১০ই ডিসেম্বর, ২০১৮ ইং | ২৬শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

প্রাত্যহিক কোরআন তেলাওয়াত

প্রকাশিতঃ নভেম্বর ১৬, ২০১৮, ১:৩১ অপরাহ্ণ


আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা.) এর ওপর সর্বশেষ, সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বযুগের জন্য প্রযোজ্য ও পালনীয় মহাগ্রন্থ কোরআন অবতীর্ণ করেছেন। নবীজিকে আল্লাহ তায়ালা কোরআন সংশ্লিষ্ট চারটি দায়িত্বও বুঝিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘আল্লাহ ঈমানদারদের ওপর অনুগ্রহ করেছেন যে, তাদের মাঝে তাদের নিজেদের মধ্য থেকে নবী পাঠিয়েছেন। তিনি তাদের জন্য তাঁর আয়াতগুলো পাঠ করেন, তাদের পরিশোধন করেন এবং তাদের কিতাব ও হিকমাহ (সুন্নাহ) শিক্ষা দেন। বস্তুত আগে তারা ছিল পথভ্রষ্ট।’ (সূরা আলে ইমরান : ১৬৪)। সুতরাং মোমিন ব্যক্তি যুগপৎ কোরআন তেলাওয়াত ও শিক্ষালাভ করে ইহকালীন ও পরকালীন সুখশান্তি অর্জন করবে। বস্তুত কোরআন পাঠ একটি পৃথক দায়িত্ব ও ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিশেষ বিশেষ সূরা ও আয়াত তেলাওয়াত করতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। হাদিস গ্রন্থগুলোতে এ বিষয়ক প্রচুর বর্ণনা বিবৃত হয়েছে। এ সম্পর্কে পরবর্তী আলেমরা স্বতন্ত্র বইও রচনা করে গেছেন।

নবীজির সাহচর্যে ধন্য সাহাবায়ে কেরাম ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেকেই কোরআন পাঠের প্রতি খুবই যতœবান ও মনোযোগী ছিলেন। তাদের জীবনবৃত্তান্ত থেকে বেশি বেশি খতম তথা পুরো কোরআন তেলাওয়াত করে শেষ করতে পরস্পরের মধ্যে একরকম প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়। এক্ষেত্রে নামাজ, সফর ইত্যাদি সময় ছাড়া তারা সরাসরি কোরআনের মুসহাফ (লিখিত বা প্রকাশিত কপি) থেকে তেলাওয়াত করাকে গুরুত্ব ও প্রাধান্য দিতেন। দৈনন্দিন একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেলাওয়াত করাকে নিজেদের জন্য জরুরি বানিয়ে ফেলেছিলেন। এতে অন্য সব উপকারের সঙ্গে বিশেষ একটি লাভ হয় যে, বারবার তেলাওয়াতের কারণে অনেক সূরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুখস্থ হয়ে যায়। বস্তুত আমরা ছোটবেলা দেখেছি, গ্রামগঞ্জে ফজর নামাজ আদায়ান্তে সবাই তেলাওয়াতে আত্মনিয়োগ করতেন। সূরা ইয়াসিন এবং অন্যান্য সূরা গুরুত্বসহকারে পাঠ করতেন। কী বৃদ্ধ, কী যুবক, কী ছাত্রÑ সবার তেলাওয়াতের সূরে একটা আলোকময় পরিবেশ সৃষ্টি হতো। মুসলিম সমাজের প্রতিজন সদস্যই বেশকিছু সূরা মুখস্থ করে ফেলতে সক্ষম ও সচেষ্ট থাকতেন। দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন আর সেই চিত্র তেমন চোখে পড়ে না। আমরা গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকাকে ফ্যাশন বানিয়ে ফেলেছি। সেজন্য অনেকের ফজর কাজা হয়! শারীরিক অসুস্থতা বৃদ্ধি পায়! মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যায়! বিদ্যুতের অপচয় হয়! আরও কত অপকার যে হয়, তা কি আমরা কখনও ভেবে দেখেছি?
সাহাবায়ে কেরামের নিয়ম ছিল, সকালে মুসহাফ থেকে কোরআন তেলাওয়াত না করে তাদের কেউ ঘরের বাইরে যাওয়া পছন্দ করতেন না। (আত তারাতিবুল ইদারিয়্যাহ : ২/৩৫৩)। সুফয়ান ইবনে উয়াইনা (রহ.) এর সূত্রে বর্ণিত, ওসমান (রা.) বলেন, আমি চাই না, এমন কোনো দিন আমার জীবনে আসুক, যেদিন আমি মুসহাফ থেকে কোরআন তেলাওয়াত করতে পারব না! (আজ জুহদ; ইমাম আহমাদ : ৬৮১)। আল্লামা নাওয়াওয়ি (রহ.) বলেন, ইবনে আবু দাউদ প্রচুর সালাফ তথা পুণ্যবান পূর্বসূরি মনীষীর সূত্রে বর্ণনা করে দেখিয়েছেন, তাদের প্রত্যেকেরই মুসহাফ থেকে তেলাওয়াতের প্রাত্যহিক একটি রুটিন ছিল। এতে কারও দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। (আত তিবয়ান; নাওয়াওয়ি, পৃ. ৮৩)।
আর ব্যক্তি কোরআন খতমের পর যে দোয়া করবে, তা আল্লাহ তায়ালার কাছে গৃহীত হওয়ার আশা করা যায় বেশি। এ সুসংবাদ নবীজি (সা.) আমাদের দিয়ে গেছেন। সাহাবি ইরবাজ ইবনে সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি ফরজ নামাজ আদায় করল তার দোয়া মকবুল (গৃহীত) এবং যে কোরআন খতম করল তার দোয়াও মকবুল।’ (আল মুজামুল কাবির; তাবারানি : ১৮/২৫৯, হাদিস : ১১৭১২)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এর এই ফরমান সাহাবায়ে কেরাম এবং তৎপরবর্তী মনীষীরা কথা ও কাজের দ্বারা অনুসরণ করেছেন। সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, কোরআন খতমের পর দোয়া করলে তা মকবুল হয়। (ফাজায়িলুল কোরআন; ইবনুদ দুরাইস)। ইমাম নাওয়াওয়ি (রহ.) বলেন, ইবনে আবি দাউদ তদীয় ‘কিতাবুল মাসাহিফ’ এ দুটি বিশ্বস্ত সূত্রে তাবেয়ি কাতাদাহ থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, ‘আনাস ইবনে মালিক (রা.) যখন কোরআন খতম করতেন, তার পরিবার ও সন্তানদের সমবেত করতেন এবং সবার জন্য দোয়া করতেন।’ আল্লামা নূরুদ্দিন হায়সামি (রহ.) বলেন, ইমাম তাবারানি এটি বর্ণনা করেছেন, এর বর্ণনাকারীরা বিশ্বস্ত। (মাজমাউয যাওয়াইদ; হায়সামি : ৭/২৫৬, বর্ণনা নং : ১১৭১৩, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ ১৪২২ হি./২০০১ খ্রি.)। উল্লেখ্য, আনাস (রা.) এমন কর্মপন্থা অবলম্বন করতেন সম্ভবত দুটি কারণে। একটি হলো, সন্তানরাও যেন কোরআন তেলাওয়াতে আগ্রহী হয় এবং দ্বিতীয়টি হলো, মহান আল্লাহর দরবারে তাদের সার্বিক কল্যাণ এবং হেদায়েতের জন্য দোয়া করা। এখানে যদি আমরা গভীরভাবে চিন্তা করি তবে দেখতে পাব, আনাস (রা.) এর এ রকম উদ্যোগ কিন্তু নবীজি (সা.) এর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ থেকে উৎসারিত।
বিশিষ্ট তাবেয়ি মুজাহিদ ইবনে জাবর (রহ.) বলেন, যে ব্যক্তি কোরআন খতম করে তাকে দোয়া কবুল হওয়ার পুরস্কারে পুরস্কৃত করা হয়। (ফাজায়িলুল কোরআন; ইবনুদ দুরাইস, পৃ. ৪৯)। ইমাম বোখারি (রহ.) বলেন, প্রত্যেক খতমের পর বান্দার দোয়া মকবুল হয়। (দ্রষ্টব্য, সিয়ারু আলামিন নুবালা; যাহাবি)। ইমাম ইবনুল জাজারি (রহ.) দোয়া কবুল হওয়ার বিশেষ সময় ও অবস্থাগুলোর আলোচনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘এবং কোরআন তেলাওয়াতের পর, বিশেষ করে কোরআন খতমের পর।’ (আল হিসনুল হাসিন, পৃ. ৪০)। ইবনে আবি দাউদ বিশ্বস্ত সূত্রে হিকাম ইবনে উতায়বা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, একবার তাবেয়ি মুজাহিদ এবং আবদাহ ইবনে লুবাবা আমার কাছে বাহক পাঠিয়ে বললেন, আমরা কোরআন খতম করতে চাচ্ছি। সুতরাং আপনিও আমাদের সঙ্গে যুক্ত হোন। কেননা কোরআন খতমের পর কৃত দোয়া আল্লাহ তায়ালার কাছে মকবুল।
অতএব মুসলিম হিসেবে আমাদের প্রত্যেকেই বিশুদ্ধভাবে কোরআন তেলাওয়াত শেখা জরুরি। ব্যক্তিগতভাবে প্রাত্যহিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তেলাওয়াতের অভ্যাস গড়ে তোলা সবার জন্য দরকার। এতে ঈমান তাজা হবে, হৃদয়ের যাবতীয় রোগ ও ময়লা দূর হবে এবং ব্যক্তির জ্ঞান ও অভিজ্ঞান আরও সমৃদ্ধ হবে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT