২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৫ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

বরকতময় রমজানের প্রধান প্রধান আমল

প্রকাশিতঃ মে ১৮, ২০১৮, ৩:৫৬ পূর্বাহ্ণ


প্রতি বছরের মতো এবারও মাহে রমজানে পবিত্র মক্কা-মদিনায় ঢল নেমেছে সারাবিশ্ব থেকে আসা পুণ্যার্থীদের। বুধবার প্রথম তারাবিতে মদিনার মসজিদে নববি ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। হারামাইন শরিফাইনের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছবিতে মসজিদের বাইরের উন্মুক্ত ছাতা চত্বরে তারাবি আদায়রত মুসল্লিরা 

শুরু হলো অপরিসীম ফজিলত ও বরকত অর্জনের মাস রমজান। রমজান আল্লাহ তায়ালার বিশেষ নেয়ামত। সওয়াব অর্জনের বসন্ত মৌসুম। পরকালের পাথেয় হাসিলের সুবর্ণ সুযোগ। পিছিয়ে পড়াদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার দুর্লভ অবকাশ। পাপী-তাপীদের পাপমুক্তির মাহেন্দ্রক্ষণ। রমজানের ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজানÑ বরকতময় মাস তোমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয়েছে। পুরো মাস রোজা পালন আল্লাহ তোমাদের জন্য ফরজ করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজা উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়, বন্ধ করে দেওয়া হয় জাহান্নামের দরজাগুলো। দুষ্ট শয়তানদের এ মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে দেওয়া হয়। এ মাসে আল্লাহ কর্তৃক একটি রাত প্রদত্ত হয়েছে, যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে এর কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হলো, সে বঞ্চিত হলো (মহাকল্যাণ থেকে)।’ (তিরমিজি : ৬৮৩)

রহমত, বরকত আর মাগফিরাতে ভরপুর এ মাসের গুরুত্বপূর্ণ অনেক আমল রয়েছে। তন্মধ্যে সর্বপেক্ষা ১০টি আমলের কথা তুলে ধরা হলো।
রোজা রাখা
ইসলামের পাঁচটি রোকনের একটি ‘রোজা’। রমজান মাসে রোজা রাখা ফরজ। সে জন্য রমজানের প্রধান আমল রোজা পালন করা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে রোজা রাখে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)। রোজা রাখার ফজিলত সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ইখলাস নিয়ে অর্থাৎ একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে সন্তুষ্টি করার জন্য রমজানে রোজা পালন করবে, তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ (বোখারি : ২০১৪)। অন্য হাদিসে আছেÑ ‘যে কেউ আল্লাহর রাস্তায় (অর্থাৎ শুধু আল্লাহকে খুশি করার জন্য) একদিন রোজা পালন করবে, তা দ্বারা আল্লাহ তাকে জাহান্নামের আগুন থেকে ৭০ বছরের রাস্তা পরিমাণ দূরবর্তী স্থানে রাখবেন।’ (মুসলিম : ২৭৬৭)।
জামাতের সঙ্গে নামাজ আদায়
রমজান মাসে ফরজ নামাজ জামাতের সঙ্গে আদায় করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আমল। অনেকে ফরজ নামাজ আদায়ে উদাসীন থাকেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয় নামাজ মোমিনদের ওপর নির্দিষ্ট সময়ে ফরজ।’ (সূরা নিসা : ১০৩)। অন্য আয়াতে বলা হয়েছেÑ ‘অতএব সেই নামাজ আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের নামাজে অমনোযোগী।’ (সূরা আলমাউন : ৪-৫)।
এ বিষয়ে হাদিসে এসেছেÑ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘আমি বললাম, হে আল্লাহর নবী! কোন আমল জান্নাতের অতি নিকটবর্তী? তিনি বললেন, সময় মতো নামাজ আদায় করা।’ (মুসলিম : ২৬৩)।
সাহরি খাওয়া
রোজা পালনে সাহরি খাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাহরি খাওয়ার মধ্যে বরকত রয়েছে। অনেকে সাহরি খান না, অনেকে আগ রাতে খেয়েই শুয়ে পড়েন। এটা সুন্নাহ পরিপন্থি। কারণ, ইহুদি ও খ্রিষ্টানরা সাহরি খায় না। হাদিসে এসেছেÑ রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের ও আহলে কিতাবদের রোজার মাঝে পার্থক্য হলো সাহরি গ্রহণ।’ (মুসলিম : ২৬০৪)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘সাহরি হলো বরকতময় খাবার। তাই কখনও সাহরি খাওয়া বাদ দিও না। এক ঢোঁক পানি পান করে হলেও সাহরি খেয়ে নাও। কেননা সাহরির খাবার গ্রহণকারীকে আল্লাহ তায়ালা ও তাঁর ফেরেশতারা স্মরণ করে থাকেন।’ (মুসনাদ আহমাদ : ১১১০১)।
ইফতার করা ও করানো
সিয়ামের পূর্ণ সওয়াব পাওয়ার জন্য দ্রুত ইফতার করতে হবে। সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করার বিরাট ফজিলত। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি সিয়াম পালন করবে, সে যেন খেজুর দিয়ে ইফতার করে, খেজুর না পেলে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কেননা পানি হলো অধিক পবিত্র।’ (আবু দাউদ : ২৩৫৭)। অন্য হাদিসে হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘দ্বীন বিজয়ী হবে, যে যাবৎ মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কারণ, ইহুদি-নাসারারা তা বিলম্বে করে।’ (আবু দাউদ : ২৩৫৫)।
অপরকে ইফতার করানোও একটি বিরাট সওয়াবের কাজ। প্রতিদিন কমপক্ষে একজনকে ইফতার করানোর চেষ্টা করা উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করবে, তাদের উভয়ের সওয়াব থেকে বিন্দুমাত্র হ্রাস করা হবে না।’ (ইবনে মাজাহ : ১৭৪৬)।
তারাবির নামাজ আদায়
তারাবির নামাজ আদায় রমজান মাসের অন্যতম আমল। হাদিসে এসেছে, ‘যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে সওয়াব হাসিলের আশায় রমজানে কিয়ামু রমজান (সালাতুত তারাবি) আদায় করবে, তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ (বোখারি : ২০০৯)। তারাবির সালাত তার হক আদায় করে অর্থাৎ ধীরস্থীরভাবে আদায় করতে হবে। ২০ রাকাত তারাবি জামায়াতের সঙ্গে আদায় করা সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত। হাদিসে আছে, ‘যে ব্যক্তি ইমামের সঙ্গে প্রস্থান করা অবধি সালাত (সালাতুত তারাবি) আদায় করবে, তাকে পুরো রাত কিয়ামুল লাইলের সওয়াব দান করা হবে।’ (আবু দাউদ : ১৩৭৭)।
ইতিকাফ করা
ইতিকাফ অর্থ অবস্থান করা। অর্থাৎ মানুষের কাছ থেকে পৃথক হয়ে সালাত, সিয়াম, কোরআন তেলাওয়াত, দোয়া, ইস্তেগফার ও অন্যান্য ইবাদাতের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে একাকী কিছু সময় যাপন করা। এ ইবাদাতের এত মর্যাদা যে, প্রত্যেক রমজানে রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানের শেষ ১০ দিন নিজে এবং তাঁর সাহাবিরা ইতিকাফ করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘প্রত্যেক রমজানেই তিনি শেষ ১০ দিন ইতিকাফ করতেন। কিন্তু জীবনের শেষ রমজানে তিনি ইতিকাফ করেছিলেন ২০ দিন।’ (বোখারি : ২০৪৪)। উল্লেখ্য, ১০ দিন ইতেকাফ করা সুন্নত।
লাইলাতুল কদর তালাশ
রমজান মাসে এমন একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে উত্তম। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছেÑ ‘কদরের রাত হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা কদর : ৪) রাসুল (সা.) শেষ ১০ দিন লাইলাতুল কদর তালাশ করার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘তোমরা রমজানের শেষ ১০ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে কদরের রাত খোঁজ। (বোখারি : ২০২০)। সতর্ক থাকতে হবে রমজানের শেষ ১০ দিন যেন ঈদের কেনাকাটার ব্যস্ততায় কাটিয়ে না দেই। লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান-ইবাদতে নারী-পুরুষ উভয়ে একই শ্রেণিভুক্ত। কারণ, রাসুল (সা.) এ অনুসন্ধানের মধ্যে তার পরিবার-পরিজনকে সঙ্গে নিয়েছেন।
বেশি বেশি দান-সদকা করা
পুণ্য অর্জনের মাস রমজান। রোজা-নামাজ ইত্যাদির পাশাপাশি দান-সদকার মাধ্যমেও ফজিলত অর্জন করতে হবে। এ মাসে বেশি বেশি দান-সদকা করার চেষ্টা করতে হবে। এতিম, বিধবা ও গরিব-মিসকিনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। যাদের ওপর জাকাত ফরজ তারা হিসাব করে এ মাসে জাকাত দেওয়া উত্তম। কেননা রাসুলুল্লাহ? (সা.) এ মাসে বেশি বেশি দান-খয়রাত করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুল (সা.) ছিলেন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দানশীল আর রমাজানে তাঁর এ দানশীলতা আরও বেড়ে যেত।’ (বোখারি : ১৯০২)।
বেশি বেশি দোয়া-ইস্তেগফার করা
ইবাদতের মাস রমজানে বেশি বেশি আমলের কথা রয়েছে। কিন্তু আমরা অনেকেই ব্যস্ত থাকি দুনিয়াবি কাজে। এটা কাম্য নয়। এ মাসে বেশি বেশি দোয়া-ইস্তেগফার করা উচিত। হাদিসে এসেছে, ‘ইফতারের মুহূর্তে আল্লাহ তায়ালা বহু লোককে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিয়ে থাকেন। মুক্তির এ প্রক্রিয়াটি রমাজানের প্রতিরাতেই চলতে থাকে।’ (আল জামিউস সাগির : ৩৯৩৩)। অন্য হাদিসে এসেছে, ‘রমজানের প্রতি দিবসে ও রাতে আল্লাহ তায়ালা অনেককে মুক্ত করে দেন। প্রতি রাতে ও দিবসে প্রতি মুসলমানের দোয়া কবুল করা হয়।’ (আত-তারগিব ওয়াত তারহিব : ১০০২)।
তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া
রমজান মাসে নিয়মিত তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রমজান ছাড়াও সালাতুত তাহাজ্জুদ পড়ার মধ্যে বিরাট সওয়াব এবং মর্যাদা রয়েছে। রমজানের কারণে এ ফজিলত বহুগুণে বেড়ে যায়। যেহেতু সাহরি খাওয়ার জন্য উঠতে হয় সেজন্য রমজান মাসে সালাতুত তাহাজ্জুদ আদায় করার বিশেষ সুযোগও রয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন, ‘ফরজ নামাজের পর সর্বোত্তম নামাজ হলো রাতের                নামাজ অর্থাৎ তাহাজ্জুদের নামাজ।’                  (মুসলিম : ২৮১২)।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT