তারা ঋণ পাচ্ছেন না। বিনিয়োগে পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক জামানতের সব ধরনের তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দিয়েছে। ঋণের বিপরীতে জামানতসংক্রান্ত প্রতারণা ও দুর্নীতি বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ উদ্যোগ অর্থ মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে।

Leave a Reply

এই বিভাগের আরো খবর

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT