১৯শে ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই পৌষ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শীতকাল

বিক্ষোভে দুশ্চিন্তা, সামলানোর চেষ্টা

প্রকাশিতঃ আগস্ট ২, ২০১৮, ৬:০৬ অপরাহ্ণ


টানা চার দিনের ছাত্রবিক্ষোভে বড় রকমের চাপের মুখে পড়েছে সরকার। প্রতিদিন নতুন নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা আন্দোলনে যুক্ত হওয়ায় সরকারের দুশ্চিন্তা বাড়ছে। রাজধানী ঢাকা প্রায় অচল করে দেওয়া নেতৃত্বহীন এই আন্দোলন দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ায় সরকার আজ বৃহস্পতিবার দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করেছে।

ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলনের দাবিগুলো যৌক্তিক ও জনসমর্থিত হওয়ায় সরকার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিতে পারছে না। সরকারের তিন মন্ত্রী গতকাল বুধবার আলাদা আলাদা সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্রদের আন্দোলন ও দাবিকে যৌক্তিক আখ্যা দিয়ে সেসব মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন, শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরার আহ্বান জানান। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে ফেরার ঘোষণা দেয়নি। তাদের দাবি নিরাপদ সড়কের, যা দেশের প্রতিটি নাগরিকের চাওয়া। যে কারণে এই আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছেন অভিভাবকদের অনেকেই। রোদ-বৃষ্টিতে যানবাহন ছাড়া কষ্ট স্বীকার করে চলাচল করলেও শিক্ষার্থীদের দিকে পথচারীদের সদয় দৃষ্টি ও সহানুভূতি লক্ষ করা গেছে।

ছাত্র আন্দোলনে জনজীবনে দুর্ভোগ বেড়ে চললেও ধৈর্যধারণই সরকারের সামনে একমাত্র বিকল্প। এই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্র ও শ্রমিকেরা যাতে মুখোমুখি না হয়, সে জন্য সরকার নানা চেষ্টা চালাচ্ছে। তারপরও ঢাকায় শ্রমিকেরা রাস্তায় নেমেছেন। সরকার আশঙ্কা করছে, পরিবহনশ্রমিক ও মালিকেরা ধর্মঘটে গেলে জনজীবন বিপর্যস্ত হতে পারে। এর আগে সরকারি চাকরিতে কোটাবিরোধী আন্দোলন এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাটবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সামলাতে সরকারকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। কোটা আন্দোলনের রেশ এখনো কাটেনি।

সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চলমান ছাত্র আন্দোলন নিয়ে সরকারের বড় ভয়, এর সঙ্গে অন্য কোনো গোষ্ঠী জড়িত হয়ে যায় কি না। আন্দোলন অব্যাহত থাকলে পণ্য সরবরাহব্যবস্থাও ভেঙে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ছাত্রদের দাবিগুলো যৌক্তিক, সবই মেনে নেওয়া হয়েছে। তবে এই আন্দোলনের সঙ্গে স্বার্থান্বেষী মহল এবং ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ ঢুকে পড়েছে।

গত ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে বাসের চাপায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী আবদুল করিম রাজীব ও দিয়া খানম নিহত হয়। তাদের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকায় চলমান ছাত্রবিক্ষোভ ঠেকাতে সরকারের নানা আশ্বাস সত্ত্বেও আন্দোলনকারীরা আস্থা পায়নি।

গতকাল সরকারের তিন মন্ত্রী আনিসুল হক, আসাদুজ্জামান খান এবং ওবায়দুল কাদের পৃথকভাবে গণমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দেন। এর আগে গত মঙ্গলবার রাজধানীর গণপরিবহনের সব অপ্রাপ্তবয়স্ক ড্রাইভার ও ড্রাইভিং লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়।

সড়ক পরিবহন খাতের বিশেষজ্ঞরা সরকারের বিভিন্ন আশ্বাস বিশ্লেষণ করে বলছেন, মন্ত্রীদের এসব আশ্বাসের সবই প্রচলিত আইনে আছে। বড় চ্যালেঞ্জ কার্যকর করা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা। তাঁদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পর দুর্ঘটনা, সড়ক বিশৃঙ্খলা, পরিবহন চালক-শ্রমিকদের দৌরাত্ম্য আগের অবস্থায় ফিরে যাবে।

পুলিশের হিসাবে, ২০১৭ সালে মোট সড়ক দুর্ঘটনা হয়েছে ২ হাজার ৫৬২টি। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা ২ হাজার ৫১৩, আহত হওয়ার সংখ্যা ১ হাজার ৮৯৯। অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির হিসাবে, বছরে গড়ে ৮ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় সড়ক দুর্ঘটনায়।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মী রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ছাত্রছাত্রীরা শখ করে রাস্তায় নামেনি, সড়ক ও পরিবহন খাতে যে নৈরাজ্য, তা বন্ধের দাবিতে নতুন প্রজন্মের এসব কিশোর ও তরুণেরা নামতে বাধ্য হয়েছে। তিনি মনে করেন, নৈরাজ্যের সংস্কৃতি এমন জায়গায় গেছে যে তারা সরকারের আশ্বাসের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। তিনি আরও বলেন, ‘এমন পরিস্থিতির মধ্যেও শ্রমিকেরা রাস্তায় নামছে, মালিকেরা বাস বের না করার হুমকি দিচ্ছে। এত সাহস তারা কোথায় পায়? আইনের প্রয়োগ থাকলে এত সাহস কারও থাকার কথা নয়।’

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আইনটি নড়ে উঠল
জাতীয় নির্বাচনের মাস কয়েক আগে সাধারণ ছাত্রদের এই যৌক্তিক আন্দোলন জোড়াতালি দিয়ে হলেও থামাতে চায় সরকার। এ জন্য চাপা পড়ে থাকা আইনটি সামনে এসেছে বলে মনে করেন সড়ক বিশেষজ্ঞরা। ২০১২ সালে সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়, ২০১৬ সালে আইনের খসড়া হয়। মন্ত্রিসভা আইনটির নীতিগত অনুমোদন দিয়ে গত বছরের নভেম্বরে এটি ভেটিংয়ের (আইনি মত) জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। নয় মাস ধরে আইনটি নিয়ে শুধু পরীক্ষা-নিরীক্ষাই চলছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হওয়ার পর আইনটির খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইনটি পড়ে থাকায় বিরক্তি প্রকাশ করেন। তিনি আগামী সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আইনটি উত্থাপনের নির্দেশ দেন। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল জানিয়েছেন, এটি সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। দুই শিক্ষার্থীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার পর আইনের খসড়ার ভেটিং শেষ করার বিষয়ে জানতে চাইলে বিষয়টিকে কাকতালীয় বললেন আইনমন্ত্রী।

আইনটি সম্পর্কে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, অংশীজন হিসেবে এই আইনের ব্যাপারে তিনি অন্ধকারে আছেন। বিভিন্ন সময় তিনিসহ অংশীজনেরা যেসব মত দিয়েছেন, তার অধিকাংশই গ্রহণ করা হয়নি, বিশেষ করে আইনটি থেকে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়গুলো বাদ দেওয়া হয়েছে। আইনটি তাতে পূর্ণাঙ্গতা হারিয়েছে। তা ছাড়া অপরাধের ধরন, আইনের ধারা ও সাজায় নমনীয় মনোভাব আছে।

গতকাল পর্যন্ত আইনের খসড়াটি আইন মন্ত্রণালয়ে ছিল। প্রধানমন্ত্রী এটি মন্ত্রিসভার তোলার নির্দেশ দেওয়ার পর আইনটি চূড়ান্ত করার জন্য শুরু হয়েছে তোড়জোড়।
জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আইনটি তাঁর মন্ত্রণালয়ে আসেনি বলে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারছেন না। তবে তিনি বলেন, আইনে জেল-জরিমানার বিষয়টি আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। চূড়ান্ত আইনে কতটা থাকছে, এটা শিগগিরই জানা যাবে।

আইনে যা আছে
আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খসড়া আইন অনুযায়ী গাড়িচালককে কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস আর চালকের সহযোগীকে কমপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে।
খসড়া আইনে দুর্ঘটনার জন্য মৃত্যু বা অন্যান্য ক্ষেত্রে আগের মতোই দণ্ডবিধি অনুযায়ী শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, কেউ গাড়ি চালিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নরহত্যা করলে শাস্তি হবে ৩০২ ধারা অনুযায়ী। আর মৃত্যু না হওয়ার ঘটনায় ৩০৪ ধারা অনুযায়ী শাস্তি হবে। শুধু দুর্ঘটনা হলে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, প্রস্তাবিত আইনে দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে যে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে তা পর্যাপ্ত। ১৯৯১ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিজের স্ত্রী নিহত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী গতকাল বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা বা রেল দুর্ঘটনায় কেউ নিহত হলে তার পরিবারের কী অবস্থা হয়, সে বিষয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা আছে।

প্রস্তাবিত আইনে গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করা যাবে না। ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া কেউ গাড়ি চালাতে পারবেন না। এসব অপরাধের জন্য বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি রাখা হয়েছে।

এ ছাড়া ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালালে এক বছর কারাদণ্ড বা ১ লাখ টাকা জরিমানা দিতে হবে। আর সড়কে দুটি গাড়ি পাল্লা দিয়ে চলার ফলে দুর্ঘটনার জন্য তিন বছরের কারাদণ্ড অথবা ২৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

প্রসঙ্গ ফিটনেস
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের রাস্তায় বর্তমানে চলমান প্রায় ৫০ লাখ যানবাহনের ৭২ শতাংশের ‘ফিটনেস’ নেই। তবে ফিটনেস নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ্য। বিআরটিএ কার্যালয়ে গাড়ির ফিটনেস দেওয়ার জন্য দালাল চক্র গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে সরকারের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে।

আন্দোলনের মুখে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গতকাল বলেছেন, এখন থেকে ফিটনেস, লাইসেন্স ও রুট পারমিট ছাড়া কোনো গাড়ি চলতে দেওয়া হবে না। যেখান থেকে বাস ছাড়ে সেখানেই এসব বিষয় যাচাই করবে মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতি। প্রয়োজনে প্রশাসনের লোকও সেখানে যাচাই করবেন। আর রাস্তায় থাকবে নিরাপত্তা বাহিনী। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না দেখাতে পারলে সেখানেই শাস্তি।

সড়ক পরিবহন বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ফিটনেস নিয়ে অনিয়ম বন্ধে এই ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে আইনে, যাতে বিআরটিএর যেকোনো কার্যালয় থেকে ফিটনেস নেওয়া যায়।

বৈধ লাইসেন্স প্রসঙ্গ
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের তথ্য অনুযায়ী, পরিবহন খাতে ২৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের অধিকাংশেরই বৈধ লাইসেন্স নেই। বিআরটিএর হিসাবে, দেশে ২৯ লাখ যানবাহন আছে, বৈধ লাইসেন্স আছে প্রায় ১৯ লাখ।

আইনমন্ত্রী গতকাল বলেন, কেউ ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে পারবে না। বিদেশের মতো চালকের অপরাধ বা ভুলের জন্য ১২ পয়েন্ট রাখা হয়েছে। ১২ পয়েন্টের পুরোটাই কাটা গেলে ওই চালক আর ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না।

ফিটনেস ছাড়া গাড়ি, লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো বন্ধ এবং অন্যান্য সিদ্ধান্ত কবে থেকে কার্যকর হবে-জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, এটা কার্যকর হয়ে গেছে। এটা কত দিন কার্যকর থাকবে-জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, বিশেষ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সব দায়িত্ব এসে বর্তায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর। অথচ প্রতিটি কাজের জন্য সরকারের আলাদা সংস্থা রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামছুল হক বলেন, বিআরটিএসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত না করতে পারলে কোনো আইন বা সিদ্ধান্তই কার্যকর হবে না। আর শিক্ষার্থী বা জনগণ তখনই আশ্বস্ত হবে, যখন তারা দেখবে যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT