২২শে সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই আশ্বিন, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, শরৎকাল

প্রিয় বাবা…

প্রকাশিতঃ জুন ২০, ২০১৮, ২:২৯ অপরাহ্ণ


আপনি চলে গেছেন ১৬ জুন, ১৯৯৯ সনে। সেই কত বছর কিন্তু প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে আপনার জন্য মন কাঁদে। যখন সুন্দর জায়গায় যাই, ভালো খাবার রান্না করি, আপনার পছন্দের খাবার খাই, আমার জীবনে আনন্দের কোনো ঘটনা ঘটে, আপনাকে মনে পড়ে আরও বেশি করে।
অনেক আগে যখন আমি মেডিকেল কলেজে পড়ি, একদিন আপনার সঙ্গে অসুস্থ বড় ফুফুকে দেখতে গেলাম। এখনকার মতো রাস্তাঘাট এত ভালো ছিল না। অর্ধেক পথ রিকশায়, বাকিটা হেঁটে। দুপুরের কড়া রোদ, সারাটা পথ আপনি আমার মাথার ওপর ছাতা ধরে রাখলেন, আমার যেন কষ্ট না হয়। আমাকে, আমাদের পাঁচ ভাইবোনকে সারা জীবন এভাবে আপনি আপনার স্নেহ, মমতা, যত্ন আর ভালোবাসার ছায়া দিয়ে আগলে রেখেছেন। মনে পড়ে সেই ছোটবেলায় বাড়ির পাশের পুকুরে হালকা সবুজ রঙের পামরোজ সাবান দিয়ে আমাদের গোসল করিয়েছেন। এখনো এত বছর পরও আমার মনে, শরীরে আপনার অসীম মমতার স্পর্শ পাই।
বিকেলে আমরা মাঠে খেলতাম, আপনার নিয়ম ছিল আজানের পর কেউ বাইরে থাকতে পারবে না। সন্ধ্যায় হাতমুখ ধুয়ে নাশতা খেয়ে পড়তে বসা। আপনি আমাদের কাছাকাছি থাকতেন, জোরে জোরে পড়তে হতো আমাদের, কোথাও ভুল হলে সঙ্গে সঙ্গে শুধরে দিতেন। বাসায় লেখার জন্য বাজার থেকে দিস্তা কাগজ কিনে সেলাই করে খাতা বানিয়ে দিতেন। তখন কালির কলম ছিল, প্রতিদিন ধুয়ে কলমে কালি ভরে দিতেন। প্রতিদিন বাজার করতেন, আমাদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করতেন, মৌসুমি ফল সবার আগেই আমরা খেতাম। বেতনের টাকা আর জমির আয় দিয়ে সংসার চলত। নিজে অনেক কষ্ট করেছেন, আমাদের বুঝতে দেননি।
মধ্যবিত্ত সরকারি চাকরি, তারপরও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন আমাদের লেখাপড়ার ওপর। রংপুর থেকে গাজীপুর সমরাস্ত্র কারখানায় আমরা এলাম। এসএসসি পাস করার পর কলেজ। গাজীপুরে তিনটি কলেজ থাকা সত্ত্বেও আপাকে, আমাকে পড়ালেন হলিক্রস কলেজে, দুই ভাইকে নটর ডেম ও ঢাকা কলেজে, ছোট বোন পড়ল বদরুন্নেসা কলেজে। আপনার একটাই ইচ্ছা ছিল, আমরা যেন লেখাপড়ার পাশাপাশি সততা ও মানবিক মূল্যবোধ আমাদের হৃদয়ে ধারণ করি। আপনি নিজে সৎ ছিলেন, কখনো কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেননি।
ছোটবেলা থেকেই বই কিনে দিতেন, বলতেন বই পড়। আমাদের ভাইবোনের একটা পারিবারিক লাইব্রেরি ছিল ‘অন্বেষা’, কত যে বই পড়েছি এ জীবনে। পড়ার অভ্যাস আপনি এমনভাবে গড়ে দিয়েছেন, যেখানে যে বই পেতাম, পড়তাম। এমন হতো বাজারের ঠোঙা খুলেও পড়তাম, ভালো কথা পেলে খাতায় নোট করতাম। বাসায় তখনকার জনপ্রিয় ইত্তেফাক পত্রিকা রাখতেন, আম্মার জন্য বেগম, আমাদের জন্য মাসিক কিশোর বাংলা। আপনি চাইতেন আপনার ছেলেমেয়েরা পাঠ্যপুস্তকের বাইরের জগৎ সম্পর্কেও জানুক, মানুষ হয়ে বেড়ে উঠুক। আপনার হৃদয় ছিল আলোয় ভরা, আপনি আমাদের আপনার আলোয় আলোকিত করতে চাইতেন। আপনার ছেলেরা বিতর্কে, লেখালেখিতে সবার সেরা, আমি কবিতা লিখতাম, আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন আপনি। আমাকে নিয়ে গেলেন বেগম পত্রিকার সম্পাদক নুরজাহান আপার কাছে। আমাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য।
আমি নিজে চাইনি ডাক্তার হব, আপনার ইচ্ছায় মেডিকেলে পরীক্ষা দিলাম। চান্স পাওয়ার পর খুশিতে আপনার চোখমুখ উজ্জ্বল। আপনার অন্তহীন আনন্দে, আগ্রহে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে ভর্তি হলাম। আপনি বাংলাবাজার থেকে সব বই কিনে দিলেন। সবাই জানে, মেডিকেলের বই একটু বেশিই দামি। আপনার কষ্ট হয়েছে, তারপরও আপনি চেয়েছেন আমার পড়ায় যেন কোনো অসুবিধা না হয়। হোস্টেলে থাকব, প্রয়োজনের সবকিছু কিনে দিলেন। নিয়মিত চিঠি লিখতেন, কদিন পরপরই এসে দেখে যেতেন, আমার যেন কোনো কষ্ট না হয়।
তৃতীয় বর্ষে থাকার সময়ই আপনি বলতেন এমবিবিএস পাস করার পর আরও পড়তে হবে, আরও বড় ডাক্তার হতে হবে। এখন ভেবে অবাক হই আপনি নিজে ডাক্তার ছিলেন না, গ্রাম থেকে আসা একজন মানুষ, সেই আশির দশকের প্রথম দিকেই আপনি কীভাবে চিন্তা করেছিলেন সাধারণ এমবিবিএসের কোনো দাম নেই, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করতে হবে!
পাস করার পরপর বিসিএসের ব্যাপারে ডাক্তার সমাজ দ্বিধান্বিত, প্রথম বিসিএস পরীক্ষা, ১৯৮২ সাল। আপনি সবার আগে আমার জন্য ফরম নিয়ে এলেন, আমার ক্রমিক নম্বর ২০, শেষ পর্যন্ত পরীক্ষা দেওয়ারই সিদ্ধান্ত হলো। বিসিএস পাস করলাম, সরকারি চাকরি স্থায়ী হলো। ছাত্রজীবনেই ঠিক করেছিলাম শিশুরোগে (পেডিয়াট্রিক্স) পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন করব। তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ইন্টার্নশিপ শেষে শিশু বিভাগে প্রশিক্ষণের জন্য ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে পোস্টিং হলো। সরকারি চাকরির স্বল্প বেতন, শিশু ওয়ার্ডের কঠোর পরিশ্রম করেও পড়াশোনা করতে লাগলাম। আমার মনোবল, আমার অনুপ্রেরণা আপনি। সবদিক দিয়ে আপনি আমার সঙ্গে ছিলেন। আপনি বলতেন টাকার জন্য প্রাইভেট প্র্যাকটিস করো না, মন দিয়ে পড়াশোনা করো, ট্রেনিং নাও। স্পেশালিস্ট হয়ে প্র্যাকটিস করবে।
আপনার দোয়ায় আমি প্রথমবারেই এফসিপিএস পাস করেছি। যেদিন পরীক্ষা এবং রেজাল্ট হলো, আপনি গাজীপুর থেকে ছুটি নিয়ে ঢাকায় চলে এলেন। আপনার সেই আনন্দিত মুখ আমার চোখে ভাসে এখনো, এরপর এমডি করলাম। আমার, আমাদের ভাইবোনের সব অর্জন মনে হতো আপনার।
ডান্ডি ইউনিভার্সিটি থেকে মেডিকেল এডুকেশনে উচ্চতর ডিগ্রি নেওয়ার জন্য ১৯৯৬ সানল ডান্ডি গেলাম, আপনি খুব খুশি হলেন। ফোনে কথা হতো আপনার সঙ্গে, চিঠি লিখতেন নিয়মিত। একবার চিঠিতে লিখলেন, ‘জীবনে কখনো এক বছর তোমাকে না দেখে থাকিনি, তোমাদের না দেখলে কষ্ট হয়…’ আপনাকে কখনো কিছু দিলে আপনি বলতেন, ‘আমাকে কিছু দিতে হবে না, তোমরা আমার রোপিত বৃক্ষ, মৃত্যুর পর তোমাদের দোয়া আমাকে ছায়া দেবে।’
১৯৯৮ সাল থেকেই আপনার স্বাস্থ্য খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, ভেবেছি ডায়াবেটিসের জন্য হচ্ছে। ডাক্তার দেখিয়েছি, কেউ তেমন কিছু বলেনি। যখন রোগ নির্ণয় হলো, ক্যানসার লিভার পর্যন্ত ছড়িয়ে গেছে তত দিনে। আমরা দুই ভাইবোন ডাক্তার, তারপরও যথাসময়ে আপনার রোগ নির্ণয় হলো না, আপনাকে হারিয়ে ফেললাম চিরদিনের জন্য। বাবা গো, আপনি বেঁচে থাকতে আপনার দিকে ঠিকমতো খেয়াল করিনি, আপনাকে তেমন কিছুই দিইনি, আরও অনেক কিছু করার প্রয়োজন ছিল আমার। এখন প্রতিনিয়ত কাঁদি কেন নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম, কেনো আপনার কাছে থাকিনি, সেবাযত্ন করিনি, আপনার সঙ্গে গল্প করিনি? আপনি তো আমাদের জন্য আপনার হৃদয়ের সবটুকু মমতা দিয়ে গেছেন।
প্রিয় বাবা, আমার স্নেহময় বাবা, ১৯ বছর আপনাকে দেখি না, আপনাকে না দেখে থাকা বড় বেশি কষ্টের বাবা।
আমরা ভাইবোন সবাই আজ উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত, প্রতিষ্ঠিত, সব আপনার অবদান। আপনি শুধু আমাদের আলোকিত করেননি, এলাকার, আপনার পরিচিত অনেক ছেলেমেয়েকেও আপনার সীমিত সামর্থ্য থেকে পড়ালেখা করতে সাহায্য করেছেন। তাঁদের অনেকেই আজ প্রতিষ্ঠিত। আপনি চলে যাওয়ার পর অন্যদের কাছ থেকে আপনার সম্বন্ধে জেনেছি, আপনি মানুষের জন্য, মানুষের কল্যাণে কত কিছু করে গেছেন। আমার প্রাণপ্রিয় বাবা, আপনার মতো বাবা পৃথিবীতে খুব বেশি নেই, আপনি শ্রেষ্ঠ একজন বাবা।
মেডিকেল এডুকেশনের ওপর আমি একটি বই লিখেছি, উৎসর্গ করেছি আমার প্রাণপ্রিয় বাবাকে-
পুনশ্চ: যাঁদের বাবা এখনো পৃথিবীতে আছেন, তাঁদের প্রতি অনুরোধ বাবার প্রতি আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করুন, তাঁর দিকে খেয়াল রাখুন, অসুস্থ হলে সময়মতো ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করুন, মাঝে মাঝে সময় বের করে তাঁর সঙ্গে কথা বলুন, আপনার ছোটবেলার কথা শুনতে চান, তাঁকে জড়িয়ে ধরুন, মাথায় হাত বুলিয়ে দিন। আপনার কথায়, আচরণে বাবাকে বুঝতে দিন আপনি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ, আপনি তাঁকে অনেক ভালোবাসেন। বাবা চলে গেলে কোনো কিছু দিয়েই তাঁর ঋণ শোধ করা যাবে না।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT