১৬ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ২রা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

ব্যাংকমুখী হচ্ছেন গ্রাহকরা

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ২১, ২০১৮, ১২:৩০ অপরাহ্ণ


ব্যাংক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া গ্রাহকরা বিভিন্ন লেনদেনসহ আবারও ব্যাংকিং কর্মকাণ্ডে মনোযোগী হয়েছেন। ফলে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের পরিমাণও বাড়ছে। আর ঋণের চাহিদা বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহও শুরু করেছে। এক্ষেত্রে সুদের হার বাড়িয়ে কোনও কোনও ব্যাংক আমানত সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন এবং ব্যাংকগুলোর নীতি নির্ধারক পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে এই তথ্য জানা গেছে।

আমানতকারীদের আকর্ষণ করতে নতুন বছরে বেশিরভাগ ব্যাংক আমানতের সুদ হার বাড়িয়ে দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, গত বছরের ডিসেম্বরে এবি ব্যাংকের একবছর মেয়াদী স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) সুদের হার দাঁড়িয়েছে সাত দশমিক ৫০ শতাংশ থেকে ৮ শতাংশ পর্যন্ত। আগের বছরের ডিসেম্বরে যা ছিল ছয় শতাংশ। গত ডিসেম্বর থেকে ব্যাংক এশিয়ার একবছর মেয়াদী স্থায়ী আমানতের সুদের হার সাত শতাংশ, আগের বছরের একই সময়ে যা ছিল সাড়ে পাঁচ শতাংশ।

নতুন সুদহার অনুযায়ী, অগ্রণী ব্যাংক দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ বাড়িয়ে ৩ মাস মেয়াদী আমানতে সুদহার নির্ধারণ করেছে ৫ শতাংশ, ৬ মাস মেয়াদী আমানতে সুদ হার করা হয়েছে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং একবছর বা এর বেশি মেয়াদী আমানতে সাড়ে ৫ শতাংশ সুদ নির্ধারণ করেছে।

২০১৮ সালের শুরু থেকেই সাড়ে ৬ শতাংশ সুদে মেয়াদী আমানত নিচ্ছে ঢাকা ব্যাংক। রাষ্ট্রীয় মালিকানার অগ্রণী ব্যাংক সব ধরনের মেয়াদী আমানতের সুদহার দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। রূপালী ব্যাংক আমানতে সুদ হার ১ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। একবছরের ব্যবধানে বেসরকারি ৩০টিরও বেশি ব্যাংকের আমানতের সুদহার বেড়ে গেছে। একইভাবে অন্য ব্যাংকগুলোও আমানতে সুদহার বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংকও তিন মাস মেয়াদী আমানতে সাড়ে ৪ শতাংশ থেকে প্রায় ১ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ দশমিক ২৫ শতাংশ সুদ দিচ্ছে। ৬ মাস মেয়াদী আমানতে তারা ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশের পরিবর্তে সাড়ে ৫ শতাংশ এবং একবছর মেয়াদী আমানতে ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। আর স্বল্প মেয়াদীতে ৩ থেকে বাড়িয়ে ৪ শতাংশ এবং সঞ্চয়ী আমানতে সাড়ে ৩ শতাংশের পরিবর্তে ৪ শতাংশ সুদ দিচ্ছে রূপালী ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. জায়েদ বখত বলেন, ‘বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা এখন ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে ব্যাংকগুলোর কাছে আমানতের চাহিদা বাড়ছে। তারল্যের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে ব্যাংকগুলো আমানতে সুদের হারও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণে ব্যাংক থেকে চলে যাওয়া আমানতকারীরা আবারও ব্যাংকের দিকে ফিরতে শুরু করেছেন।’

এ প্রসঙ্গে ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ঋণের চাহিদা বাড়ার কারণে আমানতের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহে সুদ হার বাড়িয়েছে।’

এদিকে, আগ্রাসী ব্যাংকিং বন্ধে ব্যাংক খাতের ঋণ ও আমানতের অনুপাত কমিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা (এমডি) মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির চাপ সৃস্টি হবে। আমানতের ওপরে সুদের হারও আরও বেড়ে যাবে। এতে জিনিসপত্রের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিষয়টি উল্লেখ করে গত ১৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবিরের কাছে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকের এমডিদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স,বাংলাদেশ (এবিবি)।

গভর্নরের কাছে লেখা এবিবি’র চিঠিতে বলা হয়েছে, আমরা উদ্বিগ্ন যে, ‘নিকট ভবিষ্যতে অ্যাডভান্স ডিপোজিট রেশিও (এডিআর) কমিয়ে ৮০ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে নামিয়ে আনা হবে। যদি তাই হয়, তবে ব্যাংকিং খাতে অতিরিক্ত ২০ থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকার আমানতের প্রয়োজন হবে।’

চিঠিতে এমডিরা আরও জানান, ‘আমরা উদ্বিগ্ন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন এডিআর নীতিমালা বাস্তবায়ন হলে ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হারও বাড়বে। কারণ, বাড়তি আমানত সংগ্রহের জন্যই ব্যাংকগুলো আমানতের সুদ বাড়িয়ে দেবে। এতে করে ব্যাংক ব্যবস্থায় নতুন করে যে আমানত আসবে— তা কিন্তু নয়। শুধু এক ব্যাংকের আমানত আরেক ব্যাংকে যাবে। ফলে যে ব্যাংক আমানতের সুদ বাড়াবে, বিদ্যমান আমানতকারীরা অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ তুলে সেই ব্যাংকে খাটাবে। আবার আমানতের সুদ বাড়লে ব্যাংকগুলো ঋণের সুদ হারও বাড়িয়ে দেবে, যা মূল্যস্ফীতি বাড়ার ক্ষেত্রে চাপ সৃষ্টি করবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত অক্টোবর মাসের শেষে ব্যাংক খাতে ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ আমানত বেড়েছে। এসময়ে ঋণ বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। অবশ্য গত নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০১২ সালে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের সুদ দিতো ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ হারে। এ কারণে ২০১২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স ব্যাংলাদেশ (এবিবি) বেসরকারি ব্যাংকের জন্য আমানত সংগ্রহে ১২ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদের হার নির্ধারণ করে দেয়। কিন্তু টানা পাঁচ বছর ধরে বিনিয়োগ পরিস্থিতি খারাপ থাকার কারণে ঋণের চাহিদা কমে যায়। এতে ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত তারল্য জমে যায়। আমানতে সুদ হারও কমতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ব্যাংকিং খাতে গড় আমানতের সুদহার হয় গড়ে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ২০১৫ সালের এপ্রিলে আমানতের সুদ হার ছিল ৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। ওই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংকগুলো গড়ে ৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ সুদে আমানত নিয়েছে। যা আগস্টের শেষে ছিল ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশ। তার আগের মাস জুলাইয়ে আমানত নিয়েছিল ৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ সুদে। তার আগের মাসে (জুন) আমানতে গড় সুদ ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ। ২০১৬ সালের এপ্রিলে আমানতকারীরা ৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ সুদ নিতে বাধ্য হন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুন শেষে আমানতের ওপরে সুদ হার ছিল গড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন সুদ। এর আগে ১৯৯৪-১৯৯৫ অর্থবছরে আমানতের গড় সুদ হার ছিল সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT