১৫ই নভেম্বর, ২০১৮ ইং | ১লা অগ্রহায়ণ, ১৪২৫ বঙ্গাব্দ, হেমন্তকাল

পিরোজপুরে ‘বাড়ি দখল করতে’ যুবলীগ নেতার অবিশ্বাস্য কাণ্ড

প্রকাশিতঃ মে ২৭, ২০১৮, ১২:১৯ অপরাহ্ণ


বাসাটিতে গ্যাস নেই। বিদ্যুৎ ও পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন। এ অবস্থায় নয় মাস ধরে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন পিরোজপুর সরকারি সোহরাওয়ার্দী কলেজের সাবেক উপাধ্যক্ষ গীতা রানী মজুমদার ও তাঁর স্নাতকপড়ুয়া একমাত্র মেয়ে।

গীতা রানীর বাসার বিদ্যুৎ, পানির সংযোগ কোনো কর্তৃপক্ষ বিচ্ছিন্ন করেনি। পরিবারটিকে বের করে দিয়ে বাড়িটি দখল করতে পিরোজপুর জেলা যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ওবায়দুল হক ওরফে পিন্টু এই কাজ করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

পিরোজপুর শহরের বাইপাস সড়কের মাছিমপুর এলাকায় সার্জিকেয়ার ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পঞ্চম তলায় থাকে গীতা রানীর পরিবার। তাঁর স্বামী চিকিৎসক বিজয় কৃষ্ণ হালদার এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা। এর অর্ধেক মালিকানা বিক্রি করা হয় যুবলীগের নেতা ওবায়দুল হকের কাছে। সেই সূত্রে তিনি বাড়িটির অর্ধেকের মালিক হন। কিন্তু তিনি ক্লিনিকের ব্যবসা করায়ত্ত করার পর এখন পুরো বাড়িটিও দখল করতে চান বলে বিজয় কৃষ্ণের পরিবারের অভিযোগ।

গীতা রানী জানান, গত বছরের আগস্টে তাঁদের বাসার পানি ও বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়েছে। রান্নার জন্য গ্যাসের সিলিন্ডার আনতেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। কারা এটা করছে—জানতে চাইলে গীতা রানী বলেন, বাড়ি ও ক্লিনিকটি পুরোপুরি দখল করে রেখেছেন ওবায়দুল হক। তিনিই পানি ও বিদ্যুৎ-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। বাসায় আসা-যাওয়া করতে বাধা দিচ্ছেন, ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন।

সম্প্রতি এই প্রতিবেদক পিরোজপুরে ওই বাসায় গেলে নিচতলা থেকে পিছু নেন তিন যুবক। পঞ্চম তলায় গীতা রানীর বাসার কলবেল চাপতেই তিনজনের মধ্যে রেজাউল পরিচয় দিয়ে একজন এই প্রতিবেদককে জেরা করা শুরু করেন। একপর্যায়ে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর কিছুটা দমে যান। তবে এই প্রতিবেদক ওই বাসা থেকে বের হওয়া পর্যন্ত বাসার সামনেই বসে ছিলেন তাঁরা।

গীতা রানীর বাসার একটি কক্ষে আলমারি, ওয়ার্ডরোবের তালা ভাঙা। ঘরে কেরোসিনের একটি চুলা। গীতা রানী বলেন, ‘প্রায় দিনই হোটেল থেকে খাবার কিনে আনিয়ে খেতে হয়। অন্য বাসায় গিয়ে গোসল করতে হয়। সব সময় আতঙ্কে থাকি। এভাবে কত দিন বেঁচে থাকতে পারব জানি না।’ বিষয়টি স্থানীয় সাংসদ, মেয়র, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ দায়িত্বশীল সবাই জানেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না।

২০১৬ সালের ২১ মার্চ গভীর রাতে ক্লিনিকটির মালিক চিকিৎসক বিজয় কৃষ্ণ হালদার, তাঁর মা, স্ত্রী গীতা রানী ও কলেজপড়ুয়া মেয়েকে একদল দুর্বৃত্ত বাসায় ঢুকে মারধর করে এবং দামি জিনিসপত্র লুট করে। চোখ ও হাত-পা বেঁধে তাঁদের ঝাটকাঠি এলাকার একটি বাড়িতে রেখে আসে। স্থানীয় লোকজন সেখান থেকে তাঁদের উদ্ধার করে শহরের পালপাড়ায় এক আত্মীয়ের বাসায় পৌঁছে দেন। পিরোজপুর-১ আসনের সাংসদ এ কে এম এ আউয়াল খবর পেয়ে পুলিশের সহায়তায় পরিবারটিকে তাদের বাসায় তুলে দেন। এর পাঁচ দিন পর সাংসদের হস্তক্ষেপে মামলা নেয় পিরোজপুর সদর থানার পুলিশ। মামলায় ওবায়দুল হককে প্রধান আসামি করা হয়।

গীতা রানী জানান, মামলা করার পর তাঁদের ওপর নির্যাতন বেড়ে যায়। পুলিশও ওই মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে দেয়। এর বিরুদ্ধে তিনি আদালতে নারাজি দিয়েছেন।

চিকিৎসক বিজয় কৃষ্ণ হালদার তাঁর ক্লিনিকের অর্ধেক শেয়ার ওবায়দুল হকের কাছে বিক্রি করেন। এর পরপরই ২০১৫ সালের অক্টোবরে রহস্যজনকভাবে অপহৃত হন বিজয় কৃষ্ণ। আহত অবস্থায় তাঁকে পাওয়া যায় ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে। এরপর তিনি মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং তাঁকে এক আত্মীয়ের বাসায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই ক্লিনিকসহ পুরো বাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেন ওবায়দুল হক। শুধু পঞ্চম তলায় বিজয় কৃষ্ণের পরিবার থাকে। গীতা রানী বলেন, এখন তাঁদের উচ্ছেদের জন্য অমানবিক পন্থা বেছে নিয়েছেন ওবায়দুল হক।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ওবায়দুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমি দুই কোটি টাকা দিয়ে এই ক্লিনিকের অর্ধেক মালিকানা কিনেছি। পরে আরও টাকা দিই পুরোটা কেনার জন্য।কিন্তু রেজিস্ট্রি করার আগেই চিকিৎসক বিজয় কৃষ্ণ অসুস্থ হয়ে পড়েন।’ একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘সাংসদ পরিবারটিকে বাসায় তুলে দেওয়ার কারণে তাদের সরাতে পারছি না।’

জানতে চাইলে পিরোজপুর পৌরসভার মেয়র হাবিবুর রহমান মালেক বলেন, ওই সম্পত্তি নিয়ে যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে দুই পক্ষের একসঙ্গে থাকা কঠিন। তিনি বলেন, ‘ওবায়দুল হক যে দুই কোটি টাকা দিয়ে অর্ধেক মালিকানা কিনেছে, তার চেয়ে কিছু কম টাকা ফেরত দিলেও সে সরে আসবে।’ অথবা চিকিৎসক বিজয়ের পরিবার চাইলে বাকি অর্ধেক শেয়ারের জন্য আগের চেয়ে বেশি টাকা ওবায়দুল হকের কাছ থেকে নিয়ে দিতে পারেন তিনি।

মেয়রের এ প্রস্তাব শুনে গীতা রানী বলেন, মেয়রের বক্তব্যেই তো প্রমাণ হয়, ওবায়দুল হক যে পুরো বাড়ি তাঁর বলে দাবি করছেন, তা মিথ্যা।

যুবলীগের নেতা ওবায়দুল হকরা তিন ভাই। বড় ভাই পুলিশ পরিদর্শক। ছোট ভাই অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির একজন নেতা।

জানতে চাইলে পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সালাম কবির বলেন, ‘মালিকানার বিষয়ে আমার করণীয় কিছু নেই। কিন্তু তাঁদের ওপর অমানবিক আচরণ করলে সেটা দেখতে পারি।’

পরিবারের নিরাপত্তা ও প্রতিকার চেয়ে গীতা রানী প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেছেন।

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেন, ‘আমি স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলব। এমন কাজ যে-ই করুন, তিনি পার পাবেন না। ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

Leave a Reply

৯৭/৩/খ, উত্তর বিশিল, মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬
মোবাইলঃ ০১৭১২-৬৪৩৬৭৩, বার্তা বিভাগঃ ০১৭১২-৬৪৪৩৫০, সার্কুলেশন বিভাগঃ০১৯১৬০৯৯০২০
ইমেইলঃ [email protected], [email protected]

সম্পাদক:
মোঃ সুলতান চিশতী

ব্যবস্থাপনা সম্পাদকঃ
মহসিন হাসান খান (বুলবুল)

নির্বাহী সম্পাদকঃ
মোঃ ইব্রাহিম হোসেন

সহকারী সম্পাদকঃ
মোঃ আতোয়ার হোসেন

আইন উপদেষ্টাঃ
শাহিন সরকার


.: Developed By :.
Great IT