২১শে নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ৭ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

পোশাকে ধর্মীয় ও জাতিগত প্রভাব

প্রকাশিতঃ জানুয়ারি ৩০, ২০১৮, ১২:০৯ পূর্বাহ্ণ


ইসলামি শরিয়ত মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাপ বা ডিজাইনের পোশাক আবশ্যিক করে দেয়নি, তবে
এমন কিছু শর্ত ও মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের পক্ষেই পালন করা সম্ভব। এ মূলনীতিগুলো অনুসরণ করে স্থান, কাল, পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুযায়ী যে-কোনো পোশাকই ইসলামে জায়েজ। তাই পোশাকের প্রশ্নে বল্গাহীনতা ও অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি কোনোটাই কাম্য নয়

পোশাক মানবসভ্যতার এক অপরিহার্য উপকরণ। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত সব সভ্য মানুষ পোশাক ব্যবহার করে আসছে। পোশাক মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আকিদা, বিশ্বাস ও মূল্যবোধেরও পরিচয় বহন করে। অন্যসব বিষয়ের মতো পোশাক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রেও রয়েছে ইসলামের স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি। তবে এ দৃষ্টিভঙ্গিতে বাড়াবাড়ি বা উগ্রতা নেই। জীবনের অন্যান্য দিকের মতো এক্ষেত্রেও ইসলামের দৃষ্টি মানব কল্যাণের চিরন্তন লক্ষ্যাভিসারী।
ইসলামি শরিয়ত মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মাপ বা ডিজাইনের পোশাক আবশ্যিক করে দেয়নি, তবে এমন কিছু শর্ত ও মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা-কেয়ামত পর্যন্ত সব মানুষের পক্ষেই পালন করা সম্ভব। এ মূলনীতিগুলো অনুসরণ করে স্থান, কাল, পরিবেশ ও আবহাওয়া অনুযায়ী যে কোনো পোশাকই ইসলামে জায়েজ। তাই পোশাকের প্রশ্নে বল্গাহীনতা ও অপ্রয়োজনীয় বাড়াবাড়ি কোনোটাই কাম্য নয়।
মানবসভ্যতার জনক হজরত আদম (আ.) থেকেই পোশাকের ব্যবহার ছিল। আদি মানবরা পোশাক হিসেবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পশুচর্ম ব্যবহার করত। তাদের সম্পর্কে নগ্নতা ও অসভ্যতার যে ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তা সম্পূর্ণ অমূলক। এর অন্তরালে হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে আগেকার সব নবী-রাসুল ও তাদের উম্মতদের অসভ্য ও বর্বর প্রমাণের হীন উদ্দেশ্য নিহিত থাকতে পারে। পোশাক হিসেবে কাপড়ের বুনন ও ব্যবহার শুরু হয়েছে হজরত ইদরিস (আ.) এর যুগ থেকে। বর্ণিত রয়েছে, ‘হুওয়া (ইদরিস) আওয়ালু মান খাতাস ছিয়াবা ওয়া লাবিসাহ’ অর্থাৎ সর্বপ্রথম হজরত ইদরিসই (আ.) কাপড় সেলাই করেন এবং পরিধান করেন।
বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের পোশাক সম্পর্কে প্রথম ও বিস্তারিত ধারণা পাওয়া যায় দুই চীনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েন (পঞ্চম শতক) ও হিউয়েন সাঙের (সপ্তম শতক) ভ্রমণ বৃত্তান্তে। হিউয়েন সাঙের বর্ণনায় যে পোশাকগুলোর বিবরণ পাওয়া যায় তা দর্জি দিয়ে তৈরি বা সেলাই করা ছিল না। পুরুষরা একটা লম্বা কাপড় কটি বেষ্টন করে বাহুর নিচ দিয়ে ঘুরিয়ে নিয়ে শরীর পেঁচিয়ে ডান দিকে ঝুলিয়ে দিত। মেয়েদের পোশাক-পরিচ্ছদও শরীরকে আচ্ছাদন করে কাঁধ ও মাথার ওপর পর্যন্ত প্রসারিত হতো। পুরুষরা বয়নকৃত অথবা সূচিকর্মযুক্ত টুপি ও জপমালা পরত। ত্রয়োদশ শতকে মুসলিম বিজয়ের পর বাংলার পোশাক ও সংস্কৃতিতে মৌলিক পরিবর্তন আসে। সুলতানি আমলে অভিজাত ও বিত্তবান মুসলিম পুরুষ ও মহিলারা মূল্যবান, রুচিসম্মত ও আকর্ষণীয় পোশাক পরতেন। পুরুষরা পায়জামা ও গোল গলাবন্ধসহ লম্বা জামা পরতেন। কোমরের সঙ্গে চিকন কাজসহ চাওড়া ফিতা বেঁধে রাখতেন। তাদের মাথায় থাকত পাগড়ি।
মধ্যবিত্ত মুসলমানদের পোশাক ছিল পায়জামা, সাধারণ জামা ও পাগড়ি। সাধারণ মুসলমানরা লুঙ্গি, নিমা (খাটো জামা) ও মাথায় টুপি পরতেন। অভিজাত মুসলিম মহিলারা খাটো কামিজ ও সালোয়ার পরতেন। তারা সুতি কিংবা রেশমি কাপড়ের ওড়না ব্যবহার করতেন। সাধারণ ও গরিব মহিলারা শুধু শাড়ি পরতেন। বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ফলে সাধারণভাবে হিন্দুদের এবং বিশেষ করে অভিজাত হিন্দুদের পোশাক-পরিচ্ছদে ব্যাপক পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয়। অভিজাত হিন্দুদের পোশাক-পরিচ্ছেদে মুসলিম প্রভাব এত বেশি বিস্তার লাভ করেছিল যে, সে সময় উচ্চশ্রেণির একজন হিন্দু যদি তিলক কিংবা কানের দুল ব্যবহার না করতেন তাহলে তাকে একজন অভিজাত মুসলিম থেকে আলাদা করা খুবই কষ্টকর ছিল। সাধারণ হিন্দুরা সাধারণত ধুতি ও চাদর ব্যবহার করতেন। তারা ‘অঙ্গরাখি’ নামে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা এক ধরনের জামাও পারতেন। নিম্ন শ্রেণির হিন্দুরা শুধু একপ্রস্থ ধুতি পরতেন, যা কোমর থেকে হাঁটু পর্যন্ত বিস্তৃত থাকত। হিন্দু মহিলাদের শাড়ি পরার ধরন পাল্টে যায়। মুসলিম মহিলারা শাড়ি পরার স্থানীয় রীতির সঙ্গে বিদেশি রীতির সংমিশ্রণ ঘটিয়ে শাড়ি পরার নতুন রীতি চালু করেন। তাই বর্তমান শাড়ি পরার পদ্ধতিকে মুসলিম ও হিন্দু রীতির অভিযোজন বলা যায়।
পরবর্তী যুগে এ অঞ্চলে পুরুষদের প্রিয় পোশাক হিসেবে সেলাই করা লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবি, ধুতি ও মহিলাদের ক্ষেত্রে শাড়ি ও ব্লাউজের ব্যবহার প্রাধান্য পায়। উনিশ শতকের শেষে ও বিশ শতকের শুরুতে নারী-পুরুষ উভয়ের পোশাকশৈলীতে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পুরুষরা পশ্চিমা রীতির শার্ট, প্যান্ট, স্যুট ও টাই পরা শুরু করে। অন্যদিকে মেয়েরা শাড়ির পরিবর্তে আরবীয় ধরনের ফ্রক, সালোয়ার-কামিজ ও অন্যান্য ডিজাইনের প্রতি ঝুঁকে পড়ে। পরিবর্তনের এ ধারা বর্তমানে আরও বেশি গতিশীল।
পোশক-পরিচ্ছদের ক্ষেত্রে ধর্ম ও জাতীয়তার গভীর প্রভাব রয়েছে। ধর্মীয় ঐতিহ্যের কারণে হিন্দুরা ধুতি, পৈতা, খ্রিষ্টানরা ক্রুসচিহ্নিত পোশাক এবং বৌদ্ধরা গেরুয়া কাপড়ের পোশাক পরেন। মুসলমানরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে লুঙ্গি, পায়জামা, পাঞ্জাবি, জুব্বা টুপি ও পাগড়ি পরেন, বিশেষত উপমহাদেশে একে সাধারণ এক ইসলামী পোশাক মনে করা হয়। আবার একই ধর্মের হওয়া সত্ত্বেও জাতিগত কারণে বাংলাদেশি মুসলমানদের পোশাক আরব, ইরান, তুরস্ক, পাকিস্তান ও ইউরোপের পোশাক থেকে ভিন্ন ডিজাইনের। এভাবে একই দেশে বিভিন্ন উপজাতির পোশাক-পরিচ্ছদেও বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। বাংলাদেশে বসবাসরত চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, রাখাইন ইত্যাদি উপজাতির পোশাকশৈলীতে বেশ পার্থক্য রয়েছে।
এক্ষেত্রে প্রামাণ্য আয়তটি হলোÑ ‘হে আদম সন্তান! নিশ্চয় আমি তোমাদের জন্য এমন পোশাক (পরিধানের বিধান) নাজিল করেছি, যা তোমাদের লজ্জাস্থানকে ঢেকে রাখবে এবং যা হবে ভূষণ। আর তাকওয়ার পোশাক, তা-ই কল্যাণকর। এ হচ্ছে আল্লাহর নিদর্শনগুলোর অন্যতম। আশা করা যায় তারা উপদেশ গ্রহণ করবে।’ (সূরা আরাফ : ২৬)। এ আয়াত থেকে পোশাকের তিনটি মৌলিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানা যায়। অর্থাৎ পোশাক মানুষের সতরকে আবৃত করে রাখবে। পুরুষের সতর হচ্ছে নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত আর নারীর সতর নারীদের পরিবেশে বুক থেকে হাঁটু পর্যন্ত এবং বাইরের পরিবেশে দু-হাতের তালু, দু-পায়ের পাতা ও মুখম-ল ছাড়া পুরো দেহ। এটা ঢেকে রাখা ফরজ। সুতরাং যে পোশাক মানুষের সতর (লজ্জাস্থান) আবৃত করে না, তা পোশাক হতে পারে না।
পোশাক অবশ্যই ভূষণ বা শোভাবর্ধক ও সৌন্দর্য বিকাশের মাধ্যমে হবে। আল্লাহ তায়ালা পোশাকের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে ‘রিশ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। এর ব্যবহারিক অর্থ হলো ঔজ্জ্বল্য, চাকচিক্য ও শোভাবর্ধক। অভিধানে ‘রিশ’ শব্দের অর্থ হলো, পাখির পালকের মতোই, এ কারণে মানুষের পোশাক বাহ্যত কিরূপ হবে তা বোঝানোর জন্য ওই শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। ইমাম রাজি বলেন, ‘রিশ’ দ্বারা সৌন্দর্যবর্ধক পোশাককে বোঝানো হয়েছে। পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির সৌন্দর্যবোধ, ভদ্রতা, শালীনতা, রুচি ও ব্যক্তিত্বের প্রকাশ ঘটে। সুতরাং যে পোশাক ব্যক্তিকে শালীন ও সুন্দর করে না, তা কোরআন সমর্থিত পোশাক নয়। অবশ্য সৌন্দর্য ও শোভার ক্ষেত্রে মানুষের রুচি পরিবর্তনশীল। স্থান, কাল, আবহাওয়া ও মানসিক অবস্থার দৃষ্টিতে এতে অনেক পার্থক্য ও পরিবর্তন হতে পারে। এ কারণে পোশাকের ধরন ও কাটিং পরিবর্তনশীল।
আল কোরআনে পোশাকের ক্ষেত্রে তাকওয়ার উল্লেখ রয়েছে। অতএব পোশাক শুধু সতর ঢাকা এবং সৌন্দর্যবর্ধকই নয়, এটি একটি মনোদৈহিক বিষয়ও। পোশাকের মাধ্যমে ব্যক্তির রুচিবোধ ও মন-মানসিকতার প্রকাশ ঘটে। সুতরাং পোশাক এমন হতে হবে যা ভূষণ ও শালীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাকওয়ার পরিচয় ও বহন করে। পোশাকে গর্ব-অহংকারের পরিবর্তে নম্রতা, ভদ্রতা ও বিনয়ের ছাপ থাকবে এবং এতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অপচয় থাকবে না। তদুপরি মোমিনের পোশাক এমন হওয়া উচিত, যা পবিত্রতারক্ষক ও নামাজ আদায়ের ক্ষেত্রে অনুকূল হয়।
ইসলাম পোশাক-পরিচ্ছদের ব্যাপারে যেমনি উদারতার পরিচয় দিয়েছে, তেমনি কিছু  মূলনীতিও নির্ধারণ করে দিয়েছে, যা সভ্যতা, শালীনতা রক্ষায় একান্ত প্রয়োজন। ইসলামের সে মূলনীতিগুলো পালন করে নারী-পুরুষের জন্য যে কোনো পোশাকই পরিধান করা অনুমোদনযোগ্য। পোশাক প্রশ্নে এই হলো ইসলামের ব্যাপকতর গ্রহণযোগ্য নীতি। তথাপি এত বৈচিত্র্যের মধ্যেও পোশাকে ঐক্য থাকবে শুধু আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.) এর দিকনির্দেশনা পালনে এবং পোশাকের ব্যাপারে শরিয়তপ্রদত্ত শর্ত মেনে চলার মধ্যেই সভ্যতা ও সংস্কৃতি মেনে পোশাকের ব্যবহার করতে হবে।

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT